ভারতের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধ
আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব
বিমলশঙ্কর নন্দ
ইচ্ছে করেই শিরোনামে আমেরিকা না লিখে ট্রাম্প লেখা হয়েছে। এটা ঠিক যে ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। আর আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র একটি রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা। আমেরিকার রাষ্ট্রপতি যে সিদ্ধান্ত নেবেন সেজন্য তাঁকে আমেরিকার পার্লামেন্ট ইউএস কংগ্রেসের কাছে তেমন একটা জবাবদিহি করতে হয় না। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি যেহেতু কংগ্রেসের কোনো কক্ষের সদস্য থাকতে পারেন না তাই কংগ্রেস সদস্যরা তাঁকে
সরাসরি প্রশ্ন করতে পারেন না। তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে পারেন না। তাই নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি অনেক স্বাধীনতা ভোগ করেন। আর আমেরিকার মতো দেশে যেখানে জাতীয় স্বার্থ সবার আগে সেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগান তুলে নিজের মতোই সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু করেছেন। আমেরিকার প্রাক্তন বিদেশ সচিব ড. হেনরী কিসিঞ্জার একবার বলেই দিয়েছিলেন- ‘আমেরিকার কোনো বিদেশনীতি নেই’। তাই ভারত-সহ আরও বহু দেশের উৎপাদিত পণ্যের উপর ডোনাল্ড ট্রাম্প যে শুল্ক আরোপ চলেছেন তা আমেরিকা অনুসৃত দীর্ঘমেয়াদী কোনো
নীতির ফল নয়। তা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনুসৃত নীতি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেজাজের মতো এই নীতিও পরিবর্তনশীল। তাই একে নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ারও কোনো কারণ নেই।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ ও এবং ব্যবস্থাপনার জন্য আছে World Trade Organisation (WTO) বা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা। ১৯৯৪ সালে মারাকেশ সমঝোতার ফলশ্রুতি হিসেবে ১ জানুয়ারি, ১৯৯৫ সালে গড়ে ওঠে এই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত General Agreement on Tariffs and Trade (GATT)-এর স্থলাভিষিক্ত হয় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা। এই বিশ্ব সংস্থাটির প্রধান কাজই হলো বাণিজ্য চুক্তি সম্পর্কিত আলোচনার একটি ফ্রেমওয়ার্ক বা
পরিকাঠামো তৈরি করা এবং এর সদস্যদের মধ্যে বাণিজ্য বিরোধের মীমাংসা করা। কিন্তু ১৬৬ সদস্য বিশিষ্ট এই সংস্থাকে ডোনাল্ড ট্রাম্প গুরুত্বই দেন না। তাঁর দেশের বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তিনি সব আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে বেরিয়ে আসার হুমকি দেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প জানেন তাঁর দেশের নমিনাল জিডিপি এই বছরের ২০২৫ সালের হিসেবে ৩০.৫০৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং তা বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি। এই দেশ বিশ্ব অর্থনীতির মূল প্রক্রিয়ার বাইরে চলে গেলে বিশ্ব অর্থনীতিতেই বিপর্যয় নেমে আসবে। তাই ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো প্রেসিডেন্ট মনের সুখে বিভিন্ন দেশকে ব্ল্যাকমেইলিং করে যান। ফলে অর্থনীতিতে সাময়িক ঝড় ওঠে কিন্তু পরে তা আবার (২০২৫ সালের) পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ভারত আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা থাকলেও বাণিজ্য নিয়ে বিরোধ নতুন নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প রাষ্ট্র পরিচালনা করেন ‘বিজনেস’
করার ঢঙে। সেখানে অর্থনৈতিক লাভক্ষতি তাঁর কাছে রাজনৈতিক লাভক্ষতির চেয়ে সবসময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর আগের মেয়াদে ট্রাম্প যখন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন (২০১৭-২১), তখনও বাণিজ্য নিয়ে দু’দেশের বিরোধ ছিল। ট্রাম্প সেই সময়ও অভিযোগ করেছিলেন যে ভারত আমেরিকা থেকে আমদানিকৃত দ্রব্যের ওপর ১২ শতাংশ শুল্ক চাপায় যেখানে আমেরিকা ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক ধার্য করে মাত্র ২.২ শতাংশ। এই কারণে
ট্রাম্প প্রশাসন ২০১৯ সালে ভারতকে দেওয়া Generalised System Prefer- ences (GSP) মর্যাদা প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। GSP হলো এক ধরনের
অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক ব্যবস্থা (preferen- tial tariff system) যা আমেরিকার মতো উন্নত দেশ কোনো উন্নতিশীল দেশের আর্থিক প্রগতি এবং ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নতির জন্য সেই দেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর খুব কম আমদানি শুল্ক চাপায় বা আমদানি শুল্ক পুরোপুরি ছাড় দেয়। ভারতকে দেওয়া এই অগ্রাধিকারমূলক মর্যাদা (preferential status) আমেরিকা প্রত্যাহার করার ফলে ভারতের রপ্তানি বাণিজ্যের ওপর কিছুটা প্রভাব পড়ে আর
তার পালটা হিসেবে ভারতও আমেরিকা থেকে আমদানি করা বাদাম, ইস্পাত-সহ বেশ কিছু দ্রব্যের ওপর আমদানি শুল্ক চাপায়। এই বিরোধ সত্ত্বেও ২০২০ সালে একটি ছোটো আকারের বাণিজ্য চুক্তি করার পথে দুটি দেশই এগিয়ে ছিল অনেকখানি, কারণ ভারত-আমেরিকা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের গুরুত্ব ট্রাম্প বুঝতে পেরেছিলেন। ২০১৯ সালেই এই বাণিজ্য ১১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছুঁয়েছিল। কিন্তু ২০২০ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প হেরে যাওয়ার পর এই চুক্তি
আর হয়নি। জো বাইডেন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর আমেরিকা ভারতের প্রতি বেশ কিছুটা সহযোগিতামূলক বাণিজ্য নীতি গ্রহণ করে। এখন আবার বিরোধের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। সুতরাং ভারতের সঙ্গে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক থাকলেও বাণিজ্য নিয়ে বিরোধ কখনোই সেভাবে মিটে যায়নি।
যারা ভারতীয় পণ্যের ওপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপকে ভারতের বিদেশনীতির ব্যর্থতা বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা এই খবরটা
লুকিয়ে যান যে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় বারের জন্য ক্ষমতায় এসে শুল্ক আরোপকে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতি এবং বিদেশ নীতির অন্যতম হাতিয়ারে পরিণত করেছেন। আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বিদেশ নীতি এবং বাণিজ্য নীতির তেমন কোনো পার্থক্য নেই। এবার ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন কিছু দেশের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেছেন যারা আমেরিকার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ দেশ। অনেক ক্ষেত্রে ওই দেশ তার নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন ভাবে আমেরিকার ওপর নির্ভর করে। এর সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ হলো ইজরায়েল। ২০২৫-এর ২ এপ্রিল ট্রাম্প ইজরায়েলের পণ্যের ওপর ১৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে দেন। ৮ এপ্রিল ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন এবং শুল্ক-সহ বিভিন্ন বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়। কিন্তু তার পরও ট্রাম্প ইজরায়েলের পণ্যের ওপর থেকে অতিরিক্ত শুল্ক প্রত্যাহার করেননি।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার তিন সপ্তাহের মধ্যেই ট্রাম্প কানাডা এবং মেক্সিকোর পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। বাণিজ্যিক কারণ ছাড়াও তাঁর অভিযোগ ছিল এই দুই দেশ থেকে আমেরিকায় বেআইনি অনুপ্রবেশ এবং ড্রাগ পাচার চলছে। দুটি দেশ আমেরিকার সরকারের সঙ্গে এই বিষয়গুলো নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চালিয়ে গেলেও শুল্ক প্রত্যাহৃত হয়নি। আমেরিকার বিখ্যাত ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ৩ মার্চ, ২০২৫ সংখ্যায় এ বিষয়ে
মন্তব্য করেছে যে ‘কানাডা এবং মেক্সিকো আমেরিকার শুধু প্রতিবেশীই নয়, দুটি বড়ো বাণিজ্য সহযোগী দেশ। তাদের সঙ্গে আমেরিকার ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টও আছে। আর ট্রাম্প যেভাবে কোনোরকম বিচার বিবেচনা না করে এই দুটি দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করে চলেছেন তাতে এই দুটি
দেশের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
ইতিমধ্যেই এই দুটি দেশ আমেরিকার পণ্যের ওপর পালটা শুল্ক আরোপ করে দিয়েছে। আরও যে দুটি দেশ তাদের নিরাপত্তার জন্য অনেকটাই আমেরিকার
ওপর নির্ভর করে, যারাও ট্রাম্পের শুল্ক জেহাদের শিকার হয়েছে তারা হলো তাইওয়ান এবং জাপান। গত ২ এপ্রিল ট্রাম্প সেমিকন্ডাক্টার পণ্য বাদ দিয়ে বাকি সব তাইওয়ানীয় পণ্যের ওপর ৩২ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন। আর এ নিয়ে তাইওয়ানের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তীব্র টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়েছে। ট্রাম্প জাপানের গাড়ি এবং গাড়ির যন্ত্রাংশের ওপর ২৫ শতাংশ এবং অন্যান্য পণ্যের ওপর ২৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার পর জাপানের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। যেহেতু জাপানের অর্থনীতি মূলত একটি রপ্তানি নির্ভর অর্থনীতি তাই ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত জাপানকে সাংঘাতিকভাবে প্রভাবিত
করতে পারে। বহু আলোচনার পর ট্রাম্প জাপানের পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করেছেন। বিনিময়ে জাপানকে আমেরিকার কৃষি পণ্যের জন্য তার বাজার খুলে দিতে হয়েছে। ভারত বা চীন তাদের প্রতিরক্ষা বা নিরাপত্তার জন্য আমেরিকার মুখাপেক্ষী নয়। ভারত রাজনৈতিকভাবে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ হলেও চীনের উত্থান এবং ঠাণ্ডা যুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী। অনেক আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিদ চীনের সঙ্গে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সম্পর্ককে সীমিত ঠাণ্ডা যুদ্ধ বলে চিহ্নিত করছেন। চীনের পণ্যের ওপর ট্রাম্প প্রাথমিকভাবে প্রায় ১৪৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন। পালটা চীনও আমেরিকার পণ্যের ওপর ১২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল। অনেক আলোচনার পর আমেরিকা এবং চীন এই শুল্ক যথাক্রমে ৩০
শতাংশ এবং ১০ শতাংশতে নামিয়ে আনে। দুই দেশ এখনো আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ ট্রাম্পের এই শুল্ক যুদ্ধ থেকে আমেরিকার বন্ধু থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো দেশই রেহাই পায়নি।
ভারতীয় পণ্যের ওপর ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত দু’দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলেছে ঠিকই কিন্তু এটা অস্বীকার করা যাবে না যে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র হলো ভারতের সর্ববৃহৎ বাণিজ্য সহযোগী। ২০২১-২২ থেকেই চীনকে সরিয়ে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র হলো ভারতের বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার দেশে পরিণত হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ভারতের রপ্তানি ছিল ৮৬.৫১ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৭৭.৫২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বাণিজ্য বৃদ্ধির হার ছিল ১১.৬ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে আমদানি ছিল ৪৫.৩৩ বিলিয়ন ডলার যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৪২.২ বিলিয়ন ডলার। বৃদ্ধির হার ৭.৪৪ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত-আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মোট বাণিজ্য দাঁড়িয়েছে ১৩১.৮৪ বিলিয়ন ডলার। আর এই বাণিজ্যে ভারতের উদ্বৃত্ত থাকে ৪১.১৮ বিলিয়ন ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারতের পক্ষে উদ্বৃত্ত ছিল ৩৫.৩২ বিলিয়ন ডলার। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী ২০১৩-১৪ থেকে ২০১৭-১৮ এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে চীন ছিল ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার।
চীনের আগে সংযুক্ত আরব আমির শাহী ছিল ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। ২০২১-২২ সাল থেকে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র চীনকে সরিয়ে ভারতের
বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারে পরিণত হয়েছে। ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৫ + অতিরিক্ত ২৫ অর্থাৎ ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত ভারত-আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সম্পর্ককে প্রভাবিত করবে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে ধৈর্য এবং সাবধানতার সঙ্গে। ভারত ঠিক সেই কাজটাই করছে। আবেগ বা ক্রোধের বশবর্তী হয়ে কোনোরূপ চরম সিদ্ধান্ত নিলে তা জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি করবে দীর্ঘস্থায়ীভাবে। ভারত-আমেরিকা
সাম্প্রতিক শুল্ক সমস্যা সম্পর্কে এক অপরিপক্ক নেতার নেতৃত্বে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস এবং বেশ কিছু বিরোধী দল যে সুরে ভারত সরকারের বিশেষত ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সমালোচনা করছে, কিংবা বলা ভালো বিদ্বেষমূলক প্রচার চালাচ্ছে তাতে সন্দেহ হয় এরা কি চাইছে যে ভারত এমন কিছু ব্যবস্থা নিয়ে নিক যাতে দু’দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে আর ভারতের জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয়! এতে আমেরিকার ডিপ স্টেট খুশি হবে
সন্দেহ নেই। ভারতে কিছু লোকও কি তাতে খুশি হবে? রাজনৈতিক ক্ষমতা এ দেশের কিছু মানুষের কাছে জাতীয় স্বার্থের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ভারত এর আগেও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সম্পর্কিত বিধিনিষেধের মুখোমুখি হয়েছে এবং সাহসের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ
থেকে জারি করা সেই আর্থিক অবরোধের মোকাবিলাও করেছে। ১৯৯৮ সালের মে মাসে অটলবিহারী বাজপেয়ীর প্রধানমন্ত্রিত্বকালে পরমাণু শক্তি পরীক্ষা
করার এক সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ভারত সরকার। ১৯৭৪ সালে রাজস্থানের পোখরানে প্রথম পরমাণু পরীক্ষা চালানোর পর সেই পোখরানেই এটি ছিল দ্বিতীয় পরমাণু পরীক্ষা, যে কারণে একে ‘পোখরান টু’ বলা হয়। এর কোড নাম ছিল ‘অপারেশন শক্তি’। এটি ছিল পরমাণু ক্ষমতা প্রদর্শনের লক্ষ্যে ভারতের একটি অত্যন্ত বলিষ্ঠ পদক্ষেপ কারণ এর দু’বছর আগে ১৯৯৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সাধারণ সভা সার্বিক পরমাণু পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তির (কম্প্রিহেনসিভ নিউক্লিয়ার টেস্ট ব্যান ট্রিটি বা সিটিবিটি) প্রস্তাব পাশ করে যার প্রধান লক্ষ্য ছিল পরমাণু পরীক্ষা সার্বিকভাবে নিষিদ্ধ করা। এর প্রধান উদ্যোক্তা ছিল পরমাণু শক্তিধর দেশগুলো, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ভারত এই চুক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল কারণ এই চুক্তি ছিল নিতান্তই একপেশে এবং পরমাণু শক্তিধর দেশগুলির প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট। পরমাণু পরীক্ষা করলে সিটিবিটি অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞা বিধি আরোপিত হতে পারে এই ঝুঁকি নিয়েও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী পরমাণু শক্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ভারত এই পরমাণু পরীক্ষা করার পরই আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্য কয়েকটি পশ্চিমি দেশ ভারতের ওপর অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ১৯৯৪ সালের ‘আর্মস এক্সপোর্ট কন্ট্রোল অ্যাক্ট’-এর প্লেন অ্যামেন্ডমেন্ট (Glenn Amendment) অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা জারি করে, যেমন মানবিক সহায়তা বাদ দিয়ে সমস্ত ধরনের বৈদেশিক সাহায্য বন্ধ করে দেওয়া, সমস্ত ধরনের যুদ্ধাস্ত্র বিক্রি বন্ধ করা, সমস্ত ধরনের সামরিক সহায়তা বন্ধ করা, আমেরিকার
সরকারি এজেন্সিগুলি দ্বারা ঋণ বা ঋণের গ্যারান্টি দেওয়া বন্ধ করা, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে ভারতকে যেকোনো ধরনের ঋণ দেওয়ার প্রস্তাবের
বিরোধিতা করা, আমেরিকার ব্যাংকগুলোকে ভারতকে ঋণ প্রদান না করতে নির্দেশ দেওয়া, সামরিক কিংবা অসামরিক পরমাণু ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে পারে এমন দ্রব্য এবং প্রযুক্তির রপ্তানি নিষিদ্ধ করা প্রভৃতি। বোঝাই যাচ্ছে ‘পোখরান টু’-এর পর ভারতকে নিয়ন্ত্রণে আনতে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এবং আরও
কিছু পশ্চিমি দেশ কী মারাত্মক সব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। অন্য যেকোনো দেশ হলে এই নিষেধাজ্ঞার সামনে নতজানু হয়ে যেত। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী
অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে মাথা উঁচু করে এই রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইলিং-এর মোকাবিলা করে ভারত। এবং অন্তিমে জিত হয়েছিল ভারতেরই।

















