শ্রীভূমির মাটিতে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত নিশ্চিতভাবে ইউনুসের উত্তর-পূর্বের দাবিকে আরও জোরালো করবে।
আজকে যারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঢালে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন, তাঁরাই কিছুদিন আগে করিমগঞ্জ জেলাকে রবিঠাকুরের দেওয়া ‘শ্রীভূমি’ নামে উৎসর্গ করায় তীব্র বিরোধিতায় রাজপথে নেমেছিলেন।
রঞ্জন কুমার দে
বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত রবীন্দ্রনাথ ইস্যুতে বারবার সরগরম হচ্ছে সীমান্ত জেলা শ্রীভূমি। যে কোনোভাবে জড়িয়ে যাচ্ছেন কবিগুরু, সেটা জেলাটির নাম পরিবর্তন কিংবা তাঁর রচিত সংগীতে। সম্প্রতি জেলাটিতে সর্বভারতীয় একটি রাজনৈতিক দলের অনুষ্ঠানে দলীয় এক কর্মী বিধুভূষণ দাস কবিগুরু রচিত বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের দুটি পঙ্ক্তি ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি গাওয়ায় নতুন এক বিতর্কের সূচনা হলো। বিতর্কের রেশ শেষ না হতেই জেলাটিতে আবার শাসক দলের এক কর্মীসভায় ভুলভাল জাতীয় সংগীতের পরিবেশনায় বিরোধীরা সমালোচনায় মুখর হয়েছে। রবি ঠাকুরের গান বিশ্বের দুটি দেশের জাতীয় সংগীত, সেটা একজন ভারতীয় এবং বাঙ্গালি হিসেবে অবশ্যই গর্বের। একজন ভারতীয় অমুসলমানের রচিত সংগীত কীভাবে বাংলাদেশের মতো আপাদমস্তক মোল্লাবাদী দেশের জাতীয় সংগীতের মর্যাদা পেলো, সেখানেই অনেকের কৌতূহল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে ১৯০৫ সালের কার্জনের বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে কবিগুরুর ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের আবির্ভাব। যদিও এটার কোনো পোক্ত
দলিল-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। রবীন্দ্র গবেষক প্রশান্ত কুমার পাল ১৯৯০ সালে তাঁর প্রকাশিত পুস্তক ‘রবি জীবনী’তে লিখেছেন যে, এই গানটি প্রথমবার গাওয়া হয় কলকাতা টাউন হলের একটি সাহিত্য আসরে ১৯০৫ সালের ২৫ আগস্ট। লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ একটি আন্তর্জাতিক মিডিয়াকে সাক্ষাৎকারে জানান- ১৯৭১ সালের পূর্ববর্তী তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ‘আমাক সোনার বাংলা’ গানটিকে রবীন্দ্রসংগীত হিসেবে অনেক অনুষ্ঠানে গাওয়া
হতো। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটিকে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করার প্রথম আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়। তৎকালীন ছাত্রলিগের সভাপতি নুরে আলম সিদ্দিকী এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন জাতীয় সংগীত চয়নে ‘সোনার বাংলা’ ছাড়াও দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘ধনধান্য পুষ্পভরা’ গানটিও অনেকের পছন্দের তালিকায় ছিল। তবে প্রধান দুটি কারণে এ গানটিকে নির্বাচিত করা সম্ভব হয়নি।
প্রথমত, গানটির কোথাও ‘বাংলা’ বা ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি ছিল না, দ্বিতীয়ত, গানটির কোনো রেকর্ড সেই সময় পাওয়া যায়নি। সেই কারণে নাকচ হয়ে যায়। গানের উপযুক্ত রেকর্ড না থাকলে ঠিক কোন সুরে এবং গানের কতটুকু জাতীয় সংগীত হিসেবে ব্যবহার করা হবে তা নিয়ে সংশয় থেকে যায়। অবশেষে ১৯৭০ সালের জহির রায়হান পরিচালিত, ‘জীবন থেকে নেওয়া’ চলচ্চিত্রে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটির রেকর্ড থেকে যাওয়ায় গানটি জাতীয় সংগীতের মর্যাদায় এগিয়ে যায়। পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা পূর্ববর্তী প্রায় প্রত্যেকটি আন্দোলন, সভায় ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি বাজানো হয়েছে। ১৯৫০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদ বাহান্নর ভাষা বীরদের স্মরণে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’র পাশাপাশি ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটিও পরিবেশিত হয়। বিভিন্ন বাধা, প্রতিকূলতা এভাবে পেরিয়ে ১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম
আনুষ্ঠানিক মন্ত্রীসভার বৈঠকে রবি ঠাকুরের ‘আমার সেনার বাংলা’ গানটির প্রথম দশ পঙ্ক্তিকে দেশটির জাতীয় সংগীতের মর্যাদা ও স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
কিন্তু গত বছর জেহাদি ছাত্র-জনতা অভুত্থানে হাসিনার শাসনের পতন হলে ইউনুস সরকার প্রথমে এই জাতীয় সংগীতের সংশোধন ও পরিবর্তন চেয়েছিল। অভিযোগ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধী ছিলেন এবং তাঁর জাতীয় সংগীত অখণ্ড বঙ্গকে উদ্দেশ্য করে লেখা। কবিগুরুর নামে আরও কুৎসা রটানো হয় যে তিনি প্রজানিপীড়ক, মুসলমান বিদ্বেষী, তাঁর পূর্বপুরুষরাও নাকি পতিতালয়ে যেতেন ইত্যাদি। ভেঙে ফেলা হয়েছিল কবিগুরুর ভাস্কর্য, জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাঁর সৃজনশীলতা। অথচ কবিগুরু ছিলেন নিরাকার ব্রহ্মে অনুরাগী। কবি জীবদ্দশায় স্পষ্ট করে বলেছিলেন- কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম আমার নয়। আমি ব্রাত্য, আমি মন্ত্রহীন, আমি পঙ্ক্তিহারা, আমি তোমাদেরই লোক।
রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’কে নিষিদ্ধ করতে ১৯৭৫ সালে খন্দকার মোস্তাক সরকার, পরবর্তীতে বিএনপির প্রবর্তক জিয়াউর রহমান সরকার, ২০০১ সালে খালেদা সরকার-সহ সবাই শুধুমাত্র জাতীয় সংগীতটি পরিবর্তনের লিখিত প্রস্তাবনা পর্যন্ত আনতে সক্ষম হয়েছিল। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরও একই বিতর্ক কিন্তু আবারও বুমেরাং হয়ে ফিরে গিয়েছে। স্বভাবতই অসমের শ্রীভূমি জেলার কংগ্রেস কার্যালয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ইস্যুতে হিমন্ত সরকার কঠোর তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। অসমের কংগ্রেস ব্রিগেড নিজেদের সিদ্ধান্তে অবিচল, উলটে তারা শাসক দলকে বাঙ্গালি তথা রবীন্দ্রনাথ
বিরোধী আখ্যায়িত করছে। বরাক-সহ পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল, বাম, তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সবাই সভা-সমিতি, পতাকা মিছিল, মোমবাতি মিছিল কোনোটাই বাদ দিচ্ছেন না ইসুটিতে বিজেপিকে বাঙ্গালি সংস্কৃতি বিরোধী হিসেবে ছবি বানানোর। বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ ইউনিটও অসমের সোনার বাংলা ইস্যুতে নিজেদের সরিয়ে নিয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচার চেষ্টায়। আজকে যারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঢালে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন, তাঁরাই কিছুদিন আগে
করিমগঞ্জ জেলাকে রবিঠাকুরের দেওয়া ‘শ্রীভূমি’ নামে উৎসর্গ করায় তীব্র বিরোধিতায় রাজপথে নেমেছিলেন।
‘শ্রীভূমি’ কবিতার সঙ্গে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের যথেষ্ট যোগসূত্র রয়েছে। ঐতিহাসিকদের দাবি ‘আমার সোনার বাংলা’ গান কবি লিখেছিলেন ‘বঙ্গভঙ্গে’র আবহে আর ‘শ্রীভূমি’ কবিতা লিখেছিলেন বঙ্গ থেকে তৎকালীন অবিভক্ত সিলেটকে বিচ্ছেদ করে অসমের সঙ্গে মিশিয়ে নেওয়ার পীড়াতে। কবি ১৯৯৯ সালের ৪ নভেম্বর সুরমা মেইল নামক ট্রেনে সিলেট যাওয়ার উদ্দেশে শিলং থেকে গৌহাটি হয়ে করিমগঞ্জে পৌঁছান। গোটা ভ্রমণকালে কবি সুরমা ভ্যালির সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে এবং এলাকাটিকে মূল বঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখায় বিষণ্ণতার কবিতাটি লিখেন- ‘মমতাবিহীন কালস্রোতে বাংলার রাষ্ট্রসীমা হতে নির্বাসিতা তুমি সুন্দরী শ্রীভূমি।’
যদিও কবিতার কোনো জায়গায় শুধু করিমগঞ্জকেই উদ্দেশ্য করে শ্রীভূমি কবিতার আবির্ভাব হয়েছে এমনটা দাবি করা যায় না, তবে সেই সুরমা ভ্যালির অবিভক্ত সিলেটের একমাত্র করিমগঞ্জই দেশ ভাগের পর ভারতের সঙ্গে যুক্ত আছে। তাই শতবর্ষ পর কবিগুরুর স্মৃতি ও সম্মানে অবশ্যই করিমগঞ্জের নাম
শ্রীভূমি রাখাই যায় সেখানে আজকের রবীন্দ্রনাথ অনুরাগীদের বিরূপ হওয়ার যুক্তি ছিল না। ‘আমার সোনার বাংলা’ ইস্যুতে বিরোধীদের দাবি প্রধানমন্ত্রী মোদী ২০১৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের দলীয় সভায় ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ উচ্চারণ করেছিলেন এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা’ও পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সভায় পশ্চিমবঙ্গকে ‘সোনার বাংলা’ গঠনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু ভারতের ২০১৪ সালের বাংলাদেশের সঙ্গে ২০২৫ সালের বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের বিস্তর ফারাক হয়ে গেছে।
এখন ইউনুস সরকার প্রকাশ্যে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের চিকেন নেক নিয়ে হুমকি দিচ্ছে, পাকিস্তান ও চিনকে দেওয়া বিশেষ নকশায় বাংলাদেশ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের
শামিলের দুঃসাহসিকতা দেখাচ্ছে। ঘনঘন চীন-বাংলাদেশ-পাকিস্তান কূটনৈতিক বৈঠক বসছে, পাকিস্তানের নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষনেতারা ভারত-বাংলা সীমান্ত পরিদর্শনে আসছে, মোস্ট ওয়ান্টেড জাকির নায়েককে এরা আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দিকে বাংলাদেশের শকুন দৃষ্টি অনেক পুরানো।
১৯৫৭ সালের গাগমারী সম্মেলনে জামায়াতপন্থী মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষানী ঘোষণা করেছিল, ‘অসম আমার, পশ্চিমবঙ্গ আমার, ত্রিপুরাও আমার। এগুলো ভারতের কবল থেকে ছিনিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মানচিত্র কোনোদিন পূর্ণতা পাবে না।’ তাই আজকের এই পরিস্থিতিতে যে কোনো রাজনৈতিক দলেরই অন্ততপক্ষে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে আনুগত্যতায় আরেকটু সংযমী হওয়া প্রয়োজন, অন্যথায় এটা পরোক্ষভাবে মহম্মদ ইউনুসের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দাবিকে আরও পাকা করবে।
















