বিশ্বচরাচরকে সর্বদা বিপন্মুক্ত করে থাকেন মা তারা
অভিজিৎ দত্ত
তন্ত্রসাধনার জন্য সাধারণত তান্ত্রিক ও জ্যোতিষীরা অমাবস্যার রাতকেই
বেছে নেন। তেমনই একটি হচ্ছে কৌশিকী অমাবস্যা। কথিত, বামাক্ষ্যাপা
কৌশিকী অমাবস্যায় সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। কৌশিকী অমাবস্যা, অন্য সব
অমাবস্যার থেকে একটু আলাদা। কারণ, তন্ত্র ও শাস্ত্র মতে ভাদ্র মাসের এই
তিথিটি একটু বিশেষ। তন্ত্রশাস্ত্র মতে অনেক কঠিন ও গুপ্ত সাধনা এই তিথিতে
করলে আশাতীত ফল মেলে। বৌদ্ধ ও হিন্দু তন্ত্রশাস্ত্রে এই রাতের এক বিশেষ
মাহাত্ম্য আছে। তন্ত্র মতে এই অমাবস্যার রাতকে তারারাত্রিও বলা হয়। এই
রাত্রে এক বিশেষ মুহূর্তে স্বর্গ ও নরক দুইয়ের দ্বার মুহূর্তের জন্য উন্মুক্ত হয়
এবং সাধক নিজের ইচ্ছামতো ধনাত্মক অথবা ঋণাত্মক শক্তি নিজের সাধনার
মধ্যে আত্মস্থ করে ও সিদ্ধি লাভ করে। তাই তন্ত্রসাধনার জন্য এই অমাবস্যা
খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
এই কৌশিকী অমাবস্যার রাতে মা কৌশিকী আর তারা মায়ের পূজা করা
হয়। সাধারণত কৌশিকী কালী গৃহস্থের বাড়িতে পুজিত হন আর তারা মায়ের
পূজা সাধারণত কোনো নির্জন স্থানে বা শ্মশানে করা হয়, কিন্তু আজকাল
পাড়ার ক্লাবেও তারা মায়ের পূজা হচ্ছে।
মা কৌশিকী (কখনো কখনো অম্বিকা, মহাসরস্বতী বা চণ্ডিকা নামেও
পরিচিতা) হলেন, যিনি মহাদেবীর যোদ্ধরূপ এবং অযোনিসম্ভবা শক্তি।
দেবতাদের আকুল আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি পার্বতীর দেহকোষ থেকে আবির্ভূতা
হয়েছিলেন রাক্ষস ভ্রাতৃদ্বয় শুম্ভ ও নিশুম্ভকে বধ করার জন্যে।
মা তারা হলেন দেবী কালীর একটি বিশিষ্ট রূপ। ইনি দশমহাবিদ্যার দ্বিতীয়
মহাবিদ্যা। কালীর মতোই তারা ভীষণা দেবী। বৌদ্ধমতেও তারাদেবীর পূজা
প্রচলিত। তারার মূর্তিকল্পনা কালী অপেক্ষাও প্রাচীনতর। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম
জেলার তারাপীঠে অবস্থিত দেবী তারার মন্দির বিখ্যাত। তিনি দেবী পার্বতীর
এক উগ্র রূপ। বিখ্যাত তারা-সাধক হলেন বামাক্ষ্যাপা।
সল্টলেক এলাকার একমাত্র পটুয়া কার্তিক দাস এই বছর দুটি তারা মায়ের
মূর্তি গড়েছেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করায় জানা গেল, তারা মা আর মা কালীর
মধ্যে পার্থক্য কোথায়? তিনি বললেন, সমুদ্র মন্থনের সময় যে হলাহল নির্গত
হয়েছিল, সেই হলাহল পান করেন মহাদেব। সেই হলাহলের বিষক্রিয়া থেকে
মহাদেবকে স্তন্যপান করিয়ে উদ্ধার করেন তারা মা। তারা মায়ের ঊর্ধ্বাঙ্গ
অনাবৃত কিন্তু নিম্নাঙ্গ বসনাবৃত। তারা মায়ের পা দুটি খুবই মহত্ত্বপূর্ণ, তন্ত্রমতে
তারা মায়ের যে রূপ কল্পনা করা হয়েছে সেখানে বিশেষ করে বলা হয়েছে,
রত্নপাদুকায় পদদ্বয় শোভিত। তারা মায়ের পা আলাদা করে তৈরি করা হয়।
তারাপীঠে সতীর নয়নতারা পড়েছিল আর তার থেকেই তারাপীঠ নাম
হয়েছে তবে মা তারার উদ্ভব নিয়ে অনেক গল্প প্রচলিত রয়েছে।
বৌদ্ধমতেও দেবী তারার উল্লেখ রয়েছে। বৌদ্ধমতে আর্য্যতারা হলেন
একজন গুরুত্বপূর্ণ দেবী যিনি মহাযান বৌদ্ধমতে একজন ‘নারী বোধিসত্ত্ব’
এবং বজ্রযান বৌদ্ধধর্ম-এ একজন নারী বুদ্ধ হিসেবে বিবেচিত
হন। বজ্রযান বৌদ্ধমতের পঞ্চধ্যানীবুদ্ধের অন্যতম হলেন
অক্ষোভ্য। তাঁর শক্তি হলেন তারা। তোড়ল তন্ত্র অনুসারে দেবী
তারার ভৈরব হলেন- অক্ষোভ্য। বৌদ্ধমতে মা তারা হলেন
অসংখ্য অসংখ্য বুদ্ধ ও বোধিসত্ত্বের জন্মদাত্রী। দশমহাবিদ্যার
দ্বিতীয় মহাবিদ্যা তারা মায়ের আটটি রূপ হলো- তারা
(বামাকালী), উগ্রতারা, নীলসরস্বতী, একজটাতারা, তারিণীতারা,
নিত্যাতারা, বজ্রতারা ও কামেশ্বরী তারা। মহাভারতে যুধিষ্ঠির
ও অর্জুনের দুর্গাস্তবে দেবী আরণীর উল্লেখ রয়েছে। তিনি
জগতকে সকল বিপন্মুক্ত করেন। তিনি ত্রাণকর্ত্রী, তিনি সংসারিক
ও আধ্যাত্মিক বিপদ থেকে সকল প্রাণীকে রক্ষা করেন। মা তারা
অনেক রূপে প্রকাশিত হতে পারেন, যার মধ্যে সবুজ তারা
এবং সাদা তারা বিশেষভাবে পরিচিত।
কৌশিকী অমাবস্যার পরের অমাবস্যায় হয় মহালয়া। অর্থাৎ
দেবীপক্ষের শুরু আর তার পরের অমাবস্যায় হয় কালীপূজা।
কোনো কোনো পণ্ডিত মনে করেন কৌশিকী অমাবস্যা মোটেই
তারা মায়ের আবির্ভাব তিথি নয়। কালীপূজা যে অমাবস্যায়
হয় সেটাই তারা মায়ের আবির্ভাব তিথি, তবে তন্ত্রমতে কালী
আর তারা- দু’জন দেবীর পৃথক অস্তিত্ব রয়েছে।

















