জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের নির্দেশক হিসেবে ‘প্রজনন পার্থক্য’ কি একটি সূচক?
ভারতের জনসংখ্যাগত পরিপ্রেক্ষিতটি বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সহাবস্থানে চিহ্নিত, যার মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান এই দুটি হলো প্রধান গোষ্ঠী। অতিথি কলম ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার সময় হিন্দুরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৪.১ শতাংশ ছিল, আর মুসলমানরা ছিল প্রায় মণিপুষ্পক ৯.৮ শতাংশ। পরবর্তী কয়েক দশকে ধীরে ধীরে এই অনুপাতের পরিবর্তন ঘটেছে।
১৯৭১ সালের জনগণনা অনুযায়ী হিন্দুরা মোট জনসংখ্যার ৮২.৭ শতাংশ, আর মুসলমানরা ১১.২ শতাংশ উন্নীত হয়েছিল। ২০১১ সালের সর্বশেষ জনগণনায় হিন্দু জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৯.৮ শতাংশ এবং মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১৪.২ শতাংশ।
যদিও হিন্দুরা এখনোও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী, তবে মুসলমানদের তুলনামূলকভাবে উচ্চতর সংখ্যা বৃদ্ধির হার দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি ক্রম-বর্ধমান জনসংখ্যাগত অসাম্য সৃষ্টি করেছে। এই জনসংখ্যার আকারের পার্থক্য এবং তার প্রবণতা বোঝা ভারতের চলমান জনসংখ্যাগত রূপান্তর এবং তার সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
প্রজনন প্রবণতা : ভারত বর্তমানে একটি প্রজনন রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বর্তমানে ভারতের মোট প্রজনন হার প্রতিস্থাপন স্তরের নীচে নেমে এসেছে।
প্রতিস্থাপন স্তরের প্রজনন হার হলো সেই হার, যেখানে একটি প্রজন্ম নিজেকে সম্পূর্ণভাবে প্রতিস্থাপন করে, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যা বৃদ্ধি বা হ্রাস পায় না। এটি সাধারণত ২.১ সন্তান প্রতি নারী হিসেবে ধরা হয় (Craig, 1994)। (সারণী-১ দ্রষ্টব্য)
সারণী ১ স্পষ্টভাবে দেখায় যে, সমস্ত ধর্মীয় গোষ্ঠীতেই প্রজনন হার ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। NFHS-5 (2019-21) অনুযায়ী হিন্দুদের প্রজনন হার ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। NFHS-5 (2019-21) অনুযায়ী হিন্দুদের প্রজনন হার ১.৯৪-এ নেমে এসেছে।
মুসলমানদের মোট প্রজনন হারও নিম্নমুখী হলেও তা এখনোও অন্যান্য ধর্মের তুলনায় বেশি।
এই গবেষণায় এই প্রজনন পার্থক্যের কারণগুলি বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এর সম্ভাব্য জনসংখ্যাগত পরিণতি পর্যালোচনা করা হয়েছে।
কারণসমূহ: বয়সভিত্তিক প্রজনন হার Pasupuleti প্রমুখ (২০১৭)-এর গবেষণায় দেখা যায় যে, মুসলমান নারীদের প্রজনন বয়সে হিন্দু নারীদের তুলনায় ধারাবাহিক ভাবে বেশি বয়সভিত্তিক প্রজনন হার হয়ে থাকে।
হিন্দু নারীদের ক্ষেত্রে মধ্য ও শীর্ষ প্রজনন বয়সে হারের পতন অনেক বেশি, যেখানে মুসলমান নারীদের পতন তুলনামূলকভাবে ধীর। গবেষণায় আরও দেখা যায় যে, মুসলমান নারীদের প্রজনন সময়কাল হিন্দু নারীদের তুলনায় দীর্ঘতর।
(সারণী-২ দ্রষ্টব্য) সারণী ২ অনুসারে দেখা যায়, মুসলমান ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ে অধিক সন্তান নেওয়ার ইচ্ছা বেশি। হিন্দুদের ক্ষেত্রে দুই সন্তানের পর এই ইচ্ছা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, যেখানে মুসলমানদের । মধ্যে তা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে।
সারণী ৩ : ধর্ম অনুযায়ী নবম শ্রেণী বা তার বেশি স্তরের শিক্ষা সম্পন্ন নারীর শতাংশ (NFHS-5 অনুযায়ী)
শিক্ষা নবম শ্রেণী বা তার বেশি ধর্ম স্তরের শিক্ষা সম্পন্ন করেছেন (%)
হিন্দু ৫০.৬
মুসলমান ৪১.৬
খ্রিস্টান ৬২.১
শিখ ৫৯.৫
বৌদ্ধ ৬১.৬
জৈন ৮৯.৫
অন্যান্য ৪০.৩
সারণী ৩ থেকে দেখা যায় যে, মুসলমান নারীদের সাক্ষরতার হার হিন্দু নারীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম এবং এই পার্থক্যটি পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ (p <0.001)।
বিভিন্ন গবেষণায় নারীর সাক্ষরতা ও প্রজনন হারের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক পাওয়া গেছে (Robey, 1990; Saurabh et al., 2013; Kumar & Singh, 2025), যা এই দুই সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা বৃদ্ধির পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে।
সারণী ৪: ধর্ম অনুযায়ী কিশোরী মাতৃত্ব (NFHS-5 অনুযায়ী) কিশোরী মাতৃত্ব
ধর্ম কিশোরী মাতৃত্বের
হাল (%)
হিন্দু ৬.৫
মুসলমান ৮.৪
খ্রিস্টান ৬.৮
শিখ ২.৮
বৌদ্ধ ৩.৭
জৈন ১.১
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে কিশোরী মাতৃত্বের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেলেও, NFHS-5 অনুয়ায়ী মুসলমান নারীদের মধ্যে ১৫-১৯ বছর বয়সের মধ্যে সন্তান ধারণের হার অন্য ধর্মের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ বেশি।
গবেষণায় দেখা যায়, কৈশোরে সন্তান ধারণকারী নারীদের পরিবার সাধারণত বড়ো হয় এবং সন্তানদের জন্মের ব্যবধানও কম থাকে (Hobcraft & Kiernan, zool; Sing, 1998) এছাড়া দেখা গিয়েছে যে, মুসলমান মহিলাদের মধ্যে প্রারম্ভিক বিবাহ বা কম বয়সে বিবাহের সংখ্যা বেশি যা কিশোরীদের গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়ায়, ইসলামি সম্প্রদায়ে প্রারম্ভিক বিবাহের মজহবি অনুমোদনের কারণে এটি হয়ে থাকে (Jejeebhoy, 1998; Sing & Samara, 1996; UNFPA, 2020) |
সারণী ৫ : নারী শ্রমশক্তি অংশগ্রহণ (উৎস : Open Govern- ment Data, PLFS)
নারী শ্রমশক্তি অংশগ্রহণ PLFS
ধর্মীয় গোষ্ঠী 2021-22 হিন্দু ২৬.১ মুসলমান ১৫ খ্রিস্টান ৩৪.২ শিখ ১৯.৮ সর্বমোট ২৪.৮
2022-23 হিন্দু ৩০.৫ মুসলমান ১৪.২ খ্রিস্টান ৩৫.১ শিখ ২৩.৫ সর্বমোট ২৭.৮
2023-24 হিন্দু ৩৩.৩ মুসলমান ২১.৪ খ্রিস্টান ৩৮.৩ শিখ ২৬.৭ সর্বমোট ৩১.৭
PLFS অর্থ: Periodic Labour Force Survey সারণী ৫ অনুযায়ী দেখা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে হিন্দু ও খ্রিস্টান নারীদের কর্মক্ষেত্র অংশগ্রহণ মুসলমান নারীদের তুলনায় অনেকে বেশি এবং এই পার্থক্য পরিসংখ্যানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি প্রজনন হার কমায় (Ahn & Mira, 2002; Becker, 1960; Goldin,
1995)। এর কারণ হলো দেরিতে বিবাহ, কর্মজীবনের চাপ এবং ছোটো পরিবারের প্রতি ঝোঁক।
সারণী ৬: ধর্ম অনুযায়ী গর্ভনিরোধক ব্যবহার (NFHS-5 অনুযায়ী)
গর্ভনিরোধক ব্যবহার
ধর্ম হিন্দু মুসলমান খ্রিস্টান শিখ বৌদ্ধ জৈন অন্যান্য
গর্ভনিরোধক ব্যবহার (%) ৬৭.৯ ৬০.২ ৬১.৮ ৬৭.৯ ৬৭২ ৭৩.৮ ৫৯.৮
উন্নয়নশীল দেশগুলিতে প্রজনন হ্রাসের প্রধান কারণ হলো গর্ভনিরোধক ব্যবহারের বৃদ্ধি।
১৯৮০-র দশক থেকে গর্ভনিরোধকের ব্যবহারের হার জাতীয় গড়ের নীচে, যদিও তা ক্রমাগত উন্নত হচ্ছে। শিক্ষা, নগরায়ন ও গণমাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে আধুনিক গর্ভনিরোধক পদ্ধতির গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে (New et al, 2017)1
বহুবিবাহ
MFHS-5 (2019-21) অনুযায়ী, বহুবিবাহের হার মুসলমানদের মধ্যে সর্বোচ্চ (১.৯ শতাংশ), এরপর অন্যান্য ধর্ম (১.৬ শতাংশ) এবং সর্বনিম্ন হিন্দুদের মধ্যে (১.৩ শতাংশ)
যদিও প্রজনন হারের সঙ্গে বহুবিবাহের সম্পর্কের বিষয়ে গবেষণা হয়নি, এই তথ্য সম্পূর্ণতার জন্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অবৈধ অভিবাসন ও প্রজনন হার
অনেক বাংলাদেশি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে পশ্চিমবঙ্গ ও অসমে অবৈধভাবে প্রবেশ করেন। সীমান্তের ভৌগোলিক জটিলতা, দুর্বল নজরদারি এবং স্থানীয় নেটওয়ার্কের কারণে এই অভিবাসন সহজতর হয়েছে (Datta, 2004; Mayitvaganan, 2019)।
অসমের অভিবাসী গ্রামগুলিতে নারীদের মধ্যে সর্বোচ্চ আদর্শ প্রজনন হার পাওয়া যায়- ৩১.৫ শতাংশ নারীর চার বা ততোধিক সন্তান এবং ৬০.৯ শতাংশ নারী বৃহৎ পরিবারকে আদর্শ মনে করেন (Saikia et al., 2019) |
এই প্রজনন পার্থক্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ বিবেচনার পরেও অব্যাহত থাকে।
পরিণাম হিন্দু সমাজের মধ্যে প্রজনন হার দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবার উন্নতির ফলে জীবন প্রত্যাশা বেড়েছে, ফলে মৃত্যুহার কমে গেলেও জন্মহার হ্রাস পাওয়ায় বয়স্ক জনসংখ্যার অনুপাত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে নির্ভরতার হার বৃদ্ধি পায়, অর্থাৎ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর তুলনায় বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে (McDonald & Kippen, 2001)।
হিন্দুরা ভবিষ্যতেও বৃহত্তম ধর্মীয় গোষ্ঠী থাকবেন, তবে তরুণ জনসংখ্যার অনুপাত কমে যাবে। অর্থাৎ হিন্দু জনসংখ্যা দ্রুত বার্ধক্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
মুসলমানদের ক্ষেত্রে প্রজনন হার এখনোও প্রতিস্থাপন স্তরের উপরে রয়েছে এবং বয়সভিত্তিক প্রজনন হারও বেশি। শিক্ষার নিম্ন স্তর, কম কর্মসংস্থান ও প্রারম্ভিক বিবাহ- এগুলিও এর কারণ।
Hadwiger Function Model ব্যবহার করে ২০৩০ ও ২০৩৫ সালের জন্য প্রজনন হারের পূর্বাভাস করা হয়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে মুসলমানদের প্রজনন হারও ধীরে ধীরে প্রতিস্থাপন স্তরের নীচে নেমে আসবে। তবে প্রতিবেশী দেশ থেকে অবৈধ অভিবাসনের কারণে এই পতনের গতি ধীর হতে পারে।
উপসংহার ভারত বর্তমানে একটি ধীর গতির ধর্মীয় জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে- যেখানে হিন্দু জনসংখ্যা ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে, আর মুসলমান জনসংখ্যা বাড়ছে।
এই প্রবণতার পেছনে কিছু সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কারণ রয়েছে:
• নারীর নিম্ন সাক্ষরতা হার, • প্রারম্ভিক বিবাহ, • বৃহৎ পরিবারের প্রতি পছন্দ, • কম গর্ভনিরোধক ব্যবহার, ও নারীর কম কর্মসংস্থান। অতিরিক্তভাবে, অবৈধ ও বৈধ অভিবাসন এবং অভিবাসীদের উচ্চতর প্রজনন হার এই বৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
অন্যদিকে, হিন্দু সমাজের নারীর শিক্ষা, দেরিতে বিবাহ, শহুরে জীবনযাত্রার চাপ ও ক্ষুদ্র পরিবারপ্রীতির কারণে প্রজনন হার দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।
এর ফলে, বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর অনুপাত বৃদ্ধি পাবে এবং তরুণ জনগোষ্ঠী হ্রাস পাবে- যা ভবিষ্যতে ভারতের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
নীতিগত সুপারিশ: • কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবনের মধ্যে ভারসাম্য আনা, • পিতামাতাদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ও সুবিধা বৃদ্ধি, • সন্তান প্রতিপালন সাশ্রয়ী করা, • সচেতনতা কর্মসূচি চালু করা জরুরি।
জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের নির্দেশক হিসেবে ‘প্রজনন পার্থক্য’ কি একটি সূচক?
ভারতের জনসংখ্যাগত পরিপ্রেক্ষিতটি বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সহাবস্থানে চিহ্নিত, যার মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান এই দুটি হলো প্রধান গোষ্ঠী। অতিথি কলম ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার সময় হিন্দুরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৪.১ শতাংশ ছিল, আর মুসলমানরা ছিল প্রায় মণিপুষ্পক ৯.৮ শতাংশ। পরবর্তী কয়েক দশকে ধীরে ধীরে এই অনুপাতের পরিবর্তন ঘটেছে।
১৯৭১ সালের জনগণনা অনুযায়ী হিন্দুরা মোট জনসংখ্যার ৮২.৭ শতাংশ, আর মুসলমানরা ১১.২ শতাংশ উন্নীত হয়েছিল। ২০১১ সালের সর্বশেষ জনগণনায় হিন্দু জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৯.৮ শতাংশ এবং মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১৪.২ শতাংশ।
যদিও হিন্দুরা এখনোও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী, তবে মুসলমানদের তুলনামূলকভাবে উচ্চতর সংখ্যা বৃদ্ধির হার দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি ক্রম-বর্ধমান জনসংখ্যাগত অসাম্য সৃষ্টি করেছে। এই জনসংখ্যার আকারের পার্থক্য এবং তার প্রবণতা বোঝা ভারতের চলমান জনসংখ্যাগত রূপান্তর এবং তার সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
প্রজনন প্রবণতা : ভারত বর্তমানে একটি প্রজনন রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বর্তমানে ভারতের মোট প্রজনন হার প্রতিস্থাপন স্তরের নীচে নেমে এসেছে।
প্রতিস্থাপন স্তরের প্রজনন হার হলো সেই হার, যেখানে একটি প্রজন্ম নিজেকে সম্পূর্ণভাবে প্রতিস্থাপন করে, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যা বৃদ্ধি বা হ্রাস পায় না। এটি সাধারণত ২.১ সন্তান প্রতি নারী হিসেবে ধরা হয় (Craig, 1994)। (সারণী-১ দ্রষ্টব্য)
সারণী ১ স্পষ্টভাবে দেখায় যে, সমস্ত ধর্মীয় গোষ্ঠীতেই প্রজনন হার ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। NFHS-5 (2019-21) অনুযায়ী হিন্দুদের প্রজনন হার ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। NFHS-5 (2019-21) অনুযায়ী হিন্দুদের প্রজনন হার ১.৯৪-এ নেমে এসেছে।
মুসলমানদের মোট প্রজনন হারও নিম্নমুখী হলেও তা এখনোও অন্যান্য ধর্মের তুলনায় বেশি।
এই গবেষণায় এই প্রজনন পার্থক্যের কারণগুলি বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এর সম্ভাব্য জনসংখ্যাগত পরিণতি পর্যালোচনা করা হয়েছে।
কারণসমূহ: বয়সভিত্তিক প্রজনন হার Pasupuleti প্রমুখ (২০১৭)-এর গবেষণায় দেখা যায় যে, মুসলমান নারীদের প্রজনন বয়সে হিন্দু নারীদের তুলনায় ধারাবাহিক ভাবে বেশি বয়সভিত্তিক প্রজনন হার হয়ে থাকে।
হিন্দু নারীদের ক্ষেত্রে মধ্য ও শীর্ষ প্রজনন বয়সে হারের পতন অনেক বেশি, যেখানে মুসলমান নারীদের পতন তুলনামূলকভাবে ধীর। গবেষণায় আরও দেখা যায় যে, মুসলমান নারীদের প্রজনন সময়কাল হিন্দু নারীদের তুলনায় দীর্ঘতর।
(সারণী-২ দ্রষ্টব্য) সারণী ২ অনুসারে দেখা যায়, মুসলমান ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ে অধিক সন্তান নেওয়ার ইচ্ছা বেশি। হিন্দুদের ক্ষেত্রে দুই সন্তানের পর এই ইচ্ছা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, যেখানে মুসলমানদের । মধ্যে তা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে।
সারণী ৩ : ধর্ম অনুযায়ী নবম শ্রেণী বা তার বেশি স্তরের শিক্ষা সম্পন্ন নারীর শতাংশ (NFHS-5 অনুযায়ী)
শিক্ষা নবম শ্রেণী বা তার বেশি ধর্ম স্তরের শিক্ষা সম্পন্ন করেছেন (%)
হিন্দু ৫০.৬
মুসলমান ৪১.৬
খ্রিস্টান ৬২.১
শিখ ৫৯.৫
বৌদ্ধ ৬১.৬
জৈন ৮৯.৫
অন্যান্য ৪০.৩
সারণী ৩ থেকে দেখা যায় যে, মুসলমান নারীদের সাক্ষরতার হার হিন্দু নারীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম এবং এই পার্থক্যটি পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ (p <0.001)।
বিভিন্ন গবেষণায় নারীর সাক্ষরতা ও প্রজনন হারের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক পাওয়া গেছে (Robey, 1990; Saurabh et al., 2013; Kumar & Singh, 2025), যা এই দুই সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা বৃদ্ধির পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে।
সারণী ৪: ধর্ম অনুযায়ী কিশোরী মাতৃত্ব (NFHS-5 অনুযায়ী) কিশোরী মাতৃত্ব
ধর্ম কিশোরী মাতৃত্বের
হাল (%)
হিন্দু ৬.৫
মুসলমান ৮.৪
খ্রিস্টান ৬.৮
শিখ ২.৮
বৌদ্ধ ৩.৭
জৈন ১.১
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে কিশোরী মাতৃত্বের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেলেও, NFHS-5 অনুয়ায়ী মুসলমান নারীদের মধ্যে ১৫-১৯ বছর বয়সের মধ্যে সন্তান ধারণের হার অন্য ধর্মের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ বেশি।
গবেষণায় দেখা যায়, কৈশোরে সন্তান ধারণকারী নারীদের পরিবার সাধারণত বড়ো হয় এবং সন্তানদের জন্মের ব্যবধানও কম থাকে (Hobcraft & Kiernan, zool; Sing, 1998) এছাড়া দেখা গিয়েছে যে, মুসলমান মহিলাদের মধ্যে প্রারম্ভিক বিবাহ বা কম বয়সে বিবাহের সংখ্যা বেশি যা কিশোরীদের গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়ায়, ইসলামি সম্প্রদায়ে প্রারম্ভিক বিবাহের মজহবি অনুমোদনের কারণে এটি হয়ে থাকে (Jejeebhoy, 1998; Sing & Samara, 1996; UNFPA, 2020) |
সারণী ৫ : নারী শ্রমশক্তি অংশগ্রহণ (উৎস : Open Govern- ment Data, PLFS)
নারী শ্রমশক্তি অংশগ্রহণ PLFS
ধর্মীয় গোষ্ঠী 2021-22 হিন্দু ২৬.১ মুসলমান ১৫ খ্রিস্টান ৩৪.২ শিখ ১৯.৮ সর্বমোট ২৪.৮
2022-23 হিন্দু ৩০.৫ মুসলমান ১৪.২ খ্রিস্টান ৩৫.১ শিখ ২৩.৫ সর্বমোট ২৭.৮
2023-24 হিন্দু ৩৩.৩ মুসলমান ২১.৪ খ্রিস্টান ৩৮.৩ শিখ ২৬.৭ সর্বমোট ৩১.৭
PLFS অর্থ: Periodic Labour Force Survey সারণী ৫ অনুযায়ী দেখা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে হিন্দু ও খ্রিস্টান নারীদের কর্মক্ষেত্র অংশগ্রহণ মুসলমান নারীদের তুলনায় অনেকে বেশি এবং এই পার্থক্য পরিসংখ্যানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি প্রজনন হার কমায় (Ahn & Mira, 2002; Becker, 1960; Goldin,
1995)। এর কারণ হলো দেরিতে বিবাহ, কর্মজীবনের চাপ এবং ছোটো পরিবারের প্রতি ঝোঁক।
সারণী ৬: ধর্ম অনুযায়ী গর্ভনিরোধক ব্যবহার (NFHS-5 অনুযায়ী)
গর্ভনিরোধক ব্যবহার
ধর্ম হিন্দু মুসলমান খ্রিস্টান শিখ বৌদ্ধ জৈন অন্যান্য
গর্ভনিরোধক ব্যবহার (%) ৬৭.৯ ৬০.২ ৬১.৮ ৬৭.৯ ৬৭২ ৭৩.৮ ৫৯.৮
উন্নয়নশীল দেশগুলিতে প্রজনন হ্রাসের প্রধান কারণ হলো গর্ভনিরোধক ব্যবহারের বৃদ্ধি।
১৯৮০-র দশক থেকে গর্ভনিরোধকের ব্যবহারের হার জাতীয় গড়ের নীচে, যদিও তা ক্রমাগত উন্নত হচ্ছে। শিক্ষা, নগরায়ন ও গণমাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে আধুনিক গর্ভনিরোধক পদ্ধতির গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে (New et al, 2017)1
বহুবিবাহ
MFHS-5 (2019-21) অনুযায়ী, বহুবিবাহের হার মুসলমানদের মধ্যে সর্বোচ্চ (১.৯ শতাংশ), এরপর অন্যান্য ধর্ম (১.৬ শতাংশ) এবং সর্বনিম্ন হিন্দুদের মধ্যে (১.৩ শতাংশ)
যদিও প্রজনন হারের সঙ্গে বহুবিবাহের সম্পর্কের বিষয়ে গবেষণা হয়নি, এই তথ্য সম্পূর্ণতার জন্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অবৈধ অভিবাসন ও প্রজনন হার
অনেক বাংলাদেশি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে পশ্চিমবঙ্গ ও অসমে অবৈধভাবে প্রবেশ করেন। সীমান্তের ভৌগোলিক জটিলতা, দুর্বল নজরদারি এবং স্থানীয় নেটওয়ার্কের কারণে এই অভিবাসন সহজতর হয়েছে (Datta, 2004; Mayitvaganan, 2019)।
অসমের অভিবাসী গ্রামগুলিতে নারীদের মধ্যে সর্বোচ্চ আদর্শ প্রজনন হার পাওয়া যায়- ৩১.৫ শতাংশ নারীর চার বা ততোধিক সন্তান এবং ৬০.৯ শতাংশ নারী বৃহৎ পরিবারকে আদর্শ মনে করেন (Saikia et al., 2019) |
এই প্রজনন পার্থক্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ বিবেচনার পরেও অব্যাহত থাকে।
পরিণাম হিন্দু সমাজের মধ্যে প্রজনন হার দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবার উন্নতির ফলে জীবন প্রত্যাশা বেড়েছে, ফলে মৃত্যুহার কমে গেলেও জন্মহার হ্রাস পাওয়ায় বয়স্ক জনসংখ্যার অনুপাত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে নির্ভরতার হার বৃদ্ধি পায়, অর্থাৎ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর তুলনায় বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে (McDonald & Kippen, 2001)।
হিন্দুরা ভবিষ্যতেও বৃহত্তম ধর্মীয় গোষ্ঠী থাকবেন, তবে তরুণ জনসংখ্যার অনুপাত কমে যাবে। অর্থাৎ হিন্দু জনসংখ্যা দ্রুত বার্ধক্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
মুসলমানদের ক্ষেত্রে প্রজনন হার এখনোও প্রতিস্থাপন স্তরের উপরে রয়েছে এবং বয়সভিত্তিক প্রজনন হারও বেশি। শিক্ষার নিম্ন স্তর, কম কর্মসংস্থান ও প্রারম্ভিক বিবাহ- এগুলিও এর কারণ।
Hadwiger Function Model ব্যবহার করে ২০৩০ ও ২০৩৫ সালের জন্য প্রজনন হারের পূর্বাভাস করা হয়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে মুসলমানদের প্রজনন হারও ধীরে ধীরে প্রতিস্থাপন স্তরের নীচে নেমে আসবে। তবে প্রতিবেশী দেশ থেকে অবৈধ অভিবাসনের কারণে এই পতনের গতি ধীর হতে পারে।
উপসংহার ভারত বর্তমানে একটি ধীর গতির ধর্মীয় জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে- যেখানে হিন্দু জনসংখ্যা ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে, আর মুসলমান জনসংখ্যা বাড়ছে।
এই প্রবণতার পেছনে কিছু সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কারণ রয়েছে:
• নারীর নিম্ন সাক্ষরতা হার, • প্রারম্ভিক বিবাহ, • বৃহৎ পরিবারের প্রতি পছন্দ, • কম গর্ভনিরোধক ব্যবহার, ও নারীর কম কর্মসংস্থান। অতিরিক্তভাবে, অবৈধ ও বৈধ অভিবাসন এবং অভিবাসীদের উচ্চতর প্রজনন হার এই বৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
অন্যদিকে, হিন্দু সমাজের নারীর শিক্ষা, দেরিতে বিবাহ, শহুরে জীবনযাত্রার চাপ ও ক্ষুদ্র পরিবারপ্রীতির কারণে প্রজনন হার দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।
এর ফলে, বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর অনুপাত বৃদ্ধি পাবে এবং তরুণ জনগোষ্ঠী হ্রাস পাবে- যা ভবিষ্যতে ভারতের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
নীতিগত সুপারিশ: • কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবনের মধ্যে ভারসাম্য আনা, • পিতামাতাদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ও সুবিধা বৃদ্ধি, • সন্তান প্রতিপালন সাশ্রয়ী করা, • সচেতনতা কর্মসূচি চালু করা জরুরি।

















