বন্দে মাতরম্ মন্ত্র দেশবাসীর হৃদয়ে আগুন জ্বালিয়ে ছিল
অমিত কুমার চৌধুরী
কয়েকটি ধ্বনি আমাদের দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে আজও দেশবাসী অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও উৎসাহের সঙ্গে দিয়ে থাকেন তার মধ্যে একটি হলো বন্দেমাতরম। বন্দেমাতরম ধ্বনির প্রভাব সবচেয়ে বেশি বলে মনে হয়। এই মন্ত্র কানে গেলে ব্রিটিশ সরকার ভীত হয়ে পড়তো, যা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এক অমোঘ অস্ত্র ছিল ভারতবাসীর। অপরদিকে ভারতবাসীর মধ্যে এক অসাধারণ উন্মাদনা তৈরি করত। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বিশেষ করে বিপ্লবীদের কাছে এটি এক দেশপ্রেমের মহামন্ত্র হয়ে উঠেছিল। এই গানটি ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতীক হয়ে উঠেছিল। তার জন্য ব্রিটিশ সরকার একে নিষিদ্ধ করেছিল। বন্দেমাতরম মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে ভারতমাতার শত শত বীর সন্তান হাসিমুখে দেশমাতৃকার বেদীমূলে নিজেদের জীবন সমর্পণ করেছিলেন। ফাঁসির দড়িকে চুম্বন করে দেশমাতৃকাকে বিদেশি শাসন থেকে মুক্ত করেছিলেন নিঃস্বার্থ ভাবে, নির্ভীক ভাবে। সেই বন্দেমাতরম মন্ত্রের এই বছর ১৫০ বছর পূর্তি।
সাহিত্যিসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৭৫ সালে হুগলী জেলার চুঁচুড়াতে গঙ্গা নদীর কাছে জোড়াঘাটে আঢ্য পরিবারের একটি সাদা রঙের বাড়িতে প্রথম বন্দেমাতরম গানটি রচনা করেন। পরবর্তীতে ১৮৮২ সালে বঙ্কিমচন্দ্র তার সেই বিখ্যাত উপন্যাস আনন্দমঠ প্রকাশ করে তার মধ্যেই বন্দেমাতরম গানটি অন্তর্ভুক্ত করেন। এই আনন্দমঠ উপন্যাসই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রেরণার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। আর বন্দেমাতরম গানটি হয়ে উঠে বিপ্লবীদের সঞ্জীবনী মন্ত্র। আনন্দমঠে বঙ্কিমচন্দ্র। দেশমাতা অতীতে কেমন ছিলেন, বর্তমানে কেমন হয়েছেন ও ভবিষ্যতে কেমন হবেন তা দেখিয়েছেন।
যদুনাথ ভট্টাচার্য এই গানের সুর দিয়েছিলেন। ১৮৯৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতার বিডন স্কোয়ারে কংগ্রেসের অধিবেশনে বন্দেমাতরম গানটি গেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ গানটি ‘দেশ’ রাগে প্রকাশ করেন যা বঙ্কিমচন্দ্রেরও প্রিয় ছিল। ১৯০৫ সালে বেনারস কংগ্রেস অধিবেশনে সরলাদেবী চৌধুরাণী গানটি পুনরায় গেয়েছিলেন।
১৯০৫ সালে হীরালাল সেন প্রথম রাজনৈতিক ছবিতে বন্দেমাতরম গান দিয়ে শেষ করেছিলেন। আনন্দমঠ, লিডার ও অমরআশা সিনেমায় গানটি গাওয়া হয়েছে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, পণ্ডিত রবিশঙ্করও গানটি নিয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন। লতা মঙ্গেস্কর ছাড়াও বহু প্রখ্যাত শিল্পী তাঁদের সুললিত কণ্ঠে গানটি গেয়েছেন। ১৯০৬ সালে নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত গানটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। ভারতের সব মুখ্য ভাষাতে গানটি অনুবাদ করা হয়েছে। আরিফ মহম্মদ খান
তিনিও বন্দেমাতরম গানটি উর্দু ভাষাতে অনুবাদ করেছেন। ২০০২ সালে BBC World Service-এর এক সমীক্ষায় বন্দেমাতরম গানটি বিশ্বে ৭০০০ গানের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেছে।
১৯০৭ সালে ভিকাজী কামার তৈরি জার্মানিতে ত্রিরঙা জাতীয় পতাকার মাঝখানে বন্দেমাতরম লেখা ছিল। লালা লাজপত রায় লাহোরে বন্দেমাতরম নামে এক পত্রিকা শুরু করেছিলেন। ১৯০৫ সালে বিপিনচন্দ্র পাল ইংরেজি ভাষায় বন্দেমাতরম নামে পত্রিকার প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে বিপ্লবী অরবিন্দ
ঘোষ এই পত্রিকার সম্পাদনা করতেন ও কঠোর ভাবে ইংরেজ শাসনের সমালোচনা করতেন। এই পত্রিকার মাধ্যমে দেশবাসীকে তিনি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতেন।
বৃদ্ধা মাতঙ্গিনী হাজরা ব্রিটিশের গুলিতে প্রাণ ত্যাগের সময় বন্দেমাতরম ছিল তাঁর শেষ কথা। ১৯০৭ সালে বরিশালে ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট ডিএইচ কিংসফোর্ড বন্দেমাতরম বলে প্রতিবাদ করায় ১৫ বছরের কিশোর সুশীল সেনকে ১৫ ঘা বেত্রাঘাত করার সময় সুশীল সেন প্রতিটি চাবুকের উত্তর বন্দেমাতরম বলেই দিয়েছিলেন। তবুও তাঁর মুখ থেকে বন্দেমাতরম বন্ধ করতে পারেনি। এমনই ছিল সেই মন্ত্রের শক্তি। এই রকম শত শত বিপ্লবী বন্দেমাতরম মন্ত্র উচ্চারণ করে
বীরের মৃত্যু বরণ করেন। ব্রিটিশ আমলে এই নিষিদ্ধ বন্দেমাতরম ধ্বনি উচ্চারণের জন্য সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা ডাক্তার হেডগেওয়ার তাঁর বাল্যকালে নাগপুরের নিজ স্কুল থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন।
১৯৩৭ সালে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি প্রথম বন্দেমাতরম গানটির প্রথম দুটি স্তবক জাতীয় সংগীত হিসেবে ঘোষণা করে। গান্ধীজী, মৌলানা আজাদ, জওহরলাল নেহরু, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনুমোদন দেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় মুসলিম লিগ এবং মহম্মদ আলি জিন্না এই গানের বিরোধিতা করেন ইসলামের দোহাই দিয়ে। কাকিনাড়া কংগ্রেস অধিবেশনে এই গান গাওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন মহম্মদ আলি ও শওকত আলি। যে গান কোটি কোটি মানুষকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করছে, দেশের জন্য নির্ভীক ভাবে আকাতরে প্রাণ দিয়েছে অথচ কিছু মানুষ তার বিরোধিতা করলো। যারা
করেছিল তারাই এই দেশকে অপবিত্র ভূমি বলে ভারত ভাগ করেছেন। দেশকে টুকরো করেছিল। স্বাধীনতার এতো বছর পরও আজও তারা নেতা বন্দেমাতরম গাইতে অস্বীকার করে।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর মৃত্যুশয্যায় তাঁর মেয়েকে ‘বন্দেমাতরম’ গান সম্পর্কে বলেছিলেন- ‘দেখবি এই সংগীত একদিন ভারতবাসীর অন্তরে আগুন জ্বালিয়ে দিবে।’ অর্থাৎ তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেছিলেন, তাঁর রচিত এই গান ভবিষ্যতে ভারতীয়দের মধ্যে দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার চেতনা ছড়িয়ে দেবে
এবং তা হয়েছিল। বন্দেমাতরম গানের ১৫০ বছর পূর্তিতে সেই মহান সংগীতের রচয়িতা দ্রষ্টা বঙ্গিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে জানাই শত শত প্রণাম।

















