‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ রাজপথ থেকে লালকেল্লা
কৃষ্ণানন্দ সাগর
এবছর ১৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী লালকেল্লা থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার সময় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের ১০০ বছরের যাত্রার কথা উল্লেখ করেছেন। এর ফলে কংগ্রেস ও তার সহযোগী দলগুলির বুক ধড়ফড় করতে আরম্ভ করেছে। সঙ্ঘের নাম শোনামাত্র মনে হচ্ছে যেন তাদের বিছা কামড়ে দিয়েছে আর তারা ছটফট করতে আরম্ভ করেছে। রাহুল গান্ধীর প্রপিতামহ জওহরলাল নেহরুরও বেশ কয়েক বছর এই অবস্থা ছিল। তিনিও সঙ্ঘের নাম শুনলে খুবই চঞ্চল হয়ে উঠতেন এবং সঙ্ঘকে সাম্প্রদায়িক, মুসলমান বিরোধী ও দেশদ্রোহী বলতে দ্বিধা করতেন না। শুধু তাই নয়, গান্ধীজী হত্যার মিথ্যা অপবাদ দিয়ে সঙ্ঘকে নিষিদ্ধও করেছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে সঙ্ঘ সম্পর্কে অল্পবিস্তর জ্ঞান হওয়ার পর তাঁর শরীর থেকে সঙ্ঘরূপী জ্বর কমতে থাকে। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন জায়গায় যায় যে ১৯৬৩ সালের ২৬ জানুয়ারি সাধারণতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণ করতে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘকে
বিধিবদ্ধ নিমন্ত্রণ করার জন্য বিভাগীয় আধিকারিকদের নির্দেশ দেন। সেই অনুসারে সাধারণতন্ত্র দিবসের মাত্র তিনদিন আগে সরকারি দপ্তর থেকে দিল্লির সঙ্ঘ অধিকারীদের কাছে বার্তা আসে। এতো কম সময় হওয়া সত্ত্বেও ২৬ জানুয়ারি সকালেই প্রায় সাড়ে ৩ হাজার স্বয়ংসেবক কুচকাওয়াজ স্থান বিজয়চকে উপস্থিত হয়। সমস্ত স্বয়ংসেবকই পূর্ণ গণবেশে ছিলেন (খাকি হাফ প্যান্ট, সাদা জামা, কালো টুপি ও পায়ে মিলিটারি বুটজুতা)। ঘোষ (বাদ্য)-সহ
স্বয়ংসেবকরা যখন পায়ে পা মিলিয়ে রাজপথে (কর্তব্য পথ) সঞ্চলন করছেন তখন দেশি বিদেশি দর্শকেরা আশ্চর্য না হয়ে পারেননি। পরের দিন সমস্ত পত্রপত্রিকায় ছবি-সহ সেই খবর বেরিয়েছিল।
সাধারণতন্ত্র দিবসে সঙ্ঘকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে এই খবর জানার পর ওই সময় কিছু কট্টর সঙ্ঘ বিরোধী কংগ্রেসির মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড় হয়েছিল। ‘সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সমিতি’র মুখ্য নেত্রী সুভদ্রা যোশী ভারত সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে নেহরুজীর কাছে এক প্রতিনিধি মণ্ডল নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। কিন্তু নেহরুজী তাকে ধমক দিয়ে বলেছিলেন- সঙ্ঘকে না ডাকার তো কোনো কারণ নেই- তারা তো সকলেই দেশভক্ত। বেচারি সুভদ্রা যোশীকে মুখ কালো করে ফিরতে হয়েছিল। শেষপর্যন্ত নেহরুজী সঙ্ঘকে দেশদ্রোহী থেকে ‘দেশভক্ত’ আখ্যা কেন দিলেন সেই প্রসঙ্গ জানা দরকার।
নেহরু-সহ কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের রক্ষা: ১৯৪৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর নেহরুজীর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হয়েছিল। এই উপলক্ষ্যে যখন সকালে মন্ত্রীরা শপথ নেওয়ার জন্য ভাইসরয় হাউসে (রাষ্ট্রপতি ভবন) যাচ্ছিলেন, তখন রাজপথে প্রকাশ্যে মুসলিম লিগের লোকেরা কালো পতাকা দেখিয়ে বিরোধিতা করছিল এবং গালাগালি দিচ্ছিল। তাঁদের গাড়িতে পচা টমাটো ও ডিম ছোঁড়া হচ্ছিল, এমনকী এক লিগ সদস্য নেহরুজীর গাড়ির উপর জ্বলন্ত সিগারেটের টুকরো
ফেলছিল। এটা অত্যন্ত অপমানজনক ঘটনা ছিল। এরকম প্রায়ই হতে থাকে। এরকম পরিস্থিতিতে দিল্লি প্রদেশের তৎকালীন কংগ্রেস নেতা দেশবন্ধু গুপ্তা সঙ্ঘের দিল্লি প্রান্ত প্রচারক বসন্তরাও ওককে অনুরোধ করেন যাতে মুসলিম লিগের লোকেদের কংগ্রেসি মন্ত্রীদের উপর হামলা থেকে স্বয়ংসেবকরা রক্ষার ব্যবস্থা করে। পরের দিন ৩ সেপ্টেম্বর লিগের কিছু লোক মন্ত্রীদের উপর হামলা করতে এসে দেখে রাস্তায় আগে থেকে বেশি সংখ্যায় সঙ্ঘের স্বয়ংসেবক উপস্থিত। প্রত্যেক লিগ সদস্যের ডানে-বামে দুজন করে স্বয়ংসেবক দাঁড়িয়ে গিয়েছেন। এইসব দেখে লিগের লোকেদের কিছু করার সাহস হয়নি এবং তারা চুপচাপ চলে যায়। নেহরুজী-সহ অন্য মন্ত্রীরা নিরাপদে নিজেদের অফিসে যেতে পেরেছেন। তারপর কোনোদিন লিগের লোকেরা কংগ্রেসি মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে সাহস পায়নি।
সিন্ধে নেহরুজীকে সুরক্ষা: সিন্ধপ্রদেশের এক বড়ো শহর হায়দরাবাদ। ১৯৪৬ সালে নেহরুজীর ওখানে কোনো অনুষ্ঠান ছিল। হায়দরাবাদের কংগ্রেস নেতারা গোপনসূত্রে খবর পান যে সভাস্থলে মুসলিম লিগের লোকেরা হামলা করতে পারে এবং তাতে নেহরুজীরও ক্ষতি হতে পারে। সেখানকার কংগ্রেস নেতা চিমনদাস এবং লালা কিষণচন্দ সঙ্ঘের কার্যকর্তাদের কাছে এসে নেহরুজীকে সুরক্ষা প্রদানের সহায়তা চান। ফলস্বরূপ সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকরা সভাস্থলের
চারদিকে বেষ্টনী তৈরি করে। লিগের গুন্ডারা এসে দেখল যে স্বয়ংসেবকরা আগেভাগেই সভাস্থল ঘিরে রেখেছে, তখন তারা লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যায়। সভা যথাসময়ে সম্পন্ন হয় এবং নেহরুজী নিরাপদেই ফেরত যান।
সঙ্ঘের সম্মেলনে নেহরু: ১৯৪৭ সালের ৯ মার্চ দিল্লিতে ২৫০০০ গণবেশধারী স্বয়ংসেবকের বসন্ত সম্মেলন ছিল রাজঘাটে। সন্ধ্যা ৬টায় সরসঙ্ঙ্খচালক শ্রীগুরুজীর প্রকাশ্য ভাষণ দেওয়ার কথা। এই উপলক্ষ্যে দিল্লির অনেক গণ্যমান্য অতিথিকেও নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল। হাজার হাজার লোক সাইকেল ও অন্য যানবাহনে কার্যক্রম স্থানে আসতে শুরু করেছে। ওই স্থানের বাহন রাখার ব্যবস্থা দেখাশোনা করছিলেন একজন কার্যকর্তা- বলদেবরাজ খান্না। প্রায় ৫টা ৩০
মিনিটে সময় একজন প্রাইভেট কার নিয়ে ওখানে এলেন। সেই গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন পণ্ডিত নেহরু। বলদেবরাজ তাঁকে দেখে দৌড়ে গেলেন ও নমস্কার করলেন। নেহরুজী বলদেবজ জিজ্ঞাসা করলেন- Where is Golwalkarji, I want to see him। বলদেবজী বললেন-তিনি ঠিক ৬টার সময় আসবেন। আপনি ভিতরে বসুন। তিনি এলেই পরিচয় করিয়ে দেব। নেহরুজ্জী বললেন, না না, তার দরকার হবে না। এতক্ষণ অপেক্ষা করা সম্ভব নয়, আমার অন্য কাজ আছে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে নেহরুজী বললেন- আমাকে এই কার্যক্রম স্থলের পূর্ণ দশ্য দেখাতে পারো? তারপর নিজেই একটা খালি বাস দেখিয়ে
বললেন- ওটার ছাদে উঠলে পুরো দৃশ্য দেখা যাবে। বলদেবজীর সঙ্গে নেহরুজী বাসের ছাদে উঠলেন। চারিদিকের বিহঙ্গম দৃশ্য দেখে তিনি নেমে এলেন। ততক্ষণে তাঁর গাড়ি পার্কিং স্থানে চলে গেছে। বলদেবজী তাঁকে গাড়ির নম্বর জিজ্ঞাসা করলেন- যাতে সামনে ডেকে আনা যায়। কিন্তু নেহরুজী এই কার্যক্রমের বিহঙ্গম দৃশ্য দেখেছেন, তার বিশালতা, অনুশাসন ও ব্যবস্থা তিনি ভালো বা খারাপ ভেবেছেন সেটা তাঁর ব্যাপার।
মানালী সঙ্ঘশাখা: ১৯৫৮-৫৯ সালের কথা। নেহরুজী কিছুদিন হিমাচল প্রদেশের মানালীতে বিশ্রামের জন্য গেছেন। বিকেলে ঘুরতে বেরিয়ে রাস্তার ধারে দেখলেন ১৫-১৬ জন বালক একটা মাঠে খেলাধুলা করছে। মাঠের এক প্রান্তে গৈরিক ধ্বজ উড়ছিল। নেহরুজীকে আসতে দেখে মাঠের বালকেরা নমস্কার করে। নেহরুজী তাদের জয়হিন্দ বলে অভিবাদন করলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন- তোমরা এতো ঠাণ্ডায় কী করছো। বালকরা উত্তর দিল- আমরা এখানে সঙ্ঘের শাখা করছি। নেহরুজী এর আগে কখনো সঙ্ঘের শাখা দেখেননি। আজ এই শাখা দেখে তাঁর খুব আশ্চর্য লাগল। নেহরুজী চলে গেলেন কিন্তু তাঁর এক অনুগামী বালকদের বলল, তোমরা জয়হিন্দের বদলে নমস্কার করলে কেন? একজন স্বয়ংসেবক উত্তর দিল জয়হিন্দ ও নমস্কার দুটোর একই অর্থ। আজকাল নমস্কারই বেশি চালু। এখন শাখায় বা বিদ্যালয়ে যেভাবে বলা হয়, নেহরুজীকেও তাই বলা হয়েছে। এর মধ্যে ভুল কোথায়? উত্তরদাতার নাম ওমপ্রকাশ দীওয়ান, যে ওই সময় কুলু মহকুমার প্রচারক ছিল এবং সে ওই শাখায় উপস্থিত ছিল।
চীনা আক্রমণ: ১৯৬২ সালে চীনা আক্রমণের সময় সবদিকের পরাজয়ের খবর আসার ফলে নেহরুজীও ঘাবড়ে গেলেন। ক্রমাগত খবর আসছে-চীনাসৈন্যদের আক্রমণের ফলে বিভিন্ন জায়গা থেকে সরকারি আধিকারিকরাও পালিয়ে যাচ্ছেন। এমতাবস্থায় সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকরা নিজেরা সেই স্থানে অটল থেকে সবাইকে পালিয়ে যেতে নিষেধ করে। চীনের ভারতীয় দালালরা মিথ্যা রটিয়ে দেয় যে কিছুক্ষণের মধ্যে চীনা সৈন্যরা তেজপুর দখল করবে। এই গুজব বিশ্বাস করে স্টেট ব্যাংকের আধিকারিকরা কোটি কোটি টাকার নোট জ্বালিয়ে দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদী পেরিয়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্য তীরে এসে পৌঁছেছেন। তেজপুর শহরের অনেক প্রশাসনিক ও পুলিশ আধিকারিকও নদীতীরে হাজির হয়েছেন। এর ফলে সাধারণ মানুষ আরও ঘাবড়ে যায়। এরকম বিষম পরিস্থিতিতে তেজপুরের স্বয়ংসেবকরা ঠিক করল তারা পালিয়ে না গিয়ে চীনা সৈন্যদের মোকাবিলা করবে। একথা ভেবে নিজেরা তো পালালো না এবং বাকিদের পালাতে নিষেধ করল। আরও ভাবল, নিশ্চয়ই কিছু লোক নিশ্চিত ভাবে নিজের বাড়িতে বসে আছে। তাদের থেকে জানা গেল যে তারা চীনা সৈনিকদের ব্যাপারে কোনো কথাই বলবে না। স্বয়ংসেবকরা ভাবল নিশ্চয়ই কোনো ষড়যন্ত্র আছে। এরপর কিছু স্বয়ংসেবক নদীর ধারে হাজির হয়। দেখে, হাজার হাজার লোক নৌকায় উঠে বসেছে। স্বয়ংসেবকরা তাদের বুঝিয়ে নৌকা থেকে নেমে আসতে বলে। কিছু লোককে জোর করে নামায়। সরকারি আধিকারিকদের জোর করে নামতে বলা হলো, কারণ তারা চলে গেলে সাধারণ লোকেদের মনোবল আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। বাকি লোকেদেরও মিনতি করা হলো বাড়িতে ফেরার জন্য। সবাইকে বলা হলো- এসবই রটনা, ভারতীয় সেনাদের ভয় পাওয়ানোর জন্য এসব রটনা করা হয়েছে। লোকেদের মনে বিশ্বাস ফিরে এলো এবং ধীরে ধীরে সবাই বাড়ি ফিরতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর বিশৃঙ্খলা থেমে গেলে এবং তেজপুরের পরিস্থিতি শান্ত হলো। এর ফলে সহজে
অসম দখল করার চীনা পরিকল্পনার স্বপ্ন ভেঙে গেল।
এসমস্ত খবর নেহরুজীর কাছে পৌঁছে গেল। তার ফলে তাঁর মনের মধ্যে সঙ্ঘের প্রতি বিদ্বেষ অনেকটা কমে গেল। চীনের কাছে পরাজয়ের ফলে মনোবল কিছুটা উন্নত করার জন্য ঠিক হলো যে ১৯৬৩ সালের ২৬ জানুয়ারি সাধারণতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে সমস্ত সংসদ সদস্য এবং কিছু নির্বাচিত নাগরিক অংশগ্রহণ করবে। এই সিদ্ধান্ত অনুসারে নেহরুজী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘকে নিমন্ত্রণ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বর্তমান সময়ের কংগ্রেসিরা এর থেকে কিছু শিক্ষা নেবেন কি? তখন ছিল সাধারণতন্ত্র দিবস, আজ স্বাধীনতা দিবস। তখন নেহরুজী ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, আজ নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদী। তখন ছিল রাজপথ- আজ লালকেল্লা। তখন ১৯৬৩ সাল, আজ ২০২৫। (লেখক একজন ঐতিহাসিক এবং বিশিষ্ট স্তম্ভলেখক)

















