কয়েকজন নির্ভীক সাংবাদিকের কারণে নোয়াখালি হিন্দু গণহত্যার কথা জেনেছে দেশবাসী
ড. রাজলক্ষ্মী বসু
এই প্রজন্মের কেউ যদি জিজ্ঞেস করে নোয়াখালির ঘটনা কী? তাদের ইন্টারনেট দেখতে বলতে হবে। ওসব একটু আধটু নেটে পাওয়া যায়। ঘটনার তথ্য, তারিখ, স্থান ইত্যাদি। ইন্টারনেট সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য ইতিহাসের ঠিক ততখানিই তুলে ধরে, যতখানিতে ‘সেকুলারদের কথায়’ হিংসা ছড়ায় না। নোয়াখালির হিন্দু নরসংহার কী তবে? রুবেন চন্দ্র দাসের কবিতায় তার এক ঝলক ধরা রয়েছে- ‘মানুষের সাথে মানুষের এত পশুত্ব প্রভাব রুচির সাথে বিকৃত মন আর বিকৃত ধর্মবাসনার যৌন সুড়সুড়ির নাম নোয়াখালির দাঙ্গা। হত্যা ধ্বংসযজ্ঞে নিজের মুসলমানি লিঙ্গও যে এক বর্বর, জঘন্য, পৈশাচিক অস্ত্র তার পরিচয় নোয়াখালির দাঙ্গা। ধর্মবোধের টুপির সাথে স্বামী সন্তানের লাশের উপর মুসলিম জনতার গণধর্ষণ, অতঃপর সিঁদুর মুছে ফাতেমা। তার নাম নোয়াখালির দাঙ্গা। চিত্তরঞ্জন দত্তের বিদ্রোহী প্রতিবাদ, অবশেষে নিজের মাতা ও পুত্রের বুকে গুলি চালিয়ে আত্মহত্যার নাম নোয়াখালি দাঙ্গা। থানায় আশ্রিত হাজার হাজার নারীর ধর্ষিত দেহের মৃত মুখে ইসলামি কলেমার চুম্বনের নাম নোয়াখালি দাঙ্গা।
যৌনতার লিঙ্গ যেথায় ধর্মের পতাকা পেয়েছে হাতে….।’ নোয়াখালি হিন্দু নরসংহারের পর বেশ কিছু প্রতিবেদনে গান্ধীজীর ছাগল চুরির ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। নোয়াখালিতে এসেছিলেন মোহনদাস এবং তাঁর ছাগলটি চুরি যায়। আজকেও পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ মূলধারার সংবাদমাধ্যম একবারও স্পষ্ট বলে না যে, ১৬ আগস্ট, ১৯৪৬-এর গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং-এর পর হিন্দুদের ওপর মুসলমানদের অত্যাচার, নির্যাতন, বলপূর্বক সম্পদ লুঠ, নারী হরণ, হিন্দুদের ওপর আক্রমণ, হিন্দুদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ কী কদাকার রূপ ধারণ করেছিল। গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং-এর পরবর্তী পর্যায়ে কলকাতার হিন্দু গণহত্যারই পরিবর্ধিত সংস্করণ হলো নোয়াখালি গণহত্যা। ১০ অক্টোবর, ১৯৪৬ ছিল কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার দিন। মেইনস্ট্রিম মিডিয়া বা মূলধারার সংবাদমাধ্যম আজকেও যেমন পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের বুকে অহরহ সংঘটিত হিন্দু নির্যাতনের ঘটনার কথা খোলাখুলি বলে না, সেদিনও বড়ো সংবাদপত্রগুলি নোয়াখালির ঘটনার কথা বিশদে বর্ণনা করতে পারেনি, তাদের বলতে দেওয়া হয়নি। সংবাদপত্রগুলি গান্ধীজীর সফরসঙ্গী ছাগল চুরি যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করলেও সুরাবর্দি
পরিচালিত বেঙ্গল গভর্নমেন্ট কিন্তু নোয়াখালির ধ্বংসকাণ্ডের তথ্য প্রকাশ্যে আনতে দেয়নি। আনন্দবাজার পত্রিকার তৎকালীন মুখ্য সম্পাদক চপলাকান্ত ভট্টাচার্য ‘নোয়াখালির ধ্বংসকাণ্ড’-শীর্ষক পুস্তিকায় সেই লক্ষ্মীপূজার দিনে সংঘটিত বীভৎস, বিভীষিকাময় ঘটনাগুলির বিবরণ দেন। কিন্তু তারপর আর সেই আলোচনাকে বিস্তারিতভাবে উপস্থাপিত করতে পারল না আনন্দবাজার। এই বইতে লেখক পরিতাপের সঙ্গে জানাচ্ছেন, “নোয়াখালির ধ্বংসকাণ্ড সম্বন্ধে আলোচনা প্রকাশিত হইতে হইতে তৎকালীন বাঙ্গলা গভর্নমেন্টের আদেশের ফলে অপ্রত্যাশিতভাবে উহার প্রকাশ বন্ধ হইয়া যায়। ১৯৪৭ সালের ৩০ মে মি. সুরাবর্দি পরিচালিত বাঙ্গলা গভর্নমেন্ট নোয়াখালির ধ্বংসকাণ্ড সম্বন্ধে প্রবন্ধ প্রকাশের অপরাধে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ ও ‘হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড’-এর কয়েকটি সংখ্যা বাজেয়াপ্ত করেন এবং উভয় সংবাদপত্রের ৭০০০ টাকা জামানত বাজেয়াপ্ত করিয়া পুনরায় ১৭০০০ টাকা নূতন জামানত আদায় করেন….।”
তাই ১৯৪৬-এর ১০ অক্টোবর নোয়াখালি হিন্দু নরসংহার এবং তার পরের দিনগুলিতে সংঘটিত হিন্দু নির্যাতনের নিখুঁত তথ্য সংগ্রহ করতে আজও রীতিমতো হাতড়াতে হয়। বিভিন্ন সূত্র হতে সংগৃহীত তথ্যগুলি বলে ওঠে এত হাজার হত্যা। তত হাজার ধর্ষণ। এত এত মানুষের বলপূর্বক ধর্মান্তরণ। ইতিহাস রচনা এবং লিপিবদ্ধ সেই ইতিহাসকে সযত্নে রক্ষার দায় চিরকালই থাকে সংবাদমাধ্যম, সাংবাদিক ও লেখকদের ওপর। সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধের উদ্দেশ্যে সুরাবর্দির ওই পৈশাচিক পদক্ষেপের পর প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিলেন ড. প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ। ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্টের পর তিনি হন পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী। ১৯৪৮-এর ২০ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গ সরকার একটি আদেশ জারি করে পূর্ববর্তী বেঙ্গল গভর্নমেন্টের আইন অনুযায়ী সংবাদমাধ্যমের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে। তারপর নোয়াখালি গণহত্যার বিষয়ে প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সংবাদ ইত্যাদি প্রকাশিত হয়। কিন্তু ঘটনা ঘটার অব্যবহিত পরে তার ছবি যতটা পরিষ্কার ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরা সম্ভব হয়, দু’বছর পরে সেই বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও পরিবেশন করতে গেলে অনেক সূত্রই তখন হয়ে যায় হাতছাড়া, ঘটনার বিবরণও সংগৃহীত হয় সংক্ষিপ্ত, অপর্যাপ্ত। বিশেষত যখন দেশ বিভাজনের ফলে পূর্ববঙ্গ হয়ে গিয়েছে পূর্ব পাকিস্তান। তবুও ড.
প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষের নেওয়া প্রশাসনিক পদক্ষেপ নোয়াখালির রক্তাক্ত ইতিহাসকে তথ্যযোগে ধরে রাখতে অনেকাংশে সাহায্য করেছে।
একশ্রেণীর কমিউনিস্ট লেখক ও ঐতিহাসিক নোয়াখালির হিন্দু গণহত্যাকে ‘গৃহযুদ্ধ’ বলে চিহ্নিত করে থাকে। হিন্দু নরসংহারকে গৃহযুদ্ধ যদি বলা হয়, তবে তার চেয়ে বিকৃত বিমর্শ (ন্যারেটিভ) বোধহয় আর কিছুই হতে পারে না। ভারতকে টুকরো করে পাকিস্তানের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে পূর্ববঙ্গ থেকে হিন্দুদের বাস্তুচ্যুত করা হচ্ছিল। পূর্ববঙ্গে হিন্দুরা ছিল সংখ্যালঘু। জেহাদিদের দ্বারা হিন্দু গণহত্যা যে ‘ওয়ার অন মাইনরিটি’ সেটা স্বীকারে প্রবল আপত্তি জেহাদি-তোষণকারী কমিউনিস্টদের। পূর্ববঙ্গকে হিন্দুশূন্য করার সংকেত দিয়েছিল নোয়াখালি গণহত্যা। সেদিন সংবাদপত্রের অফিসগুলিতে স্তূপীকৃত বিবরণের এক ভাগও মনে হয় ছাপার কালিতে ব্যয় হয়নি। সম্পদ লুণ্ঠন, গৃহদাহ, ধর্মনাশ, গণহত্যা ও নারীহরণ- এই পঞ্চ বিভীষিকার নাম ‘নোয়াখালি হিন্দু নরসংহার’।
পঞ্চ বিভীষিকার প্রথম দু’টির তথ্য ও বিবরণ পাওয়া গেলেও শেষ তিনটির অধিকাংশ তথ্যই পরবর্তীকালে অনেক কমিয়ে, সংকুচিত আকারে প্রকাশিত হয়েছে বলেই মনে করে বিশেষজ্ঞ মহল। হত্যার তথ্য যাও-বা পাওয়া গিয়েছিল কিন্তু নারী হরণ? কারণ, হিংস্র জেহাদিরা তখন হিন্দু পরিবারগুলিকে ‘কুচি কুচি’ করে ফেলেছে। হিন্দুরা হয়ে পড়েছে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন। যাঁরা বেঁচে গিয়েছিলেন, তাঁরাও নারী হরণের সত্য গোপন রাখতে এবং প্রাণ বাঁচাতে উদ্বিগ্ন।
এমতাবস্থায় ঘটনাস্থলে পৌঁছে সাংবাদিকরা সত্য জানতে প্রয়াসী হলে অথবা তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করলেও ভয়াবহ পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে তাঁদের পরিবেশিত সংবাদে বড়োজোর উল্লেখ করতে পেরেছেন যে, ‘এই পর্যন্ত হিসেব পাওয়া গিয়াছে বা নির্ধারিত হইয়াছে’। তবে যে সরকারি নিষেধাজ্ঞার ফলে
নোয়াখালি উপদ্রব সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশে বাধার সৃষ্টি হয়, তাতে প্রথমে বঙ্গীয় প্রেস অ্যাডভাইসরি কমিটিকে (এই কমিটি নিখিল ভারতীয় সংবাদপত্র সম্পাদক সম্মেলনের প্রাদেশিক মুখপাত্র এবং কলকাতার বিভিন্ন সংবাদপত্র সম্পাদক যোগে গঠিত হয়) একটু সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সরকারি আদেশে বলা হয়েছিল যে, প্রেস অ্যাডভাইসরি কমিটি যেসব সংবাদ ও বিবরণ প্রকাশে অনুমোদন দেবে, তা নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে না। এই কমিটিরও অবশ্যই
ধন্যবাদ প্রাপ্য। বিশেষত এই কমিটির সদস্যদের সক্রিয়তার প্রশংসা করতেই হয়, কারণ ওই অন্ধকার ও অস্থির সময়েও বঙ্গের প্রধানমন্ত্রী সুরাবর্দির থেকে অন্তত এইটুকু অধিকার তাঁরা আদায় করেই ছেড়েছিলেন। কিন্তু এরপরই ফের ব্যাহত হয় সংবাদমাধ্যমের কাজ। যেই নোয়াখালির মাটি থেকে সত্য সংবাদের ঝলক উঠে আসতে শুরু করল এবং তাতে স্পষ্ট অনুমোদন দিল প্রেস অ্যাডভাইসরি কমিটি, সঙ্গে সঙ্গে সুরাবর্দি নাকচ করলেন তার সিদ্ধান্ত এবং বলবৎ
করলেন কঠিন নির্দেশ। বন্ধ হলো তথ্য সংগ্রহ এবং নিয়মিত রিপোর্টিং। সুরাবর্দির চোখ রাঙানির আগেই বেশ কিছু জ্বলন্ত তথ্য-প্রমাণ রিপোর্ট হয়েছিল। ডকুমেন্টস্ এসেছিল ফিল্ড থেকে। এসেছিল হিন্দুদের হাহাকারের জ্বলন্ত ছবি! সেদিন প্রেস অ্যাডভাইসরি কমিটি সক্রিয় ছিল বলেই হয়তো নোয়াখালির
তথ্যগুলো আজও আমরা পাই।
১৯৪৬-এর ২৯ সেপ্টেম্বর বঙ্গীয় আইন পরিষদ বা বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভায় অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। সেদিন আইনসভায় দাঁড়িয়ে মুসলমান সদস্যরা উল্লেখ করেছিল যে, মন্ত্রীমণ্ডলকে অপদস্থ করার এই যে চেষ্টা, তার ফল পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের ভোগ করতে হবে। এছাড়াও বিশিষ্ট সাংবাদিকরা তাঁদের
লেখনীতে দিয়েছিলেন পূর্বাভাস। পরিষদীয় অধিবেশনে মুসলিম লিগ মন্ত্রী মৌলবি সামসুদ্দিনের বক্তব্যে ইঙ্গিত ছিল নোয়াখালির ঘটনা ঘটানোর। তিনি তার বক্তব্যে নোয়াখালির নামে হালকা হুমকি দেন। হিন্দুদের ভীতিপ্রদর্শন করেন। এর আগে ২০ সেপ্টেম্বর পূর্ববঙ্গে জেহাদি উপদ্রব ঠেকাতে থানায় থানায় মিলিটারি বসানো হয়। নারায়ণগঞ্জ থেকে আনন্দমোহন পোদ্দার বেঙ্গল এবং ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া গভর্নমেন্টের কাছে টেলিগ্রাম পাঠালেন। কুমিল্লার কামিনী কুমার দত্ত, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া গভর্নমেন্টকে হস্তক্ষেপ করার কাতর আবেদন করেন। মুসলমান সরকারি কর্মচারীরাই তখন প্রকাশ্যে হিন্দুদের ওপর দুর্ব্যবহার ও অত্যাচার করছে। এরই মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন বঙ্গীয় আইন পরিষদে নোয়াখালির প্রতিনিধি হারান
চন্দ্র ঘোষ চৌধুরী। ২৩ সেপ্টেম্বর আইনসভার আলোচনায় জেলায় জেলায় হিন্দুদের দুরবস্থার বিভিন্ন তথ্য তিনি পেশ করেন। অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সেই তথ্য প্রকাশ করে ২৩.০৯.১৯৪৬-এর অমৃতবাজার পত্রিকা। সেটাই বর্ধিত আকারে প্রকাশ করল ২৮ সেপ্টেম্বরের আনন্দবাজার পত্রিকা। হারান চন্দ্র ঘোষ চৌধুরীর দেওয়া তথ্যের সুবাদে ঢাকা জেলার মুন্সীগঞ্জে হিন্দুদের ওপর জেহাদিদের অত্যাচারের নথি পর্যন্ত সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। এরপর সুরাবর্দির টনক নড়লেও, তার আগেই সাংবাদিকরা তৈরি করে গিয়েছেন একটি সমুদ্র সমান তথ্যভাণ্ডার। পূর্ববঙ্গের অত্যাচারিত হিন্দুদের আখ্যান ততদিনে উঠে এসেছে কলকাতা থেকে প্রকাশিত প্রথমসারির দৈনিক সংবাদপত্রগুলিতে। নোয়াখালি গণহত্যার অবিকৃত ইতিহাস, কেন হলো নোয়াখালি, কেমন ছিল নোয়াখালি, কী হয়েছিল সেদিন- সেই সবকিছু সারা বিশ্ব আজও জানতে পারে ওই হাতে গোনা কিছু হিন্দু বাঙ্গালি সাংবাদিকের জন্য, যাঁরা সংবাদজগতের টানাপোড়েনে সত্যিই দূরদর্শী ছিলেন। তাঁরা অনুমান করেছিলেন তাঁদের কলমে সুরাবর্দি বেড়ি দেবেই। তাই যত দ্রুত সম্ভব ঘটনার অবিকৃত সত্য কোথাও অন্তত জমা
রাখতে সচেষ্ট হয়েছিলেন তাঁরা। ঐতিহাসিক সত্য সংরক্ষণের এই গুরুদায়িত্ব মুষ্টিমেয় কিছু হিন্দু সাংবাদিক এবং বুদ্ধিজীবী স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেদিন নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন বলেই সুরাবর্দির মারপ্যাঁচ দেশের ইতিহাসকে বিকৃত করতে দেয়নি। সেদিন তাঁরা কলম না ধরলে, দুর্দান্ত দূরদর্শিতার সঙ্গে যাবতীয় ঘটনা রিপোর্ট না করলে হয়তো গান্ধীর ছাগল চুরির তথ্যেই পূর্ণচ্ছেদ পেত নোয়াখালি।
সুরাবর্দি এতটাই ধূর্ত যে, তিনি দেখেন হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ তথ্য ও সংবাদ সচেতন। ১৯৪৬-এর ২৬ সেপ্টেম্বর কলকাতার সংবাদপত্র সম্পাদকদের সেক্রেটারিয়েটে ডেকে রাতারাতি এক বিশেষ বৈঠকের আয়োজন করলেন। আওড়ালেন ভারত রক্ষা আইনের দু-চার লাইন এবং কিছু বিধি। নির্দেশ দিলেন যে, এমন সংবাদ প্রকাশ করা যাবে না, যা দেশে প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। তাহলে কী কী প্রকাশ করা বারণ? সুরাবর্দির নির্দেশ ছিল:
সংবাদপত্রে খবর পরিবেশনের ক্ষেত্রে- (১) ঘটনার স্থানের উল্লেখ করা যাবে না (পরে থানার উল্লেখ অনুমোদন পায়)। (২) ঘটনার পর মৃত অথবা আহত ব্যক্তিদের আঘাত বা মৃত্যুর কারণের উল্লেখ করা যাবে না। (৩) আক্রান্ত বা আক্রমণকারী ব্যক্তিদের আঘাত বা মৃত্যুর কারণের উল্লেখ করা যাবে না। (৪) আক্রান্ত বা আক্রমণকারী ব্যক্তিদের নাম বা সম্প্রদায়ের উল্লেখ করা যাবে না। (৫) দেবস্থান বা পূজার বস্তু অপবিত্র করার বর্ণনা প্রকাশ করা যাবে না। (৬) ঘটনাস্থল বা ঘটনার কোনো ছবি প্রকাশ করা যাবে না।
এখানেই শেষ নয়, সরকারি নির্দেশ ছিল সংবাদ শিরোনামে হতাহতের সংখ্যার যেন উল্লেখ না থাকে। আরও অবাক কথা, এইসব নিষেধ সংবাদপত্রের প্রাপ্ত সংবাদের ওপরেই আরোপিত হয়, কিন্তু বেঙ্গল গভর্নমেন্ট কর্তৃক প্রকাশিত সংবাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল না এই বিধান। সেদিন হিন্দু বাঙ্গালি সাংবাদিকদের অনেকেই এর প্রতিবাদে বলেছিলেন যে, এতো সত্য তথ্য চাপা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। পূর্ববঙ্গের আনাচে কানাচে হিন্দুদের ওপর যে অকথ্য চলছে তা অস্বীকারের পথই তো হলো এহেন নিষেধাজ্ঞা। প্রতিবাদের ফলে সুরাবর্দি গেলেন ক্ষেপে। অত্যাচারিত হিন্দুদের সংবাদ পরিবেশনে দৃঢ়চিত্ত রইল সংবাদমাধ্যম। সংবাদপত্রে হিন্দুদের ওপর চলা হিংসা ও সন্ত্রাসের ঘটনার রিপোর্টিং প্রকাশিত হলে সুরাবর্দি যখন ‘সাম্প্রদায়িক উসকানি’র অজুহাত দিচ্ছেন, তখন প্রেস
অ্যাডভাইসরি কমিটির সাংবাদিকরা তার দিকে তীক্ষ্ণ প্রশ্নবাণ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, ‘আপনি (সুরাবর্দি) বলিয়াছেন সংবাদপত্রে সাম্প্রদায়িক অশান্তি সম্পর্কিত সংবাদ প্রকাশের প্রতিক্রিয়াতেই মফস্বলে অশান্তি দেখা দিতেছে। যে সংবাদপত্রগুলি আপনরা মন্তব্যের লক্ষ্য সেগুলিতে হিন্দুর উপর মুসলমানের অত্যাচারের
সংবাদটাই ফলাও করিয়া ছাপা হয়- ইহা আপনার ধারণা। সুতরাং ইহার প্রতিক্রিয়া যদি কোথাও দেখা দেয় তা পশ্চিমবঙ্গেই দেখা দেওয়া উচিত। পূর্ববঙ্গে দেখা দিতে পারে না। পূর্ববঙ্গে যাহা ঘটিতেছে তাহা যদি কিছুর প্রতিক্রিয়া হয়, উহা আপনার দলীয় মুসমিল লিগ সংবাদপত্রে প্রকাশিত মুসলমানের উপর হিন্দুর অত্যাচারের কাল্পনিক সংবাদের প্রতিক্রিয়া। সুতরাং দায়ী করিতে হইলে তাহাদিগকেই দায়ী করিতে হয়। কিন্তু পূর্ববঙ্গে এই সকল ঘটনা ঘটা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে যখন কোনো প্রতিক্রিয়া নাই তখন জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্রসমূহকে দায়ী করিবার বিন্দুমাত্র কারণ নাই।’ হিন্দু গণহত্যার ভূমি নোয়াখালির উপকূলে থাকা হিন্দু বাঙ্গালি বুদ্ধিজীবীর দ্বারা উপস্থাপিত যুক্তির তীব্রতা, তীক্ষ্ণতা, কলমের দৃঢ়তা সুরাবর্দির অত্যাচারী শাসনের দিকে বৃদ্ধাঙ্গুল প্রদর্শন করে এক সত্য হিন্দু নরসংহারের চিত্রের পাদপীঠে এনেছে সমকালীন ইতিহাসকে। সেদিন হাজার কাঁটাতারের বেড়া ডিঙ্গিয়ে একশ্রেণীর লেখক ও সাংবাদিকের অনমনীয় মনোভাব ও দৃঢ়চেতা সাংবাদিকতার কারণে নোয়াখালির হিন্দু গণহত্যার প্রকৃত ইতিহাস জেনেছে দেশবাসী।

















