ভারতীয় সমাজের অভিন্ন অঙ্গ
ইহা প্রমাণিত সত্য যে, ভারতের জনজাতি সমাজ ভারতীয় জনজীবনের অভিন্ন অঙ্গ। রামায়ণ-মহাভারত এবং বিভিন্ন পৌরাণিক আখ্যানে ইহার বহু উল্লেখ রহিয়াছে। তাঁহারা স্ব-স্ব সামাজিক, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রাখিয়াও ভারতীয় সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করিয়াছেন। রামায়ণে শবর, নিষাদ ও বানর জনজাতির উল্লেখ রহিয়াছে। ভগবান শ্রীরামচন্দ্র সুগ্রীবাদির সহিত সখ্য স্থাপন করিয়া তাহাদিগের সাহচর্যে প্রবল পরাক্রান্ত অত্যাচারী রাবণকে নিধন করিয়াছেন। বনবাসী গুহককে আলিঙ্গন করিয়াছেন। শবরীমাতার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিয়া ভক্তিভরে তাহাকে প্রণাম করিয়াছেন। মহাভারতে মহাবলশালী ঘটোৎকচকে জনজাতি সমাজোদ্ভূত বলিয়া মনে করা হইয়া থাকে। তিনি ছিলেন মধ্যমপাণ্ডব ভীম ও হিড়িম্বা রাক্ষসীর পুত্র। মণিপুরের জনজাতি সমাজের রাজকুমারী চিত্রাঙ্গদাকে তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন বিবাহ করিয়াছিলেন। তাঁহাদের পুত্র বভ্রুবাহনও অর্জুনের ন্যায় মহাবীর ছিলেন। সুপ্রাচীন কাল হইতে বিভিন্ন উপজাতি ও জনজাতির মানুষেরা ভারতীয় জনসমুদ্রে একাত্ম হইয়া জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রচনা করিয়া ভারতীয় সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করিয়াছেন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামেও তাঁহাদের ভূমিকা স্বর্ণাক্ষরে লিখিত রহিয়াছে। ইসলামি শাসনকালে ভীল জনজাতির মানুষরা মহারাণা প্রতাপ সিংহের সেনাবাহিনী এবং মাওয়ালি জনজাতির মানুষেরা ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিয়াছেন। ইসলামি শাসনের বিরুদ্ধে গোণ্ড জনজাতির রানি দুর্গাবতী একজন অকুতোভয় রানি রূপে পরিচিত ছিলেন। ইংরাজ ঔপরিবেশিক শাসনের অবসানকল্পে সমগ্র ভারতে জনজাতি যোদ্ধাদিগের নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত রহিয়াছে। ভারতের গৌরবময় স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁহাদিগের দীর্ঘ অবদান রহিয়াছে। ইংরাজ শাসনের বিরুদ্ধে মূর্তিমান প্রতিরোধ হিসাবে ভগবান বীরসা মুণ্ডা, সিধু-কানু, ফুলো-ঝানো, তানা ভগত, বুধু ভগত, তিলকা মাঝি, জিতু সর্দার; উত্তর-পূর্ব ভারতের রানি গাইদিনল্যু; দক্ষিণ ভারতে অল্লুরি সীতারামা রাজু-সহ অংসখ্য জনজাতি যোদ্ধার নাম উল্লেখ করা যাইতে পারে। এই বৎসর ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সর্বশ্রেষ্ঠ জনজাতি যোদ্ধা ভগবান বীরসা মুণ্ডার সার্ধশতজন্মবার্ষিকী। কয়েক বৎসর পূর্বেই ভারত সরকার তাঁহার জন্মদিবসকে ‘জনজাতি গৌরব দিবস’ রূপে ঘোষণা করিয়া সমগ্র জনজাতি সমাজের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করিয়াছে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ তাঁহার জন্মসার্ধশতবর্ষ উপলক্ষ্যে সমগ্র সমাজকে সঙ্গে লইয়া শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করিয়াছে।
কিন্তু অত্যন্ত আক্ষেপের বিষয় হইল, সাম্রাজ্যবাদী ইংরাজ শাসকরা ভারতমাতার রক্ষক জনজাতি সমাজকে মূল ভারতীয় সমাজ হইতে বিচ্ছিন্ন করিবার প্রয়াস করিয়াছে। তাহারা ভারতীয় সমাজকে দীর্ণ করিবার উদ্দেশ্যে ১৯৩০ সালে তাহাদিগকে ‘আদিবাসী’ পরিচয় প্রদান করিয়াছে। তাহার বহু পূর্ব হইতেই সেবার আড়ালে তাহারা সহজ সরল জনজাতি সমাজকে ধর্মান্তরিত করিয়া ভারতবিরোধী করিয়া তুলিবার কার্য শুরু করিয়াছে। অতীব দুঃখের বিষয় যে, স্বাধীন ভারতেও জনজাতি সমাজের মানুষদিগকে ধর্মান্তরিত করিবার এবং তাহাদিগকে হিন্দু সমাজ হইতে পৃথক করিবার অপচেষ্টা চলিতেছে। ভারতের সংবিধান প্রণেতাগণ ভারতীয় সংবিধানে ইংরাজকৃত ‘আদিবাসী’ শব্দটিকে স্বীকার করেন নাই। তাঁহারা তফশিলি উপজাতি অথবা জনজাতি বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। তাহা সত্ত্বেও সেকুলার ও বামমনস্ক তথাকথিত বুদ্ধিজীবীগণ নিরন্তর জনজাতিদিগকে বৃহত্তর সমাজ হইতে পৃথক করিবার অপচেষ্টা অব্যাহত রাখিয়াছে। সুখের বিষয় যে, বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার জনজাতিদিগের সার্বিক উত্থানের নিমিত্ত বিধিধ প্রকারের উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর হইতেই বনবাসী কল্যাণ আশ্রম জনজাতি সমাজের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য নানাবিধ প্রকল্প পারিচালনা করিতেছে। ইহা অত্যন্ত গৌরবের বিষয় যে, ভারতের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করিতেছেন জনজাতি সমাজের মহিলা প্রতিনিধি শ্রীমতী দ্রৌপদী মুর্মু।

















