‘বন্দে মাতরম্’-এর অঙ্গচ্ছেদ স্বীকার্য নহে
‘বন্দে মাতরম্’ শব্দবন্ধের অর্থ হইল মাতাকে বন্দনা করি। এখানে মাতা বলিতে ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র মাতৃভূমিকে ইঙ্গিত করিয়াছেন। মাতৃভূমির বন্দনা তথা
মাহাত্ম্য কীর্তন ভারতীয় সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। অথর্ববেদে উল্লেখিত হইয়াছে- ‘মাতাভূমি পুত্রোহহম্ পৃথিব্যাঃ’। অর্থাৎ এই পৃথিবী হইল আমার
মাতা এবং আমি তাহার পুত্র। শুক্লযজুর্বেদের রাষ্ট্রবিবর্ধন মন্ত্রে দেশের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির জন্য ধরিত্রীমাতার নিকট প্রার্থনা করিবার কথা বলা হইয়াছে।
ভগবান শ্রীরামচন্দ্র হইতে আধুনিককালের মহারাণা প্রতাপ, ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ-সহ দেশের বীর যোদ্ধাগণ মাতৃভূমিকে স্বীয় গর্ভধারিণীর ন্যায় পূজা ও
বন্দনা করিয়াছেন। বেদ-উপনিষদ-পুরাণ-ইতিহাসে যেভাবে মাতৃভূমির বন্দনার কথা বলা হইয়াছে, তাহারই নির্যাস রূপে মাতৃভূমির স্তবমন্ত্র জাতিকে প্রদান
করিয়াছেন সাহিত্যসম্রাট ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র। তিনি নিজেই বলিয়াছিলেন, এই গান একদিন রাষ্ট্র জাগরণের বোধন মন্ত্রে পরিণত হইবে। ১৯০৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সর্বভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস কমিটি বারাণসী অধিবেশনে ‘বন্দে মাতরম্’কে জাতীয় সংগীতের মর্যাদা দিয়াছিল। তাহার পর হইতে উক্ত দিনটিকে
সমগ্র ভারতে ‘বন্দে মাতরম্’ দিবস রূপে পালন করা হইয়াছে। স্বাধীনতার পূর্বে কংগ্রেসের অধিবেশনগুলি ‘বন্দে মাতরম্’ সংগীতের মাধ্যমেই শুরু করা
হইত। কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য, তোষণনীতির কারণে কংগ্রেস তাহাদের সিদ্ধান্ত হইতে সরিয়া আসিয়াছে। শুধু তাহাই নহে, মোল্লাবাদী মানসিকতার নিকট
নতিস্বীকার করিয়া কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ ‘বন্দে মাতরম্’-এর অঙ্গচ্ছেদ পর্যন্ত স্বীকার করিয়াছে। দেশমাতৃকা এবং দেশমাতৃকার স্তবমন্ত্র যে অভিন্ন, তোষণনীতির
কারণে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের তাহা বিস্মরণ ঘটিয়াছিল। দেশমাতৃকার স্তবমন্ত্রের অঙ্গচ্ছেদের পরিণতিস্বরূপ যে দেশমাতৃকার অঙ্গচ্ছেদ ঘটিয়াছে, এই প্রমাণিত
সত্যকে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ অস্বীকার করিবেন কীরূপে? দেশমাতৃকার বন্দনা গানের বিষয়ে মজহবি মানসিকতাকে প্রশ্রয় দিয়া কংগ্রেস দেশ ও জাতির ললাটে
দুর্ভাগ্যের কালিমা লেপন করিয়াছে। তাহারা হৃদয়ঙ্গম করিতে পারে নাই যে, ‘বন্দে মাতরম্’ ভারতের মর্ম সংগীত, ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের হৃদয়োৎসারিত গান,
স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেরণাদায়ী ধ্বনি। ইহার মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম অথবা সম্প্রদায়ের কথা বলা হয় নাই। মোল্লাবাদী মুসলমানদের সহিত সাম্রাজ্যবাদী
ইংরাজও ‘বন্দে মাতরম্’-এর বিরোধিতা করিয়াছে। ইংরাজ তো ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনিকেও নিষিদ্ধ করিয়াছিল। এই ধ্বনিতে মুখরিত হইবার কারণে ভারতবাসীর
উপর নামাইয়া আনিয়াছিল প্রবল নির্যাতন। তোষণনীতির কারণে কংগ্রেস তাহার প্রতিবাদ না করিয়া নীরবে সর্বপ্রকার অন্যায় স্বীকার করিয়াছিল।
১৯৩৭ সালে ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যে কংগ্রেসের মন্ত্রীসভা গঠিত হইয়াছিল। তখন দেশের রাষ্ট্রভক্ত মানুষ ভাবিয়াছিলেন, এইবার বোধ হয়
জাতীয় স্বর ‘বন্দে মাতরম্’-এর উপর হইতে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়া যাইবে এবং ভারতবাসী তাহাদের প্রাণের সংগীত গাহিতে পারিবে। কিন্তু ক্ষমতালোভী কংগ্রেস
রাষ্ট্রভক্ত মানুষের সেই আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করিবার ন্যায় বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে পারে নাই। অল ইন্ডিয়া রেডিয়োতেও ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়ার
উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করিয়াছিল ইংরাজ শাসক। ইহার বিরুদ্ধে প্রখ্যাত গায়ক মাস্টার কৃষ্ণরাও অনেক প্রতিবাদ করিয়াছিলেন। তিনি সংকল্প করিয়াছিলেন,
অল ইন্ডিয়া রেডিয়োতে ‘বন্দে মাতরম্’ না গাওয়া হইলে তিনিও রেডিয়োতে কোনো গান গাহিবেন না। বহুদিন তিনি অল ই ন্ডিয়া রেডিয়োতে গান গাওয়া বন্ধ
রাখিয়াছিলেন। দেশ স্বাধীন হইলে, নিষেধাজ্ঞা বাতিল হইলে পুনরায় তিনি গান শুরু করিয়াছিলেন। জাতির দুর্ভাগ্য, ১৯৫০ সালে কংগ্রেস পরিচালিত সরকার
ওই তোষণনীতি মাথায় রাখিয়া ভারতীয় সাধারণতন্ত্রের রাষ্ট্রগীত হিসাবে খণ্ডিত ‘বন্দে মাতরম্’কেই মান্যতা দিয়াছে। তাহার পরও কংগ্রেস ঘোষণা করিয়াছে,
‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়া বাধ্যতামূলক নহে। তামিলনাড়ু রাজ্য উচ্চ আদালত একসময় রাজ্যের সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম্’ গাহিবার রায় দিয়াছিল।
তখনও কংগ্রেসের একই কথা, আদালত কাহাকেও ‘বন্দে মাতরম্’ গাহিতে বাধ্য করিতে পারে না। এই বিতর্কের মধ্যে স্বস্তি যে, সার্ধশতবর্ষ পূর্বে ঋষি
বঙ্কিমচন্দ্র যে ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন, ‘একদিন প্রতিটি ভারতবাসী গানটি বেদমন্ত্রের ন্যায় গাহিবে, বিরোধিতা করা হইলেও এই গানের জনপ্রিয়তা
কখনোও হ্রাস পাইবে না’- এই ঋষিবাক্য সত্য প্রমাণিত হইয়াছে। ২০০২ সালে একটি আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় ‘বন্দে মাতরম্’ বিশ্বের দ্বিতীয় জনপ্রিয়
সংগীতের মর্যাদা লাভ করিয়াছে। এই কথা সত্য যে রাষ্ট্রভক্ত মানুষ কোনোদিনই ‘বন্দে মাতরম্’-এর অঙ্গচ্ছেদ স্বীকার করেন নাই। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক
সঙ্ঘ-সহ বহু সংগঠন তাহাদের অনুষ্ঠানে সম্পূর্ণ ‘বন্দে মাতরম্’ গাহিয়া থাকেন। ‘বন্দে মাতরম্’-এর সার্ধশতবর্ষে দেশের কোটি কোটি রাষ্ট্রভক্ত মানুষের পক্ষ হইতে কেন্দ্রীয় সরকারের নিকট স্বস্তিকা পত্রিকা দাবি জানাইতেছে যে, সংসদে আইন প্রণয়ন করিয়া হইলেও সম্পূর্ণ ‘বন্দে মাতরম্’-এর গায়ন বাধ্যতামূলক করা হউক।

















