সময়ের সঙ্গে সঙ্ঘেরপ্রচার-প্রসার কাজের অগ্রগতি
ড. আর. বালাশঙ্কর
এটি সত্যিই আশ্চর্যের বিষয়, যে সংগঠনটি তার আত্মপ্রকাশের পর থেকে বিগত এক শতাব্দী ধরে তার কার্যবিস্তার কালে ভারত জুড়ে তার অস্তিত্ব দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে, তারা এই ‘এক শতাব্দী সময়কাল’-এর প্রায় এক-চতুর্থাংশ সময়ে সযত্নে এড়িয়ে গিয়েছে সবরকম আত্মপ্রচার। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বেড়ে ওঠার পর্যায়ে তারা নিজেদের কাজের প্রচার না করলেও আজ এই সংগঠনটি ‘ন্যাশনাল ন্যারেটিভ’ বা জাতীয় স্তরের বিমর্শের কেন্দ্রবিন্দুতে তাদের স্থান করে নিয়েছে। সংগঠনটির নাম ‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ’। সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠাতা ডাঃ কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার। ডাক্তারজী বলতেন যে, ‘সঙ্ঘকাজ’ এমন হবে যে, তা নিজেই কথা বলে উঠবে। সঙ্ঘ কখনও আত্মপ্রচার অভিমুখে ধাবিত হবে না। ১৯২৫ সালে বিজয়াদশমীর দিন প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ২৫ বছর ধরে সঙ্ঘের কোনো নিজস্ব প্রকাশনা বিভাগ ছিল না। সংগঠনটি ছিল শক্তিশালী প্রচারযন্ত্রহীন ও আত্মপ্রচার-বিমুখ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সঙ্ঘের প্রচারকরা এখনও সংযত এবং অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত।
সঙ্ঘকাজ শুরুর প্রথম দিকে মৌখিক প্রচারের ওপর নির্ভর করত সঙ্ঘ। বক্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে চলত প্রচারের কাজ। সংগঠনই মূলত রাষ্ট্রীয় আদর্শের প্রচারে সহায়ক ছিল। এই সময় সাংগঠনিক নেটওয়ার্কের দ্বারাই সম্পাদিত হয় সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার প্রচার-প্রসার। ভারতের বুকে রাষ্ট্রভক্তির আদর্শকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ক্রিয়াশীল একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে ক্রমশ পরিচিতি লাভ করতে থাকে সঙ্ঘ। রাষ্ট্রীয় দর্শনের পুনরাবিষ্কারের মাধ্যমে দেশকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠার প্রথম দিন থেকেই সংকল্পবদ্ধ ছিল সঙ্ঘ। প্রাচীন ভারতবর্ষ ছিল এক পরম বৈভবশালী দেশ। পুনরায় সেই
পরম বৈভবশালী রাষ্ট্রনির্মাণের স্বপ্ন ও কল্পনায় সমর্পিত হয় সঙ্ঘ। তার এই নিজস্ব পরিচিতিকে পাথেয় করে, রাষ্ট্রসেবার আদর্শে উদ্বুদ্ধ সংগঠন হিসেবে জাতীয় অঙ্গনে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে সঙ্ঘের কর্মসূচি, সাংগঠনিক নীতি ও পদ্ধতির সুস্পষ্ট ব্যাখ্যাদানের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি বিশেষভাবে প্রকট হয়ে ওঠে। দেশভাগ পরবর্তী পর্যায়ে সংঘটিত হয় গান্ধীজীর হত্যাকাণ্ড। এই হত্যাকে কেন্দ্র করে সঙ্ঘের ওপর আরোপিত হয় নানা মিথ্যাচার। সঙ্ঘের চারিপাশে ছড়িয়ে পড়া এহেন মিথ্যাচার নিজস্ব আদর্শ ও অবস্থান স্পষ্ট করতে সঙ্ঘকে একপ্রকার বাধ্য করে। সংগঠন-সম্পর্কিত যাবতীয় ধোঁয়াশা কাটিয়ে তুলতে উদ্যোগী হয় সঙ্ঘ।
‘শাখা’ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্ঘের প্রভাব হলো সম্পর্ক দেশব্যাপী। এই কারণে জাতীয় স্তরে গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয়ে সঙ্ঘের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারা ব্যক্ত করার প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এর ফলে নিজস্ব প্রচার বিভাগ ও প্রকাশনা সংস্থার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হতে থাকে। বিশেষত এই পর্যায়ে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলি ‘সঙ্ঘকাজ’ তুলে ধরা বা সঙ্ঘের কার্যকলাপ প্রচারের বিষয়টি সন্তর্পণে এড়িয়ে চলত। সঙ্ঘকাজের প্রতি গুরুত্ব না দেওয়াই ছিল
এই সংবাদমাধ্যমগুলির রীতি। কার্যবিস্তারের লক্ষ্যে পরিচালিত হলেও রাজনীতি-সহ কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রসমাজ- দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছিল সঙ্ঘের সতর্ক দৃষ্টি। ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী প্রসারিত হতে থাকে সঙ্ঘ শাখা। প্রবাসী ভারতীয়রা হিন্দুত্বের প্রতি ব্যাপক ভাবে আকৃষ্ট হতে থাকেন। বিশ্বব্যাপী আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায় ‘হিন্দুত্ব’ দর্শন। দীনদয়াল উপাধ্যায়, অটলবিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদবাণীর মতো বড়ো মাপের কার্যকর্তারা সঙ্ঘের প্রচার বিভাগের দায়িত্ব নির্বাহ এবং সেখান থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রপত্রিকা সম্পাদনার মধ্য দিয়েই তাঁদের কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। দ্বিতীয় সরসঙ্ঙ্খচালক
শ্রীগুরুজী একাধারে ছিলেন একজন শক্তিশালী লেখক ও সুবক্তা। পি. পরমেশ্বরন, কে.আর. মালকানি, ভি.পি. ভাটিয়া, রঙ্গা হরি, এইচভি শেষাদ্রি, জয় দুবাশি, এস. গুরুমূর্তি, রাম মাধব, ভানুপ্রতাপ শুক্লা, দীননাথ মিশ্র, সুনীল আম্বেকর, জে. নন্দকুমারের মতো অসংখ্য শক্তিশালী সাংবাদিক ও সুলেখকদের জন্ম দিয়েছে সঙ্ঘ। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও প্রকাশনা সংস্থাগুলি হয়ে ওঠে স্বয়ংসেবকদের প্রতিভা বিকাশের কেন্দ্র।
রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের পূর্বতন অখিল ভারতীয় সহ-প্রচার প্রমুখ শ্রী জে. নন্দকুমার বর্তমানে ‘প্রজ্ঞা প্রবাহ’ নামক সংগঠনের দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকরা ১৫টি মাসিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা, ৩৯টি জাগরণ পত্রিকা, চারটি দৈনিক পত্রিকা এবং ১৮টি প্রকাশনা সংস্থা পরিচালনা করছেন। তাঁরা ‘জনম’-নামক একটি টেলিভিশন নিউজ বা সংবাদ চ্যানেলও পরিচালনা করে থাকেন। নন্দকুমারজী আরও বলেন যে, সমাজ রূপান্তরের লক্ষ্যে নিঃস্বার্থ সেবাকাজই হলো রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের আদর্শ। নিঃস্বার্থভাবে সেবাকাজ পরিচালনায় গুরুত্বদানের কারণে প্রথম থেকেই প্রচারের অন্তরালে থেকে গিয়েছে সঙ্ঘ। কিন্তু সঙ্ঘের বিকৃত আখ্যান এবং সঙ্ঘের আদর্শ-সম্পর্কিত নেতিবাচক বিমর্শ প্রচারে সক্রিয় থাকে নানা স্বার্থান্বেষী মহল। প্রথাগতভাবে আত্মপ্রচার-বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও সংগঠনের বিরুদ্ধে ক্রিয়াশীল এহেন উচ্চগ্রামে বাঁধা অপপ্রচারকে প্রতিহত করার জন্য প্রচার বিভাগের কাজ শুরু করে সঙ্ঘ। সঙ্ঙ্গ বিষয়ক যাবতীয় বিভ্রান্তি কাটানো, সব অপপ্রচারের প্রত্যুত্তর দান এবং জাতীয় স্বার্থে সর্বাত্মকভাবে একটি ইতিবাচক ও রাষ্ট্রবাদী দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন তখন সঙ্ঘের কাছে ‘অবশ্য কর্তব্য’ হয়ে দাঁড়ায়। প্রচার বিভাগের কাজ শুরু করার অর্থ কিন্তু সঙ্ঘের ‘আত্মপ্রচারবিরোধী’ মূল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচ্যুতি কোনোভাবেই নয়।
গত কয়েক দশক ধরে ভারতীয় জনজীবনে প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে সঙ্ঘ। এর পরিণামে ভারতীয় চিন্তাভাবনার পদ্ধতিতেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। আজ ভারতের প্রকাশনা সংস্থা এবং পত্রপত্রিকার বৃহত্তম নেটওয়ার্কগুলির মধ্যে অন্যতম হলো সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকদের দ্বারা পরিচালিত বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল। সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক মাধ্যমগুলিতে স্বয়ংসেবকদের দ্বারা পরিচালিত সংগঠনগুলি অনেক বেশি সক্রিয়।
দেশ-বিদেশের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যা সঙ্ঘের প্রচার বিভাগের দৃষ্টির বাইরে। সঙ্ঘের অখিল ভারতীয় স্তরে প্রচার বিভাগের পূর্ণকালীন দায়িত্বে বর্তমানে রয়েছেন একজন বরিষ্ঠ প্রচারক। এই দায়িত্বটি সঙ্ঘের সহ-সরকার্যবাহের দায়িত্বের সমতুল। সামাজিক মাধ্যমে সঙ্ঘের চিন্তাধারা প্রসারের কাজেও ব্যাপৃত প্রচার বিভাগ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, নিজস্ব প্রচার বিভাগ বাদে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা এবং পত্রপত্রিকাগুলি কিন্তু সরাসরি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের মালিকানাধীন নয়। সংস্থাগুলি সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকদের দ্বারা পরিচালিত। এই কারণে সরসঙ্ঘচালক ডাঃ মোহন ভাগবত প্রায়শই বলেন, ‘সঙ্ঘ শুধু সংগঠন করবে, আর স্বয়ংসেবকরা প্রতিটি ক্ষেত্রে কাজ করবে।
‘
আজ স্বয়ংসেবকরা ভারতের প্রায় সব ক’টি ভাষায় প্রকাশনা সংস্থা পরিচালনা করছেন। দেশজুড়ে স্বয়ংসেবকদের দ্বারা প্রকাশিত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার কম্বাইন্ড সার্কুলেশন বা মোট গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ২০ লক্ষ। এই প্রকাশনা সংস্থাগুলির অধিকাংশই স্বয়ংসম্পূর্ণ।
জাতীয় স্তরে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় উপস্থাপনের ক্ষেত্রে এই পত্রিকাগুলি ভূমিকা গ্রহণ করেছে। পত্রিকাগুলির মাধ্যমে সূচিত হয়েছে বিতর্ক, গঠিত হয়েছে জনমত। গোহত্যা নিবারণ, গঙ্গাদূষণ রোধ, স্বদেশি অভিযান, শ্রীরামজন্মভূমি মন্দির আন্দোলন, ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, নির্বাচনী সংস্কার, ওয়াকফ বোর্ডকে সামনে রেখে জেহাদি সন্ত্রাসের মতো বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে এই পত্রিকাগুলির পাতায়। এছাড়াও আলোচিত হয়েছে দেশের আরও নানা সমস্যা ও তার সমাধান। দেশ স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৪০-এর দশকের শেষের দিকে সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকরা বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা পরিচালনার কাজ শুরু করে। প্রথমে লক্ষ্ণৌ থেকে হিন্দিতে ‘পাঞ্চজন্য’ এবং দিল্লি থেকে ইংরেজি ভাষায় ‘অর্গানাইজার’ প্রকাশিত হয়। এর পরবর্তী পর্যায়ে
১৯৫০-এর দশকের গোড়ার দিকে আরও অনেকগুলি আঞ্চলিক প্রকাশনা সংস্থার কাজ শুরু হয়। বর্তমানে স্বয়ংসেবকদের দ্বারা ভারতের প্রায় প্রতিটি ভাষায় বিভিন্ন পত্রপত্রিকা সম্পাদিত ও প্রকাশিত হয়ে চলেছে।
বর্তমানে অনলাইন সংস্করণের যুগে মুদ্রিত হরফে প্রকাশিত পত্র- পত্রিকাগুলি যখন অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন, তখনও স্বয়ংসেবকদের দ্বারা প্রকাশিত পত্রিকাগুলি তাদের সার্কুলেশন বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। পত্রিকাগুলির গ্রাহক তথা পাঠক সংখ্যা কিন্তু কমেনি। মালয়ালম ভাষায় প্রকাশিত ‘কেশরী’র মতো পত্রিকা বিজ্ঞাপন অপেক্ষা গ্রাহক মূল্য হতে সংগৃহীত আয়ের ওপর অধিকমাত্রায় নির্ভরশীল। বর্তমানে এই পত্রিকাটির গ্রাহক সংখ্যা এক লক্ষেরও বেশি। সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে এই পত্রিকাগুলির আকার-আকৃতি, প্রচ্ছদ, লেখালেখির মান ইত্যাদি আরও উন্নত হয়েছে। প্রতিটি পত্রিকারই অনলাইন সংস্করণ রয়েছে, ইন্টারনেটের মাধ্যমে যা বিশ্বজুড়ে অসংখ্য ব্যক্তি ও স্বয়ংসেবকদের কাছে পৌঁছে যায়।
সঙ্ঘ নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে স্বয়ংসেবকদের দ্বারা চালিত পত্রিকা ও প্রকাশনা সংস্থাগুলিও তিনবার নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হয়। প্রতিবার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হওয়ার পর নিজস্ব পাঠক সংখ্যা পুনরুদ্ধারে পত্রিকাগুলি কোনোরকম সমস্যায় পড়েনি। স্বয়ংসেবকদের দ্বারা চালিত অধিকাংশ প্রকাশনা সংস্থা প্রাইভেট (বেসরকারি) বা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধীকৃত। লাভজনক সংস্থা না হলেও প্রতিটি সংস্থা স্বয়ংসম্পূর্ণ। কেন্দ্রীয় সরকার এবং বিভিন্ন রাজ্য সরকারের বিজ্ঞাপন ছাড়াও বহু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের থেকে এই পত্রিকাগুলিতে বিজ্ঞাপন সংগৃহীত হয়ে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে মূলধারার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে বহিষ্কৃত ও নির্বাসিত ছিলেন রাষ্ট্রবাদী সাংবাদিকরা। সাংবাদিকতার পেশায় যুক্ত স্বয়ংসেবকদের কার্যত একঘরে করে রাখা হয়। ‘স্বয়ংসেবক’ পরিচয়ে পরিচিত কোনো ব্যক্তির পক্ষে সংবাদমাধ্যমে চাকরি পাওয়া ছিল খুবই কঠিন। দেশজুড়ে জাতীয়তাবোধের জাগরণ সত্ত্বেও এহেন বৈষম্য আজও বিদ্যমান।
জাতীয় স্তরে বাম ও কংগ্রেসপন্থী পত্রিকাগুলির প্রাধান্যের সঙ্গে স্বয়ংসেবকদের দ্বারা প্রকাশিত পত্রিকাগুলির প্রভাবের তুলনামূলক বিশ্লেষণও আজ খুবই প্রাসঙ্গিক। বাম ও কংগ্রেসি পত্রিকাগুলি একদা ভারত সরকার এবং বিভিন্ন রাজ্য সরকারের অর্থসাহায্যে পুষ্ট হলেও স্বয়ংসেবকদের দ্বারা চালিত প্রকাশনা সংস্থাগুলি ছিল স্বনির্ভর। সরকারি সাহায্য বা রাজনৈতিক আনুকূল্যের ওপর তারা কোনোদিনই নির্ভরশীল ছিল না। ফলে কালের নিয়মে কমিউনিস্ট ও কংগ্রেসি পত্রিকাগুলি হারিয়ে যেতে থাকলেও রাষ্ট্রবাদী দর্শনের প্রচার মাধ্যমগুলি এখনও ভালোভাবে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পেরেছে। ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারির আগে ‘অর্গানাইজার’ ও ‘পাঞ্চজন্য’ প্রকাশনা সংস্থা ‘ভারত প্রকাশন’– ‘মাদারল্যান্ড’-নামক একটি অসাধারণ পত্রিকা প্রকাশ শুরু করে। দিল্লি থেকে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত এই দৈনিক পত্রিকাটির গর্জনে ভীত, শঙ্কিত হয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা জারি করেন। মাদারল্যান্ডের কার্যালয়ে পুলিশি অভিযান ও তল্লাশি চলে। পত্রিকাটির প্রেস (ছাপাখানা) ও বিভিন্ন মুদ্রণযন্ত্র বাজেয়াপ্ত করা হয়। মিসা আইনে গ্রেপ্তার হন পত্রিকার সম্পাদক কে.আর. মালকানি। পরবর্তীকালে ‘মাদারল্যান্ড’ পত্রিকার পুনঃপ্রকাশ সম্ভবপর না হলেও জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে অনবরত গর্জে ওঠে পাঞ্চজন্য ও অর্গানাইজারের প্রতিবাদী কলম। সাম্প্রতিক অতীতে, শ্রীরামজন্মভূমি মন্দির আন্দোলনের বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য। অসংখ্য লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক ও সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় কর্মীর জন্ম দেয় এই আন্দোলন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, এই রাষ্ট্রবাদী সংবাদমাধ্যমগুলির ‘এডিটোরিয়াল পলিসি’ বা সম্পাদকীয় নীতিকে কিন্তু কখনোই প্রভাবিত করে না রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। সংস্থাগুলিতে সঙ্ঘের কোনো সরাসরি হস্তক্ষেপও নেই। স্বয়ংসেবকদের চিন্তাধারা অনুযায়ী, স্বাধীন, স্বকীয়ভাবে পরিচালিত হয়ে চলেছে এতগুলি পত্র-পত্রিকা। প্রযুক্তির অস্বাভাবিক উন্নতির কারণে দেশজুড়ে যখন যখন ‘প্রিন্ট মিডিয়া’ বা মুদ্রিত সংবাদপত্রগুলি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই লড়ছে, তখন রাষ্ট্রসেবায় নিবেদিতপ্রাণ স্বয়ংসেবকদের উদ্যোগ, উদ্যম এবং সঙ্ঘের ক্রমবর্ধমান নেটওয়ার্কের দরুন রাষ্ট্রচেতনায় উদ্বুদ্ধ পত্র-পত্রিকাগুলির মধ্যে যেন সঞ্চারিত হয়েছে নতুন প্রাণ।
সময়ের সঙ্গে সঙ্ঘেরপ্রচার-প্রসার কাজের অগ্রগতি
ড. আর. বালাশঙ্কর
এটি সত্যিই আশ্চর্যের বিষয়, যে সংগঠনটি তার আত্মপ্রকাশের পর থেকে বিগত এক শতাব্দী ধরে তার কার্যবিস্তার কালে ভারত জুড়ে তার অস্তিত্ব দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে, তারা এই ‘এক শতাব্দী সময়কাল’-এর প্রায় এক-চতুর্থাংশ সময়ে সযত্নে এড়িয়ে গিয়েছে সবরকম আত্মপ্রচার। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বেড়ে ওঠার পর্যায়ে তারা নিজেদের কাজের প্রচার না করলেও আজ এই সংগঠনটি ‘ন্যাশনাল ন্যারেটিভ’ বা জাতীয় স্তরের বিমর্শের কেন্দ্রবিন্দুতে তাদের স্থান করে নিয়েছে। সংগঠনটির নাম ‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ’। সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠাতা ডাঃ কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার। ডাক্তারজী বলতেন যে, ‘সঙ্ঘকাজ’ এমন হবে যে, তা নিজেই কথা বলে উঠবে। সঙ্ঘ কখনও আত্মপ্রচার অভিমুখে ধাবিত হবে না। ১৯২৫ সালে বিজয়াদশমীর দিন প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ২৫ বছর ধরে সঙ্ঘের কোনো নিজস্ব প্রকাশনা বিভাগ ছিল না। সংগঠনটি ছিল শক্তিশালী প্রচারযন্ত্রহীন ও আত্মপ্রচার-বিমুখ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সঙ্ঘের প্রচারকরা এখনও সংযত এবং অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত।
সঙ্ঘকাজ শুরুর প্রথম দিকে মৌখিক প্রচারের ওপর নির্ভর করত সঙ্ঘ। বক্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে চলত প্রচারের কাজ। সংগঠনই মূলত রাষ্ট্রীয় আদর্শের প্রচারে সহায়ক ছিল। এই সময় সাংগঠনিক নেটওয়ার্কের দ্বারাই সম্পাদিত হয় সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার প্রচার-প্রসার। ভারতের বুকে রাষ্ট্রভক্তির আদর্শকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ক্রিয়াশীল একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে ক্রমশ পরিচিতি লাভ করতে থাকে সঙ্ঘ। রাষ্ট্রীয় দর্শনের পুনরাবিষ্কারের মাধ্যমে দেশকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠার প্রথম দিন থেকেই সংকল্পবদ্ধ ছিল সঙ্ঘ। প্রাচীন ভারতবর্ষ ছিল এক পরম বৈভবশালী দেশ। পুনরায় সেই
পরম বৈভবশালী রাষ্ট্রনির্মাণের স্বপ্ন ও কল্পনায় সমর্পিত হয় সঙ্ঘ। তার এই নিজস্ব পরিচিতিকে পাথেয় করে, রাষ্ট্রসেবার আদর্শে উদ্বুদ্ধ সংগঠন হিসেবে জাতীয় অঙ্গনে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে সঙ্ঘের কর্মসূচি, সাংগঠনিক নীতি ও পদ্ধতির সুস্পষ্ট ব্যাখ্যাদানের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি বিশেষভাবে প্রকট হয়ে ওঠে। দেশভাগ পরবর্তী পর্যায়ে সংঘটিত হয় গান্ধীজীর হত্যাকাণ্ড। এই হত্যাকে কেন্দ্র করে সঙ্ঘের ওপর আরোপিত হয় নানা মিথ্যাচার। সঙ্ঘের চারিপাশে ছড়িয়ে পড়া এহেন মিথ্যাচার নিজস্ব আদর্শ ও অবস্থান স্পষ্ট করতে সঙ্ঘকে একপ্রকার বাধ্য করে। সংগঠন-সম্পর্কিত যাবতীয় ধোঁয়াশা কাটিয়ে তুলতে উদ্যোগী হয় সঙ্ঘ।
‘শাখা’ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্ঘের প্রভাব হলো সম্পর্ক দেশব্যাপী। এই কারণে জাতীয় স্তরে গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয়ে সঙ্ঘের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারা ব্যক্ত করার প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এর ফলে নিজস্ব প্রচার বিভাগ ও প্রকাশনা সংস্থার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হতে থাকে। বিশেষত এই পর্যায়ে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলি ‘সঙ্ঘকাজ’ তুলে ধরা বা সঙ্ঘের কার্যকলাপ প্রচারের বিষয়টি সন্তর্পণে এড়িয়ে চলত। সঙ্ঘকাজের প্রতি গুরুত্ব না দেওয়াই ছিল
এই সংবাদমাধ্যমগুলির রীতি। কার্যবিস্তারের লক্ষ্যে পরিচালিত হলেও রাজনীতি-সহ কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রসমাজ- দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছিল সঙ্ঘের সতর্ক দৃষ্টি। ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী প্রসারিত হতে থাকে সঙ্ঘ শাখা। প্রবাসী ভারতীয়রা হিন্দুত্বের প্রতি ব্যাপক ভাবে আকৃষ্ট হতে থাকেন। বিশ্বব্যাপী আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায় ‘হিন্দুত্ব’ দর্শন। দীনদয়াল উপাধ্যায়, অটলবিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদবাণীর মতো বড়ো মাপের কার্যকর্তারা সঙ্ঘের প্রচার বিভাগের দায়িত্ব নির্বাহ এবং সেখান থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রপত্রিকা সম্পাদনার মধ্য দিয়েই তাঁদের কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। দ্বিতীয় সরসঙ্ঙ্খচালক
শ্রীগুরুজী একাধারে ছিলেন একজন শক্তিশালী লেখক ও সুবক্তা। পি. পরমেশ্বরন, কে.আর. মালকানি, ভি.পি. ভাটিয়া, রঙ্গা হরি, এইচভি শেষাদ্রি, জয় দুবাশি, এস. গুরুমূর্তি, রাম মাধব, ভানুপ্রতাপ শুক্লা, দীননাথ মিশ্র, সুনীল আম্বেকর, জে. নন্দকুমারের মতো অসংখ্য শক্তিশালী সাংবাদিক ও সুলেখকদের জন্ম দিয়েছে সঙ্ঘ। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও প্রকাশনা সংস্থাগুলি হয়ে ওঠে স্বয়ংসেবকদের প্রতিভা বিকাশের কেন্দ্র।
রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের পূর্বতন অখিল ভারতীয় সহ-প্রচার প্রমুখ শ্রী জে. নন্দকুমার বর্তমানে ‘প্রজ্ঞা প্রবাহ’ নামক সংগঠনের দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকরা ১৫টি মাসিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা, ৩৯টি জাগরণ পত্রিকা, চারটি দৈনিক পত্রিকা এবং ১৮টি প্রকাশনা সংস্থা পরিচালনা করছেন। তাঁরা ‘জনম’-নামক একটি টেলিভিশন নিউজ বা সংবাদ চ্যানেলও পরিচালনা করে থাকেন। নন্দকুমারজী আরও বলেন যে, সমাজ রূপান্তরের লক্ষ্যে নিঃস্বার্থ সেবাকাজই হলো রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের আদর্শ। নিঃস্বার্থভাবে সেবাকাজ পরিচালনায় গুরুত্বদানের কারণে প্রথম থেকেই প্রচারের অন্তরালে থেকে গিয়েছে সঙ্ঘ। কিন্তু সঙ্ঘের বিকৃত আখ্যান এবং সঙ্ঘের আদর্শ-সম্পর্কিত নেতিবাচক বিমর্শ প্রচারে সক্রিয় থাকে নানা স্বার্থান্বেষী মহল। প্রথাগতভাবে আত্মপ্রচার-বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও সংগঠনের বিরুদ্ধে ক্রিয়াশীল এহেন উচ্চগ্রামে বাঁধা অপপ্রচারকে প্রতিহত করার জন্য প্রচার বিভাগের কাজ শুরু করে সঙ্ঘ। সঙ্ঙ্গ বিষয়ক যাবতীয় বিভ্রান্তি কাটানো, সব অপপ্রচারের প্রত্যুত্তর দান এবং জাতীয় স্বার্থে সর্বাত্মকভাবে একটি ইতিবাচক ও রাষ্ট্রবাদী দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন তখন সঙ্ঘের কাছে ‘অবশ্য কর্তব্য’ হয়ে দাঁড়ায়। প্রচার বিভাগের কাজ শুরু করার অর্থ কিন্তু সঙ্ঘের ‘আত্মপ্রচারবিরোধী’ মূল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচ্যুতি কোনোভাবেই নয়।
গত কয়েক দশক ধরে ভারতীয় জনজীবনে প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে সঙ্ঘ। এর পরিণামে ভারতীয় চিন্তাভাবনার পদ্ধতিতেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। আজ ভারতের প্রকাশনা সংস্থা এবং পত্রপত্রিকার বৃহত্তম নেটওয়ার্কগুলির মধ্যে অন্যতম হলো সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকদের দ্বারা পরিচালিত বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল। সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক মাধ্যমগুলিতে স্বয়ংসেবকদের দ্বারা পরিচালিত সংগঠনগুলি অনেক বেশি সক্রিয়।
দেশ-বিদেশের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যা সঙ্ঘের প্রচার বিভাগের দৃষ্টির বাইরে। সঙ্ঘের অখিল ভারতীয় স্তরে প্রচার বিভাগের পূর্ণকালীন দায়িত্বে বর্তমানে রয়েছেন একজন বরিষ্ঠ প্রচারক। এই দায়িত্বটি সঙ্ঘের সহ-সরকার্যবাহের দায়িত্বের সমতুল। সামাজিক মাধ্যমে সঙ্ঘের চিন্তাধারা প্রসারের কাজেও ব্যাপৃত প্রচার বিভাগ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, নিজস্ব প্রচার বিভাগ বাদে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা এবং পত্রপত্রিকাগুলি কিন্তু সরাসরি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের মালিকানাধীন নয়। সংস্থাগুলি সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকদের দ্বারা পরিচালিত। এই কারণে সরসঙ্ঘচালক ডাঃ মোহন ভাগবত প্রায়শই বলেন, ‘সঙ্ঘ শুধু সংগঠন করবে, আর স্বয়ংসেবকরা প্রতিটি ক্ষেত্রে কাজ করবে।
‘
আজ স্বয়ংসেবকরা ভারতের প্রায় সব ক’টি ভাষায় প্রকাশনা সংস্থা পরিচালনা করছেন। দেশজুড়ে স্বয়ংসেবকদের দ্বারা প্রকাশিত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার কম্বাইন্ড সার্কুলেশন বা মোট গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ২০ লক্ষ। এই প্রকাশনা সংস্থাগুলির অধিকাংশই স্বয়ংসম্পূর্ণ।
জাতীয় স্তরে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় উপস্থাপনের ক্ষেত্রে এই পত্রিকাগুলি ভূমিকা গ্রহণ করেছে। পত্রিকাগুলির মাধ্যমে সূচিত হয়েছে বিতর্ক, গঠিত হয়েছে জনমত। গোহত্যা নিবারণ, গঙ্গাদূষণ রোধ, স্বদেশি অভিযান, শ্রীরামজন্মভূমি মন্দির আন্দোলন, ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, নির্বাচনী সংস্কার, ওয়াকফ বোর্ডকে সামনে রেখে জেহাদি সন্ত্রাসের মতো বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে এই পত্রিকাগুলির পাতায়। এছাড়াও আলোচিত হয়েছে দেশের আরও নানা সমস্যা ও তার সমাধান। দেশ স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৪০-এর দশকের শেষের দিকে সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকরা বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা পরিচালনার কাজ শুরু করে। প্রথমে লক্ষ্ণৌ থেকে হিন্দিতে ‘পাঞ্চজন্য’ এবং দিল্লি থেকে ইংরেজি ভাষায় ‘অর্গানাইজার’ প্রকাশিত হয়। এর পরবর্তী পর্যায়ে
১৯৫০-এর দশকের গোড়ার দিকে আরও অনেকগুলি আঞ্চলিক প্রকাশনা সংস্থার কাজ শুরু হয়। বর্তমানে স্বয়ংসেবকদের দ্বারা ভারতের প্রায় প্রতিটি ভাষায় বিভিন্ন পত্রপত্রিকা সম্পাদিত ও প্রকাশিত হয়ে চলেছে।
বর্তমানে অনলাইন সংস্করণের যুগে মুদ্রিত হরফে প্রকাশিত পত্র- পত্রিকাগুলি যখন অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন, তখনও স্বয়ংসেবকদের দ্বারা প্রকাশিত পত্রিকাগুলি তাদের সার্কুলেশন বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। পত্রিকাগুলির গ্রাহক তথা পাঠক সংখ্যা কিন্তু কমেনি। মালয়ালম ভাষায় প্রকাশিত ‘কেশরী’র মতো পত্রিকা বিজ্ঞাপন অপেক্ষা গ্রাহক মূল্য হতে সংগৃহীত আয়ের ওপর অধিকমাত্রায় নির্ভরশীল। বর্তমানে এই পত্রিকাটির গ্রাহক সংখ্যা এক লক্ষেরও বেশি। সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে এই পত্রিকাগুলির আকার-আকৃতি, প্রচ্ছদ, লেখালেখির মান ইত্যাদি আরও উন্নত হয়েছে। প্রতিটি পত্রিকারই অনলাইন সংস্করণ রয়েছে, ইন্টারনেটের মাধ্যমে যা বিশ্বজুড়ে অসংখ্য ব্যক্তি ও স্বয়ংসেবকদের কাছে পৌঁছে যায়।
সঙ্ঘ নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে স্বয়ংসেবকদের দ্বারা চালিত পত্রিকা ও প্রকাশনা সংস্থাগুলিও তিনবার নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হয়। প্রতিবার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হওয়ার পর নিজস্ব পাঠক সংখ্যা পুনরুদ্ধারে পত্রিকাগুলি কোনোরকম সমস্যায় পড়েনি। স্বয়ংসেবকদের দ্বারা চালিত অধিকাংশ প্রকাশনা সংস্থা প্রাইভেট (বেসরকারি) বা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধীকৃত। লাভজনক সংস্থা না হলেও প্রতিটি সংস্থা স্বয়ংসম্পূর্ণ। কেন্দ্রীয় সরকার এবং বিভিন্ন রাজ্য সরকারের বিজ্ঞাপন ছাড়াও বহু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের থেকে এই পত্রিকাগুলিতে বিজ্ঞাপন সংগৃহীত হয়ে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে মূলধারার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে বহিষ্কৃত ও নির্বাসিত ছিলেন রাষ্ট্রবাদী সাংবাদিকরা। সাংবাদিকতার পেশায় যুক্ত স্বয়ংসেবকদের কার্যত একঘরে করে রাখা হয়। ‘স্বয়ংসেবক’ পরিচয়ে পরিচিত কোনো ব্যক্তির পক্ষে সংবাদমাধ্যমে চাকরি পাওয়া ছিল খুবই কঠিন। দেশজুড়ে জাতীয়তাবোধের জাগরণ সত্ত্বেও এহেন বৈষম্য আজও বিদ্যমান।
জাতীয় স্তরে বাম ও কংগ্রেসপন্থী পত্রিকাগুলির প্রাধান্যের সঙ্গে স্বয়ংসেবকদের দ্বারা প্রকাশিত পত্রিকাগুলির প্রভাবের তুলনামূলক বিশ্লেষণও আজ খুবই প্রাসঙ্গিক। বাম ও কংগ্রেসি পত্রিকাগুলি একদা ভারত সরকার এবং বিভিন্ন রাজ্য সরকারের অর্থসাহায্যে পুষ্ট হলেও স্বয়ংসেবকদের দ্বারা চালিত প্রকাশনা সংস্থাগুলি ছিল স্বনির্ভর। সরকারি সাহায্য বা রাজনৈতিক আনুকূল্যের ওপর তারা কোনোদিনই নির্ভরশীল ছিল না। ফলে কালের নিয়মে কমিউনিস্ট ও কংগ্রেসি পত্রিকাগুলি হারিয়ে যেতে থাকলেও রাষ্ট্রবাদী দর্শনের প্রচার মাধ্যমগুলি এখনও ভালোভাবে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পেরেছে। ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারির আগে ‘অর্গানাইজার’ ও ‘পাঞ্চজন্য’ প্রকাশনা সংস্থা ‘ভারত প্রকাশন’– ‘মাদারল্যান্ড’-নামক একটি অসাধারণ পত্রিকা প্রকাশ শুরু করে। দিল্লি থেকে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত এই দৈনিক পত্রিকাটির গর্জনে ভীত, শঙ্কিত হয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা জারি করেন। মাদারল্যান্ডের কার্যালয়ে পুলিশি অভিযান ও তল্লাশি চলে। পত্রিকাটির প্রেস (ছাপাখানা) ও বিভিন্ন মুদ্রণযন্ত্র বাজেয়াপ্ত করা হয়। মিসা আইনে গ্রেপ্তার হন পত্রিকার সম্পাদক কে.আর. মালকানি। পরবর্তীকালে ‘মাদারল্যান্ড’ পত্রিকার পুনঃপ্রকাশ সম্ভবপর না হলেও জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে অনবরত গর্জে ওঠে পাঞ্চজন্য ও অর্গানাইজারের প্রতিবাদী কলম। সাম্প্রতিক অতীতে, শ্রীরামজন্মভূমি মন্দির আন্দোলনের বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য। অসংখ্য লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক ও সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় কর্মীর জন্ম দেয় এই আন্দোলন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, এই রাষ্ট্রবাদী সংবাদমাধ্যমগুলির ‘এডিটোরিয়াল পলিসি’ বা সম্পাদকীয় নীতিকে কিন্তু কখনোই প্রভাবিত করে না রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। সংস্থাগুলিতে সঙ্ঘের কোনো সরাসরি হস্তক্ষেপও নেই। স্বয়ংসেবকদের চিন্তাধারা অনুযায়ী, স্বাধীন, স্বকীয়ভাবে পরিচালিত হয়ে চলেছে এতগুলি পত্র-পত্রিকা। প্রযুক্তির অস্বাভাবিক উন্নতির কারণে দেশজুড়ে যখন যখন ‘প্রিন্ট মিডিয়া’ বা মুদ্রিত সংবাদপত্রগুলি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই লড়ছে, তখন রাষ্ট্রসেবায় নিবেদিতপ্রাণ স্বয়ংসেবকদের উদ্যোগ, উদ্যম এবং সঙ্ঘের ক্রমবর্ধমান নেটওয়ার্কের দরুন রাষ্ট্রচেতনায় উদ্বুদ্ধ পত্র-পত্রিকাগুলির মধ্যে যেন সঞ্চারিত হয়েছে নতুন প্রাণ।