পঞ্চ পরিবর্তন-এক যুগান্তকারী আহ্বান
বিশ্বের সর্ববৃহৎ স্বেচ্ছাসেবী, সামাজিক-সাংস্কৃতিক যুব সংগঠনের নাম যে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ তাহা শুধু ভারতবাসী নহে, সমগ্র বিশ্ববাসীও অবগত রহিয়াছেন। নাগপুরের যুবক স্বাধীনতা সংগ্রামী ডাঃ কেশব বলিরাম হেগগেওয়ার ভারতজননীর পুত্ররূপ সম্পূর্ণ হিন্দু সমাজের সংগঠন করিয়া দেশকে পরম বৈভবশালী করিবার লক্ষ্যে ১৯২৫ সালে এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন। প্রতিষ্ঠালগ্ন হইতেই নানা বিরোধিতা, অপপ্রচার, কুৎসার স্বীকার হইয়াও সমাজের সজ্জনশক্তির আশীর্বাদে এই বৎসরই বিজয়াদশমীতে তাহার যাত্রা শতবর্ষ পূর্ণ করিয়াছে। পরাধীনতার কালে রাষ্ট্রব্রতী এই সংগঠন যে বৈদেশিক শাসকের রোষানলে পড়িবে তাহা বলাই বাহুল্য। কেননা ভারতবর্ষের উত্থান তো তাহাদের কাম্য নহে, চিরকালই তাহারা ভারতবর্ষকে শৃঙ্খলিত ও পদদলিত রাখিতে চাহে। কিন্তু অস্বাভাবিক হইল স্বাধীন ভারতে শাসক কংগ্রেস দলও ইহার অপপ্রচার ও বিরোধিতা করিয়াছে এবং অদ্যাবধি করিয়া চলিয়াছে। মিথ্যা অভিযোগে তাহারা তিনবার এই সংগঠনকে নিষিদ্ধ করিয়াছে। কিন্তু সমাজের আশীর্বাদে সঙ্ঘ প্রতিবার সেই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াছে শুধু নহে, প্রতিবার আরও
অধিক তেজোদ্দীপ্ত হইয়া পূর্ণোদ্যমে রাষ্ট্রসেবায় মনোনিবেশ করিয়াছে। বৈদেশিক মতাদর্শপুষ্ট কমিউনিস্টরাও বহুবার সঙ্ঘকে আঘাত করিয়াছে। বহু স্বয়ংসেবককে তাহারা হত্যা পর্যন্ত করিয়াছে। কিন্তু রাষ্ট্রসেবায় ব্রতী সঙ্ঘের অগ্রগতিকে তাহারা রুদ্ধ করিতে পারে নাই। বরং তাহারাই ভারতীয় জনমানস হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া চিরতরে বিলীন হইবার উপক্রম হইয়াছে। ইতিহাস সাক্ষী, ভারতবর্ষে মাটিতে রাষ্ট্রবিরোধীরা চিরকাল নিশ্চিহ্ন হইয়াছে এবং রাষ্ট্রব্রতীরা স্বমহিমায় আরও উজ্জ্বল হইয়াছে। সঙ্ঘের শতবর্ষের পর্যালোচনায় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এই বিষয়ে প্রবন্ধও প্রকাশিত হইয়াছে, তাহাতে উল্লেখিত হইয়াছে যে রাষ্ট্রসেবায় ব্রতী সঙ্ঘ কীভাবে স্বমহিমায় তাহার শতবর্ষ পূর্ণ করিয়া অগ্রগতির পথে চলিয়াছে আর শুধুমাত্র রাষ্ট্র বিরোধিতাকে মূলমন্ত্র করিয়া কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া কীরূপে নিশ্চিহ্ন হইতে চলিয়াছে। এই কথা সকলেই স্বীকার করিবেন যে, সমাজরূপী রাষ্ট্রদেবতার সেবা করিয়াই সঙ্ঘ অজেয় শক্তির অধিকারী
হইয়াছে।
সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকগণ মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন, সংগঠিত ও সংস্কারিত সমাজই জাতির মেরুদণ্ড। আত্মবলে বলীয়ান হইলে জাতি অমর হয়, অজেয় হয়। সেই জন্য সঙ্ঘ তাহার যাত্রাপথে শতবর্ষ পূর্ণ করিয়া সম্পূর্ণ সমাজের আত্মবল বৃদ্ধির নিমিত্ত পঞ্চ পরিবর্তনের আহ্বান জানাইয়াছে। সর্বপ্রথম ব্যক্তিজীবনে ‘স্ব’-এর অভিব্যক্তির প্রতিফলন ঘটাইবার কথা বলা হইয়াছে। কেননা জাতির স্বাধীনতা প্রাপ্তি ঘটিলেও ব্যক্তিজীবন তথা রাষ্ট্রজীবনে প্রশাসনিক স্তরে ‘স্ব’-প্রকাশের কোনোরূপ ব্যবস্থা করা হয় নাই। ইহার পর ক্রমান্বয়ে পারিবারিক জীবনে মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠা, নাগরিক জীবনে কর্তব্যবোধ নির্মাণ, ভেদাভেদরহিত সমাজ রচনা এবং প্রকৃতিকে মাতৃজ্ঞান করিয়া পরিবেশ-বান্ধব জীবনযাপনের কথা বলা হইয়াছে। ইহার জন্য সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকগণ দেশব্যাপী গৃহ সম্পর্ক অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছেন। স্বয়ংসেবকদের বিশ্বাস যে, তাহাদিগের আহ্বানে সমগ্র সমাজ ইহাতে শামিল হইবে। আনন্দের বিষয় যে, সমাজবিজ্ঞানীরা সঙ্ঘের এই প্রচেষ্টাকে যুগান্তকারী অভিযান বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। বিশ্বের বহু রাজনেতা এই উদ্যোগের প্রশংসা করিয়াছেন। সমগ্র পৃথিবী আজ বিশ্ব উষ্ণায়ন, পরিবেশ দূষণ, যুদ্ধ, মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের অবনমন ইত্যাদি সমস্যায় জর্জরিত। ইহার সমাধানকল্পে তাহারা ভারতের মুখাপেক্ষী রহিয়াছে। সঙ্ঘ পঞ্চ পরিবর্তনের দ্বারা সমাজ পরিবর্তনের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সম্মুখে উদাহরণ সৃষ্টি করিতে চায়। সঙ্ঘ তাহার সংকল্প সফল করিবে তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই, কেননা সঙ্ঘের সহিত সমগ্র সমাজ রহিয়াছে।

















