বাম সহোদরের মতো তৃণমূলও কি ‘জল ভোটেই’ জিতছে?
সানাইখানা গর্জে যত…
নির্মাল্য মুখোপাধ্যায়
দুধ-জল আলাদা করার এসআইআর বাঁশী বাজতেই তর্জন গর্জন চালু করেছে তৃণমূল কংগ্রেসের কচি, বুড়ো ও মাঝারি নেতারা। ভয়ের ঘরে জন্ম তৃণমূলের। ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে প্রায় ৫০ কোটি ভোটারের নাম সংবলিত ভোটার তালিকা সংশোধিত হতে চলেছে। এই রাজ্যে প্রায় সাড়ে সাতকোটি ভোটারের নাম তালিকায় রয়েছে। তার ভিতর এক কোটির বেশি ভুয়ো বলে বিজেপি নেতৃত্বের দাবি। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের প্রাপ্ত ৪৫ শতাংশ ভোটে জল আছে। ২০১৪ থেকে তৃণমূল জল ভোটেই জেতে। ২০১১ সালে হেরে যাওয়ার পরে একটি দলীয় চিঠিতে সিপিএম স্বীকার করেছিল যে, তারা
জল ভোটে জিতত। সেদিনের তৃণমূলনেত্রীর কথায় ‘সায়েন্টিফিক রিগিং’। ১৯৮২ থেকে ১৯৯৬ সিপিএম এইভাবেই জিতেছিল। সম্প্রতি দাবি উঠেছে যে, এই রাজ্যের ২৫০-র বেশি বিধানসভা আসনে প্রায় ৩০ শতাংশ ভোটার বেড়েছে। কলকাতার কিছু তা বিস্তর কমেছে। ব্যতিক্রম রাজনীতির অঙ্গ হলেও এক্ষেত্রে তার অঙ্গহানি হয়েছে। এসআইআর-এর পর বিহারে প্রায় ৮ শতাংশ ভোটার বাদ পড়েছে। এক তৃণমূল নেতার দাবি বিহারের থেকে কম ভোটার এখানে বাদ যাবে। বিহারে প্রায় ৩৬ লক্ষ মৃত ভোটার পাওয়া গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে বিগত বছরগুলিতে অস্বাভাবিক হারে ভোটার সংখ্যা বৃদ্ধি
ঘটলেও এর বিপ্রতীপে রাসবিহারী-সহ কলকাতার অনেকগুলি বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা বাড়ার পরিবর্তে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলনেত্রীর কেন্দ্র ভবানীপুর ছাড়াও বেহালা ও জোড়াসাঁকোতেও ভোটার কমেছে।
তৃণমূল নেতৃত্বের সততা নিয়ে অনেক আগেই প্রশ্ন উঠেছে। প্রচুর দাগি অপরাধী, সমাজ বিরোধী ও জেহাদি তৃণমূলের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠায় তাদের অস্বস্তি বেড়েছে। তৃণমূল নেতৃত্বের কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। জেহাদিদের ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলার শক্তি তৃণমূলের নেই। এই মুহূর্তে তৃণমূল দলের রাশ পেশাদার আইপ্যাক সংস্থার হাতে। তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার ভ্রাতুষ্পুত্র অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কেবল পোস্টার নেতা হিসেবে প্রচার করেন। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর থেকে ১৫টি বড়ো অনিষ্ট হয়েছে। তাতে তৃণমূল দল এবং তার পরিচালিত সরকার যুক্ত নয়- এই দাবি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো দিনকে রাত বানানো নেত্রীও করতে পারবেন না। মৃতদেহ নিয়ে বিভ্রান্তির রাজনীতি তৃণমূল আগেও করেছে ২০১৬-র নোটবাতিলের সময়। লাভ হয়নি।
২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে এ রাজ্যে বিজেপি ভালো ফল করে। সেই ভোটে বিধানসভার নিরিখেও বিজেপির ফল ছিল চমকপ্রদ। একদা বিখ্যাত কবিয়াল হরু ঠাকুর এবং তাঁর চেলা ভোলা ময়রার কথায় সানাইটা না গর্জে, যত তর্জে যে তার পোঁ-এর দল। চরম দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে গোটা তৃণমূল দলটার জেলে থাকার কথা। তদন্তকারী সংস্থা ও বিচারবিভাগের আরও সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ এক্ষেত্রে আবশ্যক। তৃণমূলের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন জেলের বাইরে থাকার কারণেই প্রকাশ্যে আসছে তাদের এই তর্জন-গর্জন। বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়! সূর্যের থেকেও বালুর তাপ বেশি! চার্জশিটে অভিযুক্ত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপি কর্মীদের গাছে বাঁধার নিদান দিয়েছেন। অথচ তিনি যে দলের দু’নম্বর নেতা, সেই দলের বিরুদ্ধে সবধরনের দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
একদা পশ্চিমবঙ্গের যুব কংগ্রেস নেত্রী এবং পরে তৃণমূলনেত্রীকে সিপিএম কখনও গ্রেপ্তার করেনি। অনেকে ঠাট্টা করেন যে, তিনিই অভিষেকবাবুর গ্রেপ্তার না হওয়ার কায়দাটা রপ্ত করিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের দৈনিক কাজে রাজনৈতিক নেতাদের অনুপ্রবেশ বা হস্তক্ষেপ নিশ্চিতভাবে কাম্য নয়, তা সে কেন্দ্র হোক বা রাজ্য সরকারি শাসক দল। স্বাধীনতার পর থেকেই স্বজনপোষণ এবং সম্প্রদায় তোষণের রাজনীতির জনক কংগ্রেস। ১৯৫১ সালে প্রথম ভোটার তালিকা প্রস্তুত হওয়ার পর থেকে দেশে আট বার এসআইআর হয়েছে। ২০০২ সালে পশ্চিমবঙ্গে শেষবার ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন সংঘটিত হয়। সেই সময় এনডিএ জোট পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকারের শরিক ছিলেন তৃণমূলনেত্রী। টু শব্দটিও তখন করেননি। দল গড়ার পর থেকেই তৃণমূলনেত্রী
রাজনৈতিকভাবে স্বার্থপর। তাই বিভিন্ন সময় অবিবেচকের ভূমিকা নিতে তার কোনো আপত্তি থাকে না। এসআইআর ও সিএএ বিরোধিতা তারই উদাহরণ। তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, তৃণমূলনেত্রীর- দেশের আইন-কানুন, সংবিধান বিরোধিতা কি অযথা জনপ্রিয়তা আদায়ের চেষ্টা? যে কোনো কেন্দ্রীয় আইন বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে মুসলমান-বিরোধী আখ্যা দিয়ে অনেকটাই নিশ্চিন্ত বোধ করেন তৃণমূলনেত্রী। এটা বেদনার যে, এই রাজ্যের হিন্দু ভোটারদের একাংশ মনেই করেন না যে তাঁরা হিন্দু এবং ‘হিন্দু’ হিসেবেই তাঁরা এ রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ। সেই সুযোগে বাম-কংগ্রেস ও তৃণমূল তথাকথিত সংখ্যালঘু মুসলমানদের দাবার বোড়ে বানিয়ে নির্বাচনী সংখ্যাগরিষ্ঠতার রাজনীতি করে ভোটে জেতার জন্য। তাই ‘হিন্দুদের অগ্রাধিকার’ প্রতিষ্ঠিত না হলে এই পোঁ-এর দলরা জিততেই থাকবে। হিন্দুরাই হিন্দুদের হস্তা হবেন। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক সংস্থা। এসআইআর হলো আইন-মাফিক পরিচালিত একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। অথচ তাতে খুঁত ধরার জন্য তারাই বিরোধিতায় মেতেছেন, যার নিজেদের নাম কিনতে প্রতিনিয়ত সংবিধান ধুয়ে জল খান। ইন্ডিজোটে শামিল
বামপন্থীরা এককালে ভারতের স্বাধীনতাকে ‘ঝুটা’ বা মিথ্যা বলত। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলনেত্রী ইন্ডিজোটের দ্বিচারী রাজনীতিকদেরই একজন। এই রাজনীতিকরা ভারতের আইন-কানুন বা সংবিধানকে ন্যূনতম সম্মান করে না। সাংবিধানিক সংস্থার প্রতি তারা অপমানজনক কথাবার্তা বলে এবং তার বিরুদ্ধে আন্দোলনে থাকার বড়াই করে। তাই সাধু সাবধান!

















