শুভেন্দুবাবুকে ধরতে তৎপর কেন মুখ্যমন্ত্রী?
নেই তাই খাচ্ছ…
নির্মাল্য মুখোপাধ্যায়
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিলক্ষণ জানেন শুভেন্দু অধিকারীকে জেল বা পুলিশ গারদের বাইরে রাখা তাঁর প্রশাসনের জন্য কতটা মারাত্মক। সিপিএম কখনো বিরোধী নেত্রী মমতা ব্যানার্জিকে জেল বা পুলিশ হেফাজতে রাখেনি। যুৎসই মামলাও দেয়নি। তারা তাঁর জঙ্গিপনাকে নাটক ভাবত। আইনি ব্যবস্থা নিত না। ফলে তিনি নেত্রী হননি। অত্যাচারী আর ক্ষমতালোভী হয়েও তাঁর প্রতি সিপিএমের ব্যবহার অভাবনীয়। সিপিএম চাইলে তাঁর সব আন্দোলনকে ধ্বংস করে দিতে পারত। কিন্তু সিপিএম নয়, তাঁর আসল সমস্যা ছিল রাজ্য কংগ্রেস নেতারা।
তিনি এখন ঠিক উলটো করছেন। যে কোনো প্রকারে তিনি শুভেন্দু অধিকারীকে গ্রেপ্তার করতে চান। আগাছা তৃণমূল সমর্থক আর বুদ্ধিহীনরা দাবি করেন উভয়ের সম্পর্ক অম্লমধুর। বোকা আর বুদ্ধিহীন বামপন্থীরা বিজেপি আর তৃণমূলের মধ্যে সেটিংতত্ত্ব নিয়ে অপপ্রচার করেন।
আদিতে কংগ্রেস, তারপর বিদেশি সিপিএম আর এখন তৃণমূল ক্লাবের বদান্যতায় পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। দাবি শুনলেই তা
বোঝা যায়। সিপিএম শাসনের কাছে বিরোধী নেত্রী কোনোদিন আশঙ্কার কারণ ছিলেন না। কারণ সিপিএম বিশ্বাস করত না যে তিনি তাদের ক্ষমতাচ্যুত করতে পারেন। শেষের বেলাতেও সিপিএমের এক মন্ত্রী একজন জাঁদরেল কংগ্রেস নেতাকে অঙ্ক কষে দিল্লিতে জানিয়েছিলেন, সিপিএম কেন ২০১১-র ভোট জিতবে। ফল উলটো হওয়ায় তিনি জানতে পারেন সিপিএমের জেলা কমিটিগুলিই রাজ্য নেতাদের বিভ্রান্ত করতে মিথ্যা জেতার রিপোর্ট পাঠাত। তখন সিপিএম সিপিএম-কে হারিয়েছিল। তৃণমূলের কোনো ভূমিকা ছিল না। আর ঠিক তাই শুভেন্দুবাবুকে যে কোনো প্রকারে আটক করতে চান বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দুবাবু দাবি করেছিলেন তিনি মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির ভিতর থেকে খবর পান। আদালত চাইলে তিনি এটাও জানাতে পারেন তৃণমূলের জাতীয় দলের
তকমা বাঁচাতে মুখ্যমন্ত্রী কতবার ফোনে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা’র দ্বারস্থ হয়েছিলেন। শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের করা ২০টির মধ্যে ১৫টি মামলা খারিজ করেছে কলকাতা হাইকোর্ট। প্রমাণ হয়েছে শুভেন্দুবাবুর বিরুদ্ধে রাজ্য সরকার কতটা হিংসাশ্রয়ী। বাকি ৫টি মামলায় বিশেষ তদন্ত কমিটি বা ‘সিট’ গঠন করে সিবিআই-কে রাখা হয়েছে। আদালত বুঝিয়েছে শুভেন্দুবাবুর ব্যাপারে কেন তৃণমূল পরিচালিত সরকারকে বিশ্বাস করা অনুচিত। কেন-বা শুভেন্দুবাবুকে অন্যরূপে রক্ষাকবচ দেওয়া প্রয়োজন। পক্ষান্তরে, আদলত রাজ্য সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে শুভেন্দুবাবুর বিরুদ্ধে মুড়ি-মুড়কির মতো ফৌজদারি মিথ্যা মামলা করা অনুচিত। কিন্তু ‘চোরা নাহি শোনে ধর্মের কাহিনি।’
পরের মাস থেকে রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ শুরু হচ্ছে। এখন পর্যন্ত মাত্র ৪৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ২০০২-এর তালিকার সঙ্গে সাযুজ্য পাওয়া গিয়েছে। গত তেরো বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির নিরিখে ভোটার বৃদ্ধির হার অভূতপূর্বভাবে আনুমানিক ১৬৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে কিছু সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে। ২০০২ সালে রাজ্যের জনসংখ্যা ছিল ৮.০২ কোটি আর ভোটার ৪.৫৮ কোটি। ২০২৪ পর্যন্ত জনসংখ্যা ছিল ১০.৩২ কোটি আর ভোটার ৭.৫৮ কোটি। শুভেন্দুবাবু যেমন মুখ্যমন্ত্রীর ভবানীপুর কেন্দ্রকে পাখির চোখ করে ২০২৬-এর ভোটে এগোচ্ছেন, তেমনই নন্দীগ্রামকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগোচ্ছে তৃণমূল।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই নন্দীগ্রামে ছাউনি ফেলেছেন। আর তাই ২০২৬-এর ভোটের লড়াইয়ের কেন্দ্র ভবানীপুর বনাম নন্দীগ্রাম। ভবানীপুরে জিততে মুখ্যমন্ত্রীর শুভেন্দু হিংসা যে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে সেটাই স্বাভাবিক। সিপিএম বিরোধী নেত্রীকে কোনোদিন আটক করেনি। এখন তিনি মুখ্যমন্ত্রী হয়ে শুভেন্দুবাবুকে সেটাই করতে চান। তবে তাতে লাভ শুভেন্দুবাবুর। একসময় রাজ্য-রাজনীতির পিছনের সারিতে দাঁড়ানো মুখ এখনকার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুবাবুর
অনুপাতে পিছনের সারিতেই রয়েছেন। নন্দীগ্রামে তাঁকে হারিয়েছিলেন শুভেন্দুবাবু। এখন সেই ঘা দগদগে হয়ে উঠেছে। ২০২৬-এর লড়াইয়ে তাই শুভেন্দুবাবুকে যে কোনোভাবে আটক আর হেনস্থা করে ভবানীপুর আর নন্দীগ্রাম একসঙ্গে জিততে চান মুখ্যমন্ত্রী। মনে রাখা প্রয়োজন, ২০০৬ সালে সিঙ্গুর আন্দোলনে বেআইনিভাবে জাতীয় সড়ক আটকে রাখা বিরোধী নেত্রী আটক হলে তিনি কোনোদিন মুখ্যমন্ত্রী হতেন না। সিপিএম প্রতিহিংসার রাজনীতি করেনি তাই তিনি বায়বীয় হননি। শুভেন্দুবাবুর বিরুদ্ধে সেই প্রতিহিংসার রাজনীতির উত্থান ঘটিয়ে তিনি কি রেহাই পাবেন?

















