ভারতকে অস্থির করার নেপথ্য কৌশল
অরুণ কুমার চক্রবর্তী
ভারত আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো গণতান্ত্রিক দেশ। একদিকে ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে দেশকে অস্থির করার জন্য নানা ষড়যন্ত্র সক্রিয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হলো- ইসলামিক উগ্রপন্থীদের ভূমিকা। তারা কেবল ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করছে না, বরং ডিপ স্টেটের মদত, মুসলমান অনুপ্রবেশ ও জনবিন্যাসের পরিবর্তন- এই তিনটি বিষয়কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ভারতের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার কৌশল নিয়েছে।
১. ইসলামিক উগ্রপন্থা: মূল দর্শন ও কৌশল: ভারতে ইসলামিক সমাজের একটি বড়ো অংশ শান্তিপ্রিয় হলেও, উগ্রপন্থী একটি অংশ আরব সাম্রাজ্যবাদ ও পাকিস্তানি প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে দেশবিরোধী কাজ করছে। আইএসআইএস, আল-কায়েদা, লস্কর-ই-তৈবা, জইশ-ই-মহম্মদ-এসব সংগঠনের ভাবধারা ভারতে মুসলমান যুবকদের একটি অংশকে বিপথে টেনে নিচ্ছে। ধর্মীয় আবেগকে উসকে দিয়ে ‘হিন্দুদের বিরুদ্ধে জেহাদ’ চালানোর বার্তা দেওয়া হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া ও গোপন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তরুণদের প্রলুব্ধ করা হচ্ছে।
২. ইকোসিস্টেমকে ব্যবহার করার কৌশল: ভারতে ইকোসিস্টেম বলতে বোঝানো হয়- আমলাতন্ত্র, মিডিয়া বুদ্ধিজীবী মহল, কর্পোরেট ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নেপথ্য প্রভাব। মুসলমান উগ্রপন্থীরা এটিকে দুইভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে-
(ক) দুর্বলতা কাজে লাগানো প্রশাসনিক জটিলতা, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা- এগুলোকে উগ্রপন্থীরা সুযোগ হিসেবে নেয়। উদাহরণ: অনেক সময় সন্ত্রাসবাদীদের গ্রেপ্তারের পর মামলার ফাঁকফোকরে তারা ছাড়া পেয়ে যায়।
(খ) ভেতরে অনুপ্রবেশ গোয়েন্দা সংস্থা বা পুলিশ বাহিনীর মধ্যে কিছু দুর্বল বা দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়। সরকারি নথি ফাঁস, ভেতরের তথ্য বাইরে পাঠানো- এসব ক্ষেত্রে উগ্রপন্থীরা সুবিধা পায়।
৩. বিদেশি অনুপ্রবেশ: সীমান্তকে অস্ত্র বানানো: ভারত চারদিকে বিশাল সীমান্ত দ্বারা ঘেরা। এর মধ্যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের সীমান্ত মুসলমান উগ্রপন্থীদের কার্যকলাপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
(ক) পাকিস্তানের ভূমিকা: পাকিস্তানের আইএসআই সরাসরি জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ করে। কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ভারতের অভ্যন্তরে অস্থিরতা ছড়ানো তাদের মূল লক্ষ্য।
(খ) বাংলাদেশ সীমান্ত: অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা কেবল অর্থনৈতিক কারণে আসে না, অনেকেই চরমপন্থী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ত্রিপুরায় এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। স্থানীয় রাজনীতি ও ভোটব্যাংকে এই অনুপ্রবেশকারীরা ব্যবহৃত হচ্ছে, ফলে সমস্যার সমাধান আরও কঠিন হচ্ছে।
(গ) মিয়ানমার সীমান্ত: রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের একটি অংশ মানবিক কারণে আশ্রয় পেয়েছে, কিন্তু এর মধ্যেই উগ্রপন্থী উপাদান ঢুকে পড়েছে। এর পরবর্তীতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে ভূমিকা রাখছে।
৪. জনবিন্যাস পরিবর্তন: কৌশলগত অস্ত্র: মুসলমান উগ্রপন্থীরা জানে- ভারতকে সরাসরি যুদ্ধ করে হারানো সম্ভব নয়। তাই তারা ডেমোগ্রাফিক পরিবর্তনকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে নিয়েছে।
(ক) নির্দিষ্ট এলাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি: সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে দ্রুত মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধি হচ্ছে। ধর্মান্তরণ, একাধিক বিবাহ ও উগ্র সংগঠনের সহায়তায় জনসংখ্যার ভারসাম্য বদলে দেওয়া হচ্ছে।
(খ) ভোটব্যাংক রাজনীতি: রাজনৈতিক দলগুলো এই জনবিন্যাসকে ভোটের জন্য ব্যবহার করছে। মুসলমান অধ্যুষিত এলাকায় আলাদা পরিচয় ও প্রশাসনিক দাবি উসকে দেওয়া হচ্ছে।
(গ) পৃথকীকরণ প্রবণতা নির্দিষ্ট এলাকায় মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে গেলে সেখানে হিন্দুদের বঞ্চিত করা, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করা হয়। কাশ্মীরে যেমন ঘটেছে, তেমন পরিস্থিতি অন্যান্য রাজ্যেও তৈরির চেষ্টা চলছে।
৫. মিডিয়া ও প্রোপাগান্ডা: বিভ্রান্তির কৌশল: আন্তর্জাতিক স্তরে মুসলমান উগ্রপন্থীরা ভারতকে ‘সংখ্যালঘু-বিদ্বেষী দেশ’ হিসেবে তুলে ধরছে। মানবাধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ইত্যাদি অজুহাতে ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা চলছে। মিডিয়ার মাধ্যমে অপপ্রচারের দ্বারা ভুয়া খবর, গুজব ছড়িয়ে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা উসকে দেওয়া হচ্ছে।
৬. সমন্বিত প্রভাব: কীভাবে অস্থিরতা তৈরি হয়: মুসলমান উগ্রপন্থীরা যখন ডিপ স্টেটের সহায়তা, বিদেশি অনুপ্রবেশ ও জনবিন্যাস পরিবর্তন- এই তিনিটি হাতিয়ার একসঙ্গে ব্যবহার করে, তখন ভারতের নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়। সন্ত্রাস ও দাঙ্গা ঘটে। সীমান্ত রাজ্যগুলিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা আনে। জনসংখ্যার ভারসাম্য বদলে দীর্ঘমেয়াদি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের পথ প্রশস্ত হয়। আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়।
এর সমাধান ও প্রতিরোধ কৌশল:
(ক) ইকোসিস্টেমের প্রভাব খর্ব করা: আমলাতন্ত্র ও গোয়েন্দা সংস্থাকে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। প্রযুক্তি ও তথ্যনির্ভর গোয়েন্দা কার্যক্রম বাড়াতে হবে।
(খ) সীমান্ত সুরক্ষা: বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও পাকিস্তান সীমান্তে নজরদারি কঠোর করতে হবে। অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত ও পুশব্যাক নীতি কার্যকর করতে হবে।
(গ) জনবিন্যাস রক্ষার নীতি: জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগ করা জরুরি। ধর্মান্তরণের নামে বেআইনি কার্যকলাপ বন্ধ করতে হবে।
(ঘ) নাগরিক সচেতনতা মুসলমান সমাজের মধ্যেই উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সংস্কৃতির মাধ্যমে যুবকদের মূলধারায় আনা জরুরি। ভারত যদি সময়মতো প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেয়, তাহলে এই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবে।

















