শ্রদ্ধাঞ্জলি
আজিকার নবীন প্রজন্ম ঠিক করিয়া জানে না ভারতের স্বাধীনতা কোন পাথে আসিয়াছে? এই কথা সত্য যে তাহাদের জানানো হয় নাই। অহিংস অথবা সহিংস পথে তাহা লইয়া অনেক বিতর্ক থাকিলেও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এটলি স্বয়ং স্বীকার করিয়াছেন যে অহিংস আন্দোলনের ভয়ে ভীত হইয়া তাহারা ভারতবর্ষ ত্যাগ করেন নাই। তাহারা ভারতবর্ষ পরিত্যাগ করিয়াছেন দেশ জুড়িয়া বৈপ্লবিক আন্দোলন বিশেষ করিয়া নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজের ভয়ে ভীত হইয়া। অর্থাৎ সশস্ত্র বৈপ্লবিক আন্দোলনই ভারতের স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করিয়াছে, ইহাই ঐতিহাসিক সত্য। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসক এই বৈপ্লবিক কার্যকলাপ স্তব্ধ করিবার জন্য কতই না দমনপীড়ন, অত্যাচার, অবিচার করিয়াছে। তবু বিপ্লবীদিগের স্বাধীনতার স্পৃহা নষ্ট করিতে পারে নাই। তাঁহাদিগের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করিয়া কত যে স্বদেশভক্ত কবি ও গীতিকার কবিতা ও সংগীত রচনা করিয়াছেন, তাহার ইয়ত্তা নাই। তাঁহারা সবাই মহান। কিন্তু ভারতবর্ষের স্বাধীনতাযুদ্ধে অগ্রগণ্য বিপ্লবী মহানায়ক রাসবিহারী বসুকেই বলিতে হইবে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের বক্ষে কম্পন সৃষ্টি করিবার জন্য ব্রিটিশ-ভারতের গভর্নর তথা ভাইসরয় হার্ডিঞ্জের উপর বোমা নিক্ষেপের নেতৃত্বদানকারী যোদ্ধা তিনিই। তিনি অভূতপূর্ব কুশলী সংগঠক। ভারতের অর্ধাংশ জুড়িয়া তিনি বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের জাল বিস্তার করিয়াছিলেন। ব্রিটিশ পুলিশকে বোকা বানাইতে ছদ্মবেশ ধারণে তিনি ছিলেন কিংবদন্তী। বৃহত্তর সংগ্রামের প্রস্তুতির নিমিত্ত ১৯১৫ সালে তিনি ব্রিটিশ শাসনের নজর এড়াইয়া জাপান চলিয়া যান এবং ব্রিটিশ ভারতীয় যুদ্ধবন্দিদের লইয়া তিনি সিঙ্গাপুরে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করেন। পরবর্তীকালে তিনি সেই বাহিনীর অধিনায়ক তথা স্বাধীনতাযুদ্ধের নেতৃত্বভার তুলিয়া দেন সুভাষচন্দ্র বসুর হস্তে। তিনিই দেশগৌরব সুভাষচন্দ্র বসুকে নেতাজী অভিধায় ভূষিত করিয়াছেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের সেনাপতি পদে বরণ করিবার জন্য তিনি ভারতবর্ষ হইতে সুভাষচন্দ্র বসুকে আহ্বান করিয়া লইয়া গিয়াছিলেন। তাঁহারই তৎপরতায় জাপানি কর্তৃপক্ষ ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতি সক্রিয় সমর্থন জানাইয়াছিল। ইহা ব্যতীত, ভারতের স্বাধীনতাযুদ্ধে প্রবাসী ভারতীয়দের সমর্থনের নিমিত্ত তিনি ‘ভারত মৈত্রী সমিতি’ গঠন করিয়াছিলেন। সবচাইতে বড়ো কথা হইল, দীর্ঘ চল্লিশ বৎসর ধরিয়া তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের ব্যতিব্যস্ত করিয়া রাখিয়াছিলেন। তাঁহার স্বদেশপ্রেমে অভিভূত হইয়া জাপান সরকার ১৯৪৩ সালে তাঁহাকে জাপানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মানসূচক উপাধি ‘সেকেন্ড অর্ডার অব দ্য মেরিট অব দ্য রাইজিং সান’-এ ভূষিত করিয়াছে।
ঐতিহাসিক সত্য হইল, কোটি কোটি ভারতবাসীর অন্তঃকরণে স্বাধীনতার স্বপ্ন জাগ্রত করিয়াছিলেন তিনিই। তিনি স্বয়ং বলিয়াছেন, তিনি একজন
আজন্ম যোদ্ধা। শুধু তাঁহার একটি যুদ্ধ বাকি রহিয়াছে। আর সেই যুদ্ধই হইবে তাঁহার জীবনের অন্তিম যুদ্ধ। ইতিহাস সাক্ষী, নিশ্চিতভাবেই তাঁহারই বিপ্লবী-শিষ্য নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজের লড়াই ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির অন্তিম লড়াই। ইহা অতীব দুঃখের যে, এহেন আজন্ম যোদ্ধার প্রেরণাদায়ী জীবন তথা কর্মকাণ্ডের বিষয়ে বর্তমান প্রজন্মকে অবহিত করানো হয় নাই। ১৯৬৭ সালে ভারত সরকার তাঁহার স্মৃতি রক্ষার্থে শুধুমাত্র একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করিয়াই দায় সারিয়াছে। তাঁহার প্রেরণাদায়ী জীবন লইয়া পাঠ্যপুস্তকে কোনোরূপ অধ্যায় অথবা তেমন কোনো চলচ্চিত্রও নির্মিত হয় নাই। ১৯৫৭ সালে স্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু জাপান সফরে আসিয়া এই মহান বিপ্লবীর পরিবারের সহিত সাক্ষাৎও করেন নাই। কিন্তু ১৯২৪ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাপান প্রবাসে আসিয়া তাঁহার এবং তাঁহার পরিবারের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া তাঁহাকে উৎসাহিত করিয়াছিলেন। রাসবিহারী বসুর ধর্মপত্নী তোশিকো সোমার সম্পর্কেও ভারতবাসী বিশেষ অবগত নহে। একজন ভিনদেশীয় দেশপ্রেমিকের আজন্ম লালিত স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করিবার জন্য এক বিদেশিনী নারীর জীবন উৎসর্গের মহান ইতিহাস কতজনই-বা জানে। ইদানীং নবীন প্রজন্মের অন্তঃকরণে দেশপ্রেমের যে জোয়ার লক্ষ্য করা যাইতেছে, তাহা প্লাবনে পরিণত হইতে পারে ভারতের মহান দেশপ্রেমিক বিপ্লবীদিগের প্রেরণাদায়ী জীবনগাথার বহুল প্রচারে। ইহা অবশ্যই রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের মিলিত প্রচেষ্টায় হইতে পারে। স্বস্তিকা পত্রিকার বর্তমান সংখ্যা মহাবিপ্লবী রাসবিহারী বসুর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রকাশের এক ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র।

















