শতবর্ষে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ
এক বিশ্বরূপ দর্শন
শিবেন্দ্র ত্রিপাঠী
তখন আশির দশক। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক
সঙ্ঘ তার পঞ্চাশ বছরের চলার পথ পূর্ণ
করেছে। কিন্তু তখনও দেশে সঙ্ঘ একটি প্রায়
অপরিচিত নাম। সে সময় পত্রপত্রিকায়
সঙ্ঘের কোনো খবর ছাপা- এ ছিল
কল্পনারও অতীত। তখন বরুণ সেনগুপ্ত
বর্তমান পত্রিকার সম্পাদক। বরুণবাবুর
প্রেরণায় সে পত্রিকায় লিখতেন পবিত্র কুমার
ঘোষ, জয়ন্ত ঘোষাল, সুখরঞ্জন সেনগুপ্ত,
প্রবীর ঘোষালের মতো জাতীয়তাবাদী
হিন্দুত্বপ্রেমী সাংবাদিকরা। সে বর্তমান
আজকের মতো শাসকদলের পদলেহনকারী
মুসলমানপন্থী হয়ে যায়নি। তখন আমার
বয়স ১২/১৩ হবে। বালক বয়েস। দু’তিন
বছর হলো সঙ্ঘের শাখায় যোগ দিয়েছি।
মনে আছে একদিন বর্তমান পত্রিকায় পাঁচের
পাতার এক কোনে সরসঙ্ঘচালক
বালাসাহেব দেওরসের একটা এক
লাইনের উক্তি ছাপা ছিল। তাতেই আনন্দে
আত্মহারা হয়ে উঠেছিলাম আমরা। তারপর
সেই লেখাটি কাঁচি দিয়ে কেটে লোককে
দেখিয়ে দেখিয়ে বলতাম দেখো আমাদের
সংগঠন কত বড়ো তার নাম পত্রিকায়
বেরিয়েছে।
সে ৫০ বছর আগেকার কথা। দেশের
মানুষের কাছে সঙ্ঘ ছিল অপরিচিত। কারণ
সঙ্ঘ সেদিন আজকের মতো সমাজের
সর্বস্তরে ব্যাপ্ত হয়নি। আর সঙ্ঘ সেদিন
শাখায় শাখায় তরুণ-বালক-যুবকদের নিয়ে
খেলাধুলা, শরীরচর্চা ও বৌদ্ধিক বিকাশের
কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তার একমাত্র
লক্ষ্য ছিল আগামী প্রজন্মকে দেশভক্ত
চরিত্রবান নাগরিক হিসেবে নির্মাণ করা, যারা
দেশের জন্য বাঁচতে শিখবে, দেশের জন্য
মরতে শিখবে। স্বামীজী বলেছিলেন-
‘মানুষ চাই মানুষ আর সব হইয়া যাইবে।’
সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠাতা ডাক্তার কেশব বলিরাম
হেডগেওয়ার স্বামীজীর সেই মানুষ তৈরির
স্বপ্নকে সাকার করার সংকল্প নিয়ে সঙ্ঘের
শাখা শুরু করেছিলেন। শাখা মানে রাষ্ট্রভক্ত
মানুষ তৈরির কঠিন সাধনা। এই মানুষ
হাটে-বাজারে রেডিমেড পাওয়া যায় না।
সভাসমিতি করে, ভাষণ দিয়ে, দেওয়াল
লিখনে, বিজ্ঞাপনেও মেলা অসম্ভব। নিত্য
প্রতিদিন কঠোর অভ্যাসের দ্বারা নির্মাণ
করতে হয়। শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলেছিলেন,
প্রতিদিন ঘটি মাজলে, তবে ঘটি চকচকে
থাকবে, তা না হলে ঘটিতে কস পড়ে ঘটি
কালো হয়ে যাবে। পরিষ্কার ঘটির জলই
ঈশ্বরের পায়ে অর্পণ করা উচিত। সঙ্ঘও
মনুষ্যরূপী ঘটিকে প্রতিদিন সংস্কাররূপী
মার্জনার দ্বারা মনের উপর জমা কালিমা
পরিষ্কার করে তাকে সতত উজ্জ্বল রাখার
কাজ করে চলেছে। তবেই তো তা
রাষ্ট্রদেবতার অঞ্জলি দেওয়ার যোগ্য হবে।
এ কাজ সাধনার কাজ, এ কাজ প্রচারের দ্বারা
হয় না। তাই তখন সঙ্ঘে কোনো প্রচার
বিভাগ ছিল না। তার একমাত্র লক্ষ্য চরিত্রবান
দেশভক্ত ব্যক্তি নির্মাণ।
স্থাপনার প্রথম ৫০ বছর অর্থাৎ ১৯২৫
থেকে ১৯৭৫ সঙ্ঘ ছিল মানুষের কাছে প্রায়
অজ্ঞাত পরিচয়হীন এক সংগঠন। কিন্তু
১৯৫০ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত এই ২৫ বছর
সঙ্ঘের শাখায় সংস্কারিত স্বয়ংসেবকরা
সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গিয়ে তৈরি করলেন
অনেক সহযোগী সংগঠন- রাষ্ট্র সেবিকা
সমিতি, বিদ্যার্থী পরিষদ, বনবাসী কল্যাণ
আশ্রম, বিদ্যা ভারতী, ভারতীয় জনসঙ্ঘ
(অধুনা বিজেপি), বিশ্ব হিন্দু পরিষদ,
ভারতীয় মজদুর সঙ্ঘ, কিষাণ সঙ্ঘ প্রভৃতি।
২৫ বছর ধরে স্বয়ংসেবকরা তাদের অক্লান্ত
পরিশ্রম করে তাদের পোঁতা সেই চারা
গাছগুলিকে পরিচর্যা করলেন। ২০০০ সাল
আসতে আসতে সঙ্ঘের ৭৫ বছরে সেই
ছোট্ট চারাগাছগুলি চারিদিকে শাখাপ্রশাখা
বিস্তার করে ধীরে ধীরে বিশাল বৃক্ষে পরিণত
হলো। তখন দেশের মানুষ সঙ্ঘের নাম,
সঙ্ঘের আদর্শ জানতে ও বুঝতে শুরু
করলেন।
সঙ্ঘ হিন্দুত্বের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের
পুনর্নির্মাণে বিশ্বাসী। সমাজে সঙ্ঘের
গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকায় হিন্দুত্ব বিরোধী
কংগ্রেস ও বামপন্থীরা স্বয়ংসেবকদের
বিরুদ্ধে কুৎসা শুরু করল। সঙ্ঘ কী? তার
কাজ কী? এই কথা দেশের মানুষ প্রথম
স্বয়ংসেবকদের মুখ থেকে শোনেনি।
শুনেছে সঙ্ঘ বিরোধীদের কাছ থেকে। কারণ
স্বয়ংসেবকরা ছিল প্রচার বিমুখ। ধীরে ধীরেস্বয়ংসেবকরা অনুভব করলেন এই কুৎসা ও
অপপ্রচারের জবাব দেওয়া উচিত। দেশের
বিরুদ্ধে ক্রমাগত ষড়যন্ত্র করে যাওয়া এই
বাম-কংগ্রেস নেক্সাসকে প্রতিহত করা
উচিত। সে লক্ষ্যে ১৯৯৪ সালে শুরু হলো
সঙ্ঘের প্রচার বিভাগের কাজ। কিন্তু সঙ্ঘের
প্রচার বিভাগ সঙ্ঘের মহিমামণ্ডন করার জন্য
নয়। হাজার হাজার বছরের প্রাচীন ভারতের
সনাতন সংস্কৃতি, সভ্যতা, ঐতিহ্য,
গৌরবময় ইতিহাস প্রচার করার জন্যই শুরু
হয়েছে। আজ ২০২৫, সঙ্ঘের শতবর্ষে
ভারতীয় জনমানসে জমে থাকা বিভ্রান্তির
কালো মেঘ সরে গিয়ে নির্মল আকাশ
প্রকাশিত হচ্ছে। দেশের মানুষ ধীরে ধীরে
সঙ্ঘের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কার্যপদ্ধতির সম্বন্ধে
সঠিক তথ্য জানতে বুঝতে শুরু করেছে।
কংগ্রেস রাজনৈতিক চক্রান্ত করে সঙ্ঘকে
তিন-তিন বার নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু সঙ্ঘ
প্রত্যেকটি অগ্নি পরীক্ষায় শুধু নিষ্কলুষই
প্রমাণিত হয়নি, বরং প্রতিবার পূর্বাপেক্ষা
উজ্জ্বলতর ভাবে স্বমহিমায় প্রকটিত হয়েছে।
সনাতন বৈদিক পরম্পরায় অন্যতম স্তম্ভ
হলো চতুরাশ্রম। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত
মানুষের জীবনচর্যা কেমন হবে তর
পথনির্দেশ হলো এই চতুরাশ্রম। সুদীর্ঘ
একশো বছর ধরে সঙ্ঘের পথ চলা যেন সেই
চতুরাশ্রমেরই অনুসরণ। সঙ্ঘের অগ্রগতি
যদি লক্ষ্য করা যায় তবে দেখা যাবে ১৯২৫
থেকে ১৯৫০- এই প্রথম ২৫ বছর ছিল
তার ব্রহ্মচর্য অর্থাৎ নিজেকে নির্মাণের সময়।
১৯৫০ থেকে ১৯৭৫- পরবর্তী ২৫ বছর
ছিল তার গার্হস্থ্যের কাল। অর্থাৎ সমাজে
নতুন নতুন সংগঠনের জন্মদান ও তাকে
বড়ো করার প্রয়াস। তারপর ১৯৭৫ থেকে
২০০০- এই ২৫ বছর ছিল তার বানপ্রস্থ,
অর্থাৎ সেই সংগঠনগুলিকে নিজের পায়ে
দাঁড় করা, সুসংহত করা, সমাজের কাজে
প্রস্তুত করানোর সময় ছিল সেটি। আর
২০০০ সাল থেকে আজও পর্যন্ত- এই ২৫
বছর তার সন্ন্যাস-আশ্রম। এই সময়ে সঙ্ঘ
নিজেকে সমাজ সেবার কাজে ব্যাপৃত করে
নিজেকে সমাজে বিলীন করে দিতে
চেয়েছে।
সঙ্ঘের জন্ম থেকে শতবর্ষ, এ যেন চতুরাশ্রমেরই এক অনন্য নিদর্শন। পার্থক্য শুধু এটুকুই, এই চার ভাগে সঙ্ঘ কখনোই তার মূল কাজ ব্যক্তিনির্মাণের প্রক্রিয়া থেকে সরে আসেনি। স্বামীজী বলেছিলেন ১০০ একশো যুবক পেলে তিনি দেশকে পালটে দিতে পারেন, সে যুবকরা হবে উন্নত চরিত্র, শৃঙ্খলা পরায়ণ, সংস্কারযুক্ত, বুদ্ধিমান ও তেজস্বী। সঙ্ঘ আজও স্বামীজীর চাওয়া ‘শত যুবক’ নির্মাণের কাজে সতত নিয়োজিত।
সঙ্গ কোনো মাস অর্গানাইজেশন নয়, সঙ্ঘ ক্লাস অর্গানাইজেশন। সঙ্ঘ ভিড় নয়, ভিড়কে সঠিক দিকে পরিচালিত করতে পারে এরকম কার্যকর্তা তৈরির প্রতিষ্ঠান। ট্রেনের একটি ইঞ্জিন ৫০টি বগিকে অবলীলায় টেনে নিয়ে যেতে পারে। ইঞ্জিন আছে বলেই বগি সক্রিয়। ইঞ্জিন না থাকলে ৫০টি বগি স্থবির, মূল্যহীন। ১০০ বছর ধরে তেমনি সমগ্র সমাজকে টেনে নিয়ে চলেছে এরকম ইঞ্জিন হলো সঙ্ঘ, অর্থাৎ দক্ষ কার্যকর্তা তৈরি করার কাজ করে চলেছে।
আজ শতবর্ষের দোরগোড়ায় এসে সঙ্ঘের সেই সাধনা অনেকাংশেই সফল। সঙ্ঘের সংস্কারিত স্বয়ংসেবকরাই আজ সমাজকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আমরা শিল্প ক্ষেত্রে পেয়েছি দেশের সবচেয়ে বড়ো শ্রমিক সংগঠন ভারতীয় মজদুর সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা দত্তোপন্থ ঠেংড়ীকে, শিক্ষাক্ষেত্রে পেয়েছি এদেশের অগ্রগণ্য শিক্ষাসংগঠন বিদ্যা ভারতীর ভাউরাও দেওরসকে, পেয়েছি এদেশের অগ্রগণ্য জনজাতি উপজাতি সংগঠন (এসসি, এসটি, ওবিসি) বনবাসী কল্যাণ আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা বাবাসাহেব দেশপান্ডেকে, পেয়েছি দেশের সর্ববৃহৎ ছাত্র সংগঠন অখিল পরিষদের স্থপতিকার বসন্তরাও কেলকরকে, আবার কখনো পেয়েছি এদেশে রাষ্ট্রবাদী রাজনীতির রূপকার পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়, অটলবিহারী বাজপেয়ী, এল কে আদবানি থেকে শুরু করে বর্তমান প্রজন্মের নরেন্দ্র মোদীর মতো রাজনেতাকে। এঁরা স্বস্ব ক্ষেত্রে সকলেই তলোয়ারের ন্যায় তীক্ষ্ণ, সূর্যের মতো প্রখর ও নিপুণ সংগঠক। এঁদের সকলেরই কারিগর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠাতার লক্ষ্য ছিল সর্বক্ষেত্রে সমাজের দিশা পরিবর্তন করতে পারে, দেশকে নেতৃত্ব দিতে পারে এরকম চরিত্রবান ব্যক্তি নির্মাণ। সঙ্ঘ সে কাজে সফল। ১৯২৫ থেকে পাঁচটি প্রজন্ম পার হয়ে গেছে-ডাক্তারজী, শ্রীগুরুজী, দেওরসজী, রাজেন্দ্র সিংহ, সুদর্শনজীর নেতৃত্বে পার হয়ে বর্তমানে সঙ্ঘের নেতৃত্ব সরসঙ্গচালক মোহনরাও ভাগবতজীর হাতে এসে পড়েছে। কালে কালে এদেশে অনেক সংগঠন জন্ম নিয়েছে। কিন্তু তারা যুগের সঙ্গে নিজেকে পরিবর্তিত না করার কারণে সমাপ্ত হয়ে গিয়েছে। বিপরীতে শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে এসেও সঙ্ঘ ক্রমবর্ধমান। তার কারণ ১০০ বছরে সঙ্ঘ তার আদর্শকে স্থির রেখে প্রতিনিয়ত তার কার্যপদ্ধতির পরিবর্তন, পরিমার্জন ও পরিবর্ধন করে চলেছে। একসময়ের গণবেশ- হাকি হাফপ্যান্ট, আজ ফুল প্যান্টে পরিবর্তিত। তরবারি, ছুরিকা, ভল্ল, বেচর্মের খেলা আজ নিযুদ্ধ, দণ্ড, যষ্টিযুদ্ধে পরিবর্তিত। সময়ের আহ্বানে নিত্য শাখার সঙ্গে সঙ্গে মিলন, মণ্ডলী যুক্ত হয়েছে। সংগঠনকে সর্বব্যাপী সর্বস্পর্শী করে সম্পূর্ণ হিন্দু সমাজকে সংগঠিত করতে ছটি গতিবিধি এবং তার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ৫০টি সহযোগী সংগঠন গড়ে উঠেছে। কিন্তু যে তিনটি সিদ্ধান্তের উপর সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তার কোনো পরিবর্তন হয়নি। এই তিনটি সিদ্ধান্তই হলো সঙ্ঘ সৌধের ভিত্তি। এক, ভারতবর্ষ হিন্দু রাষ্ট্র। দুই, হিন্দুত্বই রাষ্ট্রীয়ত্ব, আর তিন, সঙ্ঘের শাখার মাধ্যমে দেশভক্ত ব্যক্তি নির্মাণ, তাদের দ্বারাই নির্মাণ হবে পরম বৈভবশালী রাষ্ট্র। সঙ্ঘের এই তিনটি সিদ্ধান্ত অপরিবর্তনীয়। সঙ্ঘ ক্ষণিকের জন্যও তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়নি। আগে গ্রামে একজন করে চৌকিদার থাকত। তার কাজ ছিল রাতে ঘুরে ঘুরে গ্রামবাসীকে সজাগ রাখা- ‘জেগে থাকো’ বলে ডাক দেওয়া। ১০০ বছর ধরে সঙ্ঘ হিন্দু জাতির চেতনা জাগ্রত এবং তাকে সংগঠিত করার কাজই করে চলেছে।
কবি অতুলপ্রসাদ তার গানে স্বপ্ন
দেখেছিলেন, ‘ভারত আবার জগত সভায়
শ্রেষ্ঠ আসন লবে’- সঙ্ঘ এই একই স্বপ্ন
দেখে। তবে এ স্বপ্ন সঙ্ঘ প্রথম দেখেনি, ঋষি
বঙ্কিমচন্দ্রও তাঁর আনন্দমঠ উপন্যাসে একই
স্বপ্ন দেখেছিলেন। তখন দেশে ইংরেজ
শাসন। সন্ন্যাসী ভবানন্দ জমিদার মহেন্দ্রকে
পর পর তিনটি দেবীপ্রতিমার দর্শন
করিয়েছিলেন। প্রথমটি ছিল আলো-আঁধারি
গুহায় অনিন্দ্যসুন্দর এক দেবীপ্রতিমা, যিনি
বহুবিধ অলংকারে ভূষিতা, রাজকীয় বস্ত্রে
সজ্জিতা। ভবানন্দ বললেন- দেখ, ইনি
হলেন ‘মা যা ছিলেন’, আমাদের জন্মভূমি
ভারতবর্ষ আগে এরূপ ঐশ্বর্যময়ী ছিলেন।
তারপর অন্য এক অন্ধকার গুহায় দেখালেন
আর এক মাতৃমূর্তি- শতছিন্ন বস্ত্র, ধূলিমলিন
বেশ, অলংকারহীন চিরভিখারিণীর সাজ।
ভবানন্দ বললেন- ইনি হলেন ‘মা যা
হইয়াছেন’। অর্থাৎ হাজার বছরের
পরাধীনতাকালে মায়ের এই দুর্গতি। তারপর
অন্তিমে মহেন্দ্রকে বনের অন্য একটি প্রান্তে
নিয়ে গিয়ে দেখালেন আরেক অনিন্দ্য সুন্দর
মাতৃপ্রতিমা- যিনি সুদৃশ্য রত্নখচিত বস্ত্র ও
নানা বিধ মূল্যবান অলংকারে সুসজ্জিতা,
যার উজ্জ্বল বর্ণচ্ছটায় চৌদিক আলোকিত,
হাসিমুখে ভরাভয় দান করছেন। ভবানন্দ
বললেন- ইনি হলেন ‘মা যা হইবেন’,
অর্থাৎ দেশমাতৃকার ভবিষ্যৎ রূপ। যিনি
হবেন অতীতের চেয়েও ঐশ্বর্যময়ী,
পূর্বাপেক্ষা মহিমান্বিত। স্বয়ংসেবকরা
জন্মভূমি ভারতমাতাকে আনন্দমঠের ‘মা যা
হইবেন’- এই রূপে দেখতে চায়।
সঙ্ঘ আজ দেশের কেন্দ্রবিন্দুতে। সূর্যকে
কেন্দ্র করে গ্রহ-তারকা যেমন প্রতিনিয়ত
প্রদক্ষিণ করে চলেছে, ঠিক তেমনই সঙ্ঘকে
কেন্দ্র করে আজ আবর্তিত হয়ে চলেছে
এদেশের সমাজ ও রাজনীতি। সঙ্ঘই আজ
এদেশের ভাগ্য নিয়ন্তা। আজ এদেশে এমন
কোনো প্রিন্ট মিডিয়া নেই যারা প্রতিদিন
তাদের খবরে সঙ্ঘকে নিয়ে দু’দশ পঙ্ক্তি
লেখেনি। এদেশে এমন কোনো নিউজ
চ্যানেল নেই যারা তাদের প্রতিদিনের নিউজ শ্লটে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘকে নিয়ে কোনো এপিসোড দেখায়নি। আর সোশ্যাল মিডিয়ায় তো আজ হিন্দুত্বের জয়জয়কার। এর কারণ কী? কারণ শত বছরে কঠোর সাধনায় সঙ্ঘ আজ দেশের এক প্রতিষ্ঠিত শক্তি। যদিও একশ্রেণীর মিডিয়া সঙ্ঘকে ভুল ভাবে উপস্থাপিত করে, তবু তাকে অগ্রাহ্য করার শক্তি আজ কারও নেই। সে মণিপুরের ঘটনা হোক, কাশ্মীর সমস্যা হোক, মাওবাদী সমস্যা হোক বা হোক মথুরা-সম্ভলের বিবাদ- সবেতেই সঙ্ঘের মতামত জানতে চায়।
সঙ্ঘ আজ এদেশের কেন্দ্রীয় শক্তি। সঙ্ঘ রাজনীতি করে না ঠিকই, কিন্তু তার কার্যকর্তা-স্বয়ংসেবকরা রাজনীতি সচেতন। সঙ্ঘ-প্রেরণায় গড়ে ওঠা ব্যক্তিরা আজ দেশের কর্ণধার। সঙ্ঘ এই দেশকে সব দিক থেকে উন্নতির চরম শিখরে নিয়ে যেতে চায়, সে সামাজিক ক্ষেত্রে হোক, ধর্মীয় ক্ষেত্রে হোক, শিক্ষা ক্ষেত্রে হোক, শিল্পক্ষেত্রে হোক বা হোক রাজনীতির ক্ষেত্রে। আর রাজনীতি তো এদেশের অতি প্রয়োজনীয় অংশ। সঠিক নেতৃত্বের হাতে দেশ না থাকলে দেশের বিনাশ অবশ্যম্ভাবী। তাই সঙ্ঘ প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করলেও দেশ যাতে দেশভক্ত ও শক্তিশালী নেতৃত্বের হাতে থাকে তার দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখে।
এক বামপন্থী বন্ধু প্রশ্ন করেছিলেন
সারাদেশে আজ বিজেপির শাসন, কিন্তু
রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সংগঠন কোথায়?
তাকে বললাম দেখো, এ দেশে সঙ্ঘ আর কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম একই সময়ে, ১৯২৫ সালে। তোমরা রাজনীতির মাধ্যমে এদেশে সমাজবাদ প্রতিষ্ঠার লড়াই শুরু করেছিলে, আর সঙ্ঘ ব্যক্তি নির্মাণের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের কাজ শুরু করেছিল। কিন্তু ১০০ বছরে বিচার করে দেখ আজ তোমরা কোথায়, আর সঙ্ঘ কোথায়? এই পশ্চিমবঙ্গে তোমাদের এক মুখ্যমন্ত্রী ক্ষমতার দম্ভে একদা বলেছিলেন, ‘দু-চার পিস আরএসএস, ডান্ডা মেরে মাথা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবো।’ সেই তোমরা আজ কোথায়? ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে। প্রায় ৬৫
জন সাংসদ নিয়ে সংসদ আলো করে বসা একসময়ের দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল বামপন্থীরা আজ ঠাঁই নিয়েছে লোকসভার এক কোণে। আর একদা কংগ্রেস, বামপন্থীদের করুণার পাত্র হয়ে থাকা, অন্যদিকে ২ সাংসদের দল বিজেপি আজ ক্ষমতায় বিরাজমান। দেশের রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রায় কুড়িটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, বহু রাজ্যপাল- সকলেই সঙ্ঘের সংস্কারিত স্বয়ংসেবক। তাঁরাই আজ দেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন।
এরপরও যদি প্রশ্ন জাগে যে সঙ্ঘ কোথায়, তাকে দেখা যাচ্ছে না কেন? তবে বলতে হয়, আজকের সঙ্ঘ শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপের মতো এক বিশাল, অপার, উজ্জ্বল মহিমাময় এক সত্তা। সঙ্ঘ মানে আজ কেবল মাঠে খেলাধুলা, যোগব্যায়াম করা ছোটোদের সংগঠন নয়। সঙ্ঘ আজ ৪০টিরও বেশি সহযোগী সংগঠনের সমাহার- এক বিশাল বটবৃক্ষ। এক বৃহৎ পরিবার। সেই পরিবারে আছে তার নিজের এক লক্ষ ত্রিশ হাজার শাখা-মিলন-মণ্ডলী, আছে প্রায় দেড় কোটি নিষ্ঠাবান স্বয়ংসেবক, ঠিক তেমনি আছে নারী সংগঠন- রাষ্ট্র সেবিকা সমিতির ৮ হাজার শাখা। আছে এবিভিপি-র ৫০ লক্ষ সদস্য, আছে বিদ্যা ভারতীর ৩০ হাজার বিদ্যালয়, ৫০ লক্ষ বিদ্যার্থী, ১০ লক্ষ আচার্য- আচার্যা। আছে ভারতীয় মজদুর সঙ্ঘের এক কোটিরও বেশি সদস্য। আছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরংদল, দুর্গাবাহিনীর এক কোটি কার্যকর্তা, আছে বনবাসী কল্যাণ আশ্রমের এক লক্ষ সেবা প্রকল্পের কর্ণধাররা, আছে
১৫ কোটি সদস্যের বিশাল বিজেপি, আছে আরও অনেক সংগঠন ও তার সদস্য সমর্থকরা। তাই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ মানে আজ কেবল খেলাধূলা নয়, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ মানে কোটি কোটি হিন্দুর মহাসঙ্গম। আজ সমাজ ও সঙ্ঘ একাকার হতে চলেছে এটাই আজকের সঙ্ঘের বিশ্বরূপ। এই সঙ্ঘ অজেয়। যতদিন ধরাতলে হিন্দু, হিন্দুধর্ম, হিন্দুত্ব বেঁচে থাকবে ততদিন সঙ্ঘের আদর্শও অমর, অমলিন থাকবে।
সঠিক নেতৃত্বের হাতে
দেশ না থাকলে
দেশের বিনাশ
অবশ্যম্ভাবী। তাই সঙ্ঘ
প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে
অংশগ্রহণ না করলেও
দেশ যাতে দেশভক্ত ও
শক্তিশালী নেতৃত্বের
হাতে থাকে তার দিকে
সজাগ দৃষ্টি রাখে।

















