টোটো মানে ভোটও
ভোটপ্রিয়াযু দিদি,
ভূগোল বইকে হারিয়ে দিয়েছে আমাদের বাংলা দিদি। বইতে পড়ানো হয়, পৃথিবীর তিন ভাগ জল আর এক ভাগ স্থল। কিন্তু এখন যা অবস্থা তাতে পশ্চিমবঙ্গের তিন ভাগ টোটো আর এক ভাগে স্থল। মজার শুনতে লাগলেও আসলে মজা নয়। শিক্ষিত বেকারদের ক্রীতদাস বানিয়ে রাখার এক রাজনৈতিক বুদ্ধি আপনার। প্রশংসা করতেই হবে। কিছু একটা করে খাক নীতিতে শাসকের ছত্রছায়ায় থাকা অটোচালকদের অটোক্রেসি চলত বাম আমলে। এতটাই দাপট ছিল সিটু নিয়ন্ত্রিত অটোর। এখন অটোর সঙ্গে এখন শহরে গ্রামে টোটোক্রেসি চলে।
তবে দিদি ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের মতো কঠিন ভোটের আগে টোটোচালকদের বৈধতা দেওয়ার নামে চির-ক্রীতদাস বানানোর যে পরিকল্পনা আপনি
করেছেন তা পাকা মাথার কাজ। পরিবেশ দূষণ যে ভাবে বাড়ছে তাতে ব্যাটারিচালিত টোটো ভালো। কিন্তু সেই টোটোর ভিড়ে যখন সর্বদা যানজট তৈরি হয় তখন আদতে পরিবেশের কোনো উন্নতিই হয় না বরং, দূষণ দ্বিগুণ বাড়ে। দিদি, যদি কোথাও কোনো কোনো অবৈধ ব্যবস্থা চালু থাকে তা নিয়ন্ত্রণ করা প্রশাসনের কর্তব্য। কিন্তু আমাদের রাজ্যে সব কিছুই বিচার করা হয় ভোটের অঙ্ক কষে। সেটা ফুটপাথ দখল করে থাকা হকার কিংবা রাস্তায় জমিদারি চালানো টোটো। শেষে একটা সহজ সমাধান বার করেন আপনি। অবৈধকে বৈধ বানিয়ে দাও। রাস্তার হকারদের প্রথমে অবৈধ বলে দাগিয়ে দাও। সত্যিটা বলার পরে তাঁদের রেজিস্ট্রেশন ইত্যাদি করে বৈধ বানিয়ে দাও। পুরসভার অনুমোদিত ‘প্ল্যান’-এর তোয়াক্কা না করে যথেচ্ছ বহুতল নির্মাণের পর সামান্য
জরিমানা দিয়ে তাকে ‘বৈধ’ করে নেওয়া হয়। এমনকী, দীঘা, মন্দারমণিতে সমুদ্রের তটভূমি সংক্রান্ত আইনি নির্দেশিকাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তৈরি হওয়া হোটেলও ভাঙা যায় না, কারণ এই রাজ্যে ‘বুলডোজার রাজ’ চলবে না। এবার অবৈধ টোটোকে বৈধ করার কাজ করছে রাজ্য। টোটো মানে পশ্চিমবঙ্গে নিয়ম মানার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ‘যেমন খুশি চলো’। ফলে, পাড়ার গলি থেকে জাতীয় সড়ক, সর্বত্রই তাদের অবাধ বিচরণ। রাস্তায় ভুল দিকে চলা; ‘নো এন্ট্রি’-র পরোয়া না করা; যে ফাঁকে সুচ গলে না সেখান দিয়েই গলে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস বজায় রাখা; এবং আশেপাশে দাঁড়িয়ে বা চলতে থাকা গাড়ির গায়ে নিজেদের স্বাক্ষর রেখে যাওয়া, এ সবই পশ্চিমবঙ্গের টোটোদের স্বভাবধর্ম। এমনকী অনেকে ব্যাটারির চার্জ কমে যাবে বলে রাতে আলোটাও জ্বালেন না। এসব দেখেও চুপ থাকাই দস্তুর, কারণ কে না জানে, তাদের মাথায় কার আশীর্বাদী হাত রয়েছে। অতএব টোটোর দৌলতে নিত্য যানজট, নিত্য বিশৃঙ্খলা চলবে। এবারে সেই বিশৃঙ্খলা বাড়ানোর জন্য বৈধতা দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সঙ্গে একটি টোটো পিছু সেই পরিবারের ৫-৬টি
ভোট নিশ্চিত। এইসব টোটোকে ভোটের সময়ে টাকাও দেওয়া যাবে ভাড়া বাবদ। কারণ, নির্বাচন কমিশনের এখনও পর্যন্ত যা নিয়ম তাতে গাড়ির সংখ্যার হিসাব রাখা হয় টোটো সেই তালিকাতেই নেই। ফলে শাসকের টোটো দাপট চলবে। এই বুদ্ধির প্রসংসা করতেই হবে দিদি। প্রশংসা বাদ দিয়ে আমি যা যা বললাম তা কিন্তু আমার বক্তব্য নয় দিদি। আমি আপনার অনুগত ভাই বলে কথা। ওগুলো লোকে বলছে তাই আপনাকেই চিঠিতে লিখলাম। পাঁচকান করব না মোটেও।
এখন রাজ্যে টোটোর সংখ্যা কমপক্ষে ১০ লক্ষ। জনসংখ্যা ১০ কোটি। মানে প্রতি ১০০ জনে একজন টোটোচালক আর ৯৯ জন যাত্রী। এটা বলছেন, পরিবহন দপ্তরের কর্তারা। খুব তাড়াতাড়ি দেখবেন, নথিভুক্ত টোটোর পাশাপাশি লাইনে এসে দাঁড়াবে নতুন অবৈধ টোটো। অশান্তি চরমে ওঠার পর প্রশাসন নিশ্চয়ই আরও এক বার এই অন্যায়কে বৈধ করে তোলার চেষ্টা করবে। সেই চেষ্টার উপরে জমা হবে নতুন অবৈধ কার্যক্রমের পলিমাটি। এ এক অনন্ত চক্র। এর থেকে মুক্তি মিলবে এমন আশা রাজ্যবাসী আর করেন না। ফলে দিদি, আপনি চালিয়ে খেলুন। দশ লক্ষ টোটো সেনা নিয়ে ভোটের ময়দানে
লাফিয়ে পড়ুন।

















