ভারতে শক্তিসাধনার ইতিহাস
ড. অনিমেষ চক্রবর্তী
(দ্বিতীয় পর্ব)
গৌড়ীয় তন্ত্র, কাশ্মীরি তন্ত্র, কেরলীয় তন্ত্র- তিন তন্ত্রেই দেবীপূজা সম্পর্কে খুব কম পার্থক্য আছে।
গৌড়ীয় তন্ত্র-এঁরা গুরু, দেবতা ও মন্ত্রের ঐক্য ভাবনা করেন। দেবতা ও গুরুমন্ত্রের চৈতন্যকে তেজপুঞ্জনিভ ভাববেন। সেখানে আয়ুধহাতে দেবী মহামায়া বিরাজ করছেন। দেবী সর্বরূপা। এভাবে সাধক দেবীকে পূজা করেন ও দেবীকৃপা লাভ করেন। এই পূজায় সর্বার্থসিদ্ধি সঙ্কল্প করে (আবাহন, স্বাগতম)
পুষ্পার্পণ করার পর নৈবেদ্য নিবেদন করতে হয়। তারপর হোম, তাম্বুল নিবেদন ও বলিদান। এঁরা বাম হাতে পূজা আর ডান হাতে তর্পণ করেন এবং মুখ্য পঞ্চ-মকার গ্রহণ করেন, তারপর নিজ হৃদয়ে দেবীর বিসর্জন করেন। বঙ্গের কালীকুলের শক্তিসাধকরা সাধারণত অদ্বৈতবাদী।
দক্ষিণ ভারতীয় তন্ত্র বা কেরালা তন্ত্র-এখানে তিন সম্প্রদায়, তাদের প্রতিটির আবার তিনটি ভাগ। শিব, শক্তি, শিবশক্তি এইরকম প্রত্যেক ভাগের শুদ্ধ, উগ্র ও গুপ্ত তিনটি করে ভাগ। ইষ্টদেবতা অনুসারে এরকম ভাগ। দ্রাবিড়ীয় বা দক্ষিণদেশীয় তন্ত্রসাধনায় শ্রীবিদ্যারূপী ত্রিপুরসুন্দরী বা ষোড়শী কামেশ্বরীই পূজিতা। দ্রাবিড়ীয় তন্ত্রে শিব স্বীকৃত এবং ত্রিপুরসুন্দরীর সঙ্গে অবিনাভাবে সম্পৃক্ত। এই তামিলীয় শৈবদর্শন স্বীকার করে যে, শিবের পঞ্চমুখের প্রতিটি থেকে পাঁচটি আগমের সৃষ্টি। ওই মোট আঠাশটি আগম থেকেই শিবজ্ঞান শাস্ত্রগুলির বিকাশ হয়েছে। এখানে সিদ্ধ শৈবসম্প্রদায়, বীরশৈব সম্প্রদায় প্রভৃতি আছে। আচার্য বসব প্রতিষ্ঠিত বীরশৈব সম্প্রদায়ই লিঙ্গায়েৎ সম্প্রদায় বলে পরিচিত। দ্রাবিড়ীয় তন্ত্রসাধনার উপাস্যদেবী ত্রিপুরসুন্দরী বা ললিতা বা ষোড়শী। বিভিন্নভাবে এই দেবী ত্রিপুরসুন্দরীর সাধনার কথা আছে।
কাশ্মীরি তন্ত্র-কাশ্মীরি তন্ত্রে পীঠার্চনার পর বলিদান করতে হয় আর পঞ্চোপচারে পুজার পর করতে হয় হোম। এঁরা পঞ্চ ম-কারের পরিবর্ত হিসেবে অনুকল্প ব্যবহার করেন। সাধক নিজের বাম উরুর উপরে রক্তচন্দন দিয়ে শক্তি ত্রিকোণ এঁকে তাতে শক্তিবীজ লিখে, পূজা করে শতবার শক্তি গায়ত্রী জপ করবেন। স্বয়ম্ভূকুসুমের অভাবে রক্তচন্দন দিয়ে অর্ঘ্য দিবেন। কাশ্মীরি সম্প্রদায়ের সাধকেরা স্বীয় সহস্রারে দেবতার বিসর্জন করবেন।
মন্ত্র দেবতা ও গুরুর ঐক্য ভাবনা করে অক্ষরের স্বরূপকে তেজপুঞ্জের মতো কল্পনা করবেন। ইষ্টসিদ্ধিপ্রত মন্ত্র জপ এবং চৈতন্যত্রিতয় অর্থাৎ গুরুমন্ত্র দেবতার অক্ষরে অবস্থান ভাবনা করবেন। তন্ত্রে সাধারণত সাত রকমের আচারের উল্লেখ আছে-বেদাচার, বৈষ্ণবাচার, শৈবচার, দক্ষিণাচার, বামাচার, সিদ্ধান্তচার ও কৌলাচার। এছাড়াও সময়াচার আছে। কুলাণর্ব তন্ত্রে ও সর্বোল্লাসতন্ত্রে, গৌড়বঙ্গের অন্যান্য তন্ত্রে এর উল্লেখ আছে।
মহামায়া মহাদেবীর আনন্দরূপ। নানা বর্ণ ও আকারের নানা সাধনার দ্বারা প্রাপ্ত এইসব রূপের বর্ণনা করা অতি দুরূহ। সদাশিব দেবীকে বলেছেন-তুমি সর্বশক্তিস্বরূপা, সর্বদেবময়ী তনু। তুমি স্কুল, সূক্ষ্ম, ব্যক্ত অব্যক্তরূপিনী। তুমি নিরাকারা, তুমি সাকারা।
দশমহাবিদ্যা সম্পর্কে একটি লোকরঞ্জক কাহিনি সাধারণ জনসমাজে প্রচলিত আছে। মহাভাগবত পুরাণের অষ্টম অধ্যায়ে যে আবির্ভাব কাহিনি পাওয়া যায়, তাতে সতী পিতা দক্ষের যজ্ঞে যাবার জন্য শিবের অনুমতি প্রার্থনা করেন। এদিকে দক্ষ সকল দেব দেবীকেই আমন্ত্রণ করেছেন একমাত্র শিব ও সতী ছাড়া। খুব স্বাভাবিকভাবেই শিব সতীকে বারণ করেন।
কিন্তু সতী যাবার জন্য জিদ করতে থাকেন। তখন শিব তাঁকে বলেন-দক্ষকন্যে, আমি জানি তুমি আমার কথার বাধ্য নও, আমার আজ্ঞার প্রতীক্ষা কীসের, তোমার যা ইচ্ছে করো।
এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে দেবী ভাবেন, আমাকে পত্নীরূপে লাভ করে শিব আমার স্বরূপ বিস্মৃত হয়েছেন। অতএব নিজলীলায় সকলকে ত্যাগ করে স্ব-স্বরূপে অবস্থান করব। এই ভেবে দেবী মহামায়া অতি ভয়ংকরী কালীমূর্তি ধারণ করলেন। দিগম্বরী আলুলায়িতকুন্তলা মুণ্ডমালিনী লোলজিহ্বা কৃষ্ণাঞ্জন সমপ্রভা সেই মূর্তি দেখে শিব ভয়ে পালাতে চাইলেন এবং দিক লক্ষ্য করে ছুটতে শুরু করেন। তখন দেবী ক্ষণমধ্যে দশমূর্তি ধারণ করে দশদিকে অবস্থান করেন। শিব সবদিকে ভয়ংকরী মূর্তি দেখে চোখ বন্ধ করেন এবং চোখ খুলে আবার কালীমূর্তি দর্শন করেন। শিব জিজ্ঞাসা করেন, কে তুমি শ্যামা, আমার সতী কোথায়? মহাদেবী বললেন আমিই সতী, সৃষ্টিসংহারকারিণী সূক্ষ্মা প্রকৃতি। তোমার বনিতা হবার জন্য গৌরবর্ণা হয়েছিলাম। দশদিকের দশ মহাভয়ংকরী দশমূর্তি সকল আমারাই মূর্তি।
চামুণ্ডাতন্ত্র অনুসারে মহাবিদ্যা কালী, তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলা, মাতঙ্গী ও কমলা, এই দশমহাবিদ্যাকে সিদ্ধবিদ্যা বলা হয়। বিভিন্ন দেবতার আবির্ভাব কাল বিভিন্ন সময়। কালীর আবির্ভাবকাল মহারাত্রি, তারার আবির্ভাবকাল ক্রোধরাত্রি, ষোড়শীর দিব্যরাত্রি, ভুবনেশ্বরীর সিদ্ধরাত্রি, ছিন্নমস্তার বীররাত্রি, ভৈরবীর কালরাত্রি, ধূমাবতীর দারুণরাত্রি, বগলামুখীর বীররাত্রি, মাতঙ্গীর মোহরাত্রি এবং কমলার মহারাত্রি।
একই রকমভাবে দেবীদের নামের সঙ্গে বিদ্যার সম্পর্কও বিভিন্ন রকম। যেমন কালী মহাবিদ্যা, তারা শ্রীবিদ্যা, ষোড়শী বা ত্রিপুরসুন্দরী সিদ্ধবিদ্যা, ভুবনেশ্বরী বা রাজরাজেশ্বরী সিদ্ধবিদ্যা, ছিন্নমস্তা বিদ্যা, ভৈরবী বা ত্রিপুরভৈরবী সিদ্ধবিদ্যা, ধূমাবতী বা অলক্ষ্মীবিদ্যা, বগলামুখী বা বল্ল্গামুখ সিদ্ধবিদ্যা, মাতঙ্গী বিদ্যা, কমলা বা লক্ষ্মী বিদ্যা।
দেবীদের সাধনসঙ্গী শিবের নামেও পার্থক্য আছে। দেবী কালীর শিব মহাকাল, দেবী তারার শিব অক্ষোভ্য, দেবী ষোড়শী বা ত্রিপুরসুন্দরীর শিব ত্র্যম্বক, দেবী ছিন্নমস্তার শিব কবন্ধ, দেবী ভৈরবী বা ত্রিপুরভৈরবী শিব দক্ষিণামূর্তি কালভৈরব, দেবী বগলামুখী বা বঙ্গামুখীর শিব একবস্ত্রশিব, দেবী মাতঙ্গীর শিব মতঙ্গ, দেবী কমলার শিব সদাশিব বিষ্ণু।
তিথি-নক্ষত্রের বিচারে আবার বিভিন্ন রাত্রিকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়। দারুণরাত্রি, দিব্যরাত্রি, বীররাত্রি, মহারাত্রি, ক্রোধরাত্রি, ঘোররাত্রি, তারারাত্রি, সিদ্ধরাত্রি, মোহরাত্রি, কালরাত্রি। কালরাত্রি কালী ও তারার প্রিয়করী।
এই সকল দেবী সদাসর্বদা ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ এই চতুর্বর্গ প্রদান করেন। ত্রিভুবনে এইসব দেবীর মতো আর নেই। একবার মাত্র দশমহাবিদ্যার উচ্চারণে জীব সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হয়। দশমহাবিদ্যার উচ্চারণে স্মরণ ও মননের দ্বারা মানুষের ভবপাপ মুক্ত হয়ে যায়।
মহাকাল ও মহাকালীই হলেন শিব ও শক্তি। বিভিন্ন দেবতার ধ্যান, ধারণা, পূজা, আচার যন্ত্র, মন্ত্র প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন, তবে সকল কিছু ভিন্নতার মধ্যেও একতা বা অদ্বৈত বা শাক্তদ্বৈতের ভাব নিহিত থাকে। এই শক্তি বিশিষ্ট অদ্বৈতত্ত্বে একমাত্র অহংতারই প্রকাশ থাকে, আবার অহংরূপ অহন্তা থেকে ইদম্ বা ইনস্তার আবির্ভাব হয় এবং শাক্তদর্শন এই তত্ত্বের উপরই প্রতিষ্ঠিত।
কালকে গ্রাস করেন বলে তিনি কালী। সৃষ্টিকালে সমগ্র বিশ্বের তিনি আদিরূপিনী এবং সংহারকালে সমগ্র বিশ্ব তিনি কলন করেন। ব্রহ্মহ্মাদি সকল দেবতা কালিকা থেকেই উৎপন্ন আবার কালীতেই লয়প্রাপ্ত হয়। মহাকালসংহিতা বচনের, কপুরাদিস্তোত্রে বলা হয়েছে কালী ব্রহ্ম। ব্রহ্মবিদ্যা কালিকা নির্গুণাচিৎস্বরূপিনী, তিনি অমিতাকার শক্তিস্বরূপা, অচিন্তনীয়া। তিনি প্রত্যেক ব্যক্তির একমাত্র অধিষ্ঠান, গুণাতীতা, দেবীপরব্রহ্মরূপে প্রতিষ্ঠিতা।
বঙ্গেদেশের তন্ত্রে আদ্যাশক্তি কালীই প্রধান দেবী। শক্তিসঙ্গমতন্ত্র অনুসারে, হাদিমতে মহাশক্তিকে কেরালায় কালী, কাশ্মীরে ত্রিপুরা এবং গৌড়ে তারা বলা হয়। অন্যদিকে কাদিমতে কেরালায় দেবীকে ত্রিপুরা, কাশ্মীরে তারিণী এবং গৌড়ে কালী বলা হয়। নির্বাণতন্ত্রে বলা হয়েছে দক্ষিণ দিকে যমের অবস্থান, কালী নামে ভীত হয়ে সে দিভ্রান্ত হয়ে ছোটে। তাই দেবী দক্ষিণাকালী।
শক্তিপূজা বৈদিককালেও প্রচলিত ছিল। ঋগ্বেদের দেবীসূক্ত ও রাত্রিসূক্ত এবং সামবেদের রাত্রিসূক্ত থেকে বোঝা যায় বৈদিককালে শক্তিসাধনা বর্ধিত হয়েছিল। দেবী ভুবনেশ্বরীর মন্ত্র ঋগ্বেদে আছে। ঋগ্বেদে বিশ্বদুর্গা, সিন্ধুদুর্গা, অগ্নিদুর্গা এবং আরও নানা দেবীর উল্লেখ আছে।
ব্রহ্ম ও তৎশক্তি অভেদ-এই শাক্ত সিদ্ধান্তটি সামবেদীয় কেনোপনিষদের উপাখ্যান থেকে জানা যায়। সৃষ্টি যখন ছিল না, তখনও মহাশক্তি কালী ছিলেন। মহাকালীর এই রূপ তত্ত্বপূর্ণ। মুণ্ডমালার নরমুণ্ড মাতৃকাবর্ণ অ, আ, ইত্যাদি স্বরবর্ণ থেকে ক, খ, গ, ঘ পঞ্চাশটি ব্যঞ্জনবর্ণ। এইসব মাতৃকাবর্ণই চৈতন্যময়
শব্দব্রহ্ম।
দেবী কালিকার জিহ্বা বহির্ভাগে প্রসারিত। জিহ্বা বর্ণোচ্চারণের যন্ত্র। এই জিহ্বাই বৈখরী নাদ বা বর্ণ। তিনি বর্ণে বর্ণে নাম ধরেন। বিশ্বরূপিনী জননীর বর্ণ প্রতীক জিহ্বা বাইরের দিকে প্রসারিত-বৈখরী। সকল বৈখরীবর্ণ (স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ) মহাশক্তি কালীর রূপ। দেবী কালিকার গলায় মুণ্ডমালা আসলে বর্ণমালা এবং তা থেকে রুধির বিগলিত। এই রুধির ধারা আসলে অমৃতধারা। মহাকালের বুকে মরণকে জয় করে লীলা করেন দেবী। লীলা অর্থে সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়রূপ
কর্ম। তন্ত্রমতে নিত্যেরই লীলা বলে নিত্য ও লীলা দুটিই সত্য। তাই তন্ত্রমতে কালী ব্রহ্মা এবং ব্রহ্মাই কালী। (আমি কালী ব্রহ্ম জেনে ধর্মাধর্ম সব ছেড়েছি- রামপ্রসাদ সেন)।
মানুষের ভাব সাধারণত দিব্য, বীর ও পশু-এই তিনভাগে বিভক্ত। সাধকের নিজস্বভাব অনুযায়ী তন্ত্রসাধনায় বিভিন্ন প্রকার আচার অনুষ্ঠান ও পদ্ধতিরীতির কল্পনা করা হয়।
কালী কুণ্ডলিনীর স্বরূপ। কুণ্ডলীশক্তি ইচ্ছা, জ্ঞান ও ক্রিয়ারূপে প্রকাশিতা। এই তিনটি শক্তি তেজোদীপ্ত। আধারপদ্মবাসিনী কালী কুণ্ডলিনী যখন চৈতন্য বিচ্ছুরিত শক্তিরূপে প্রকাশ পায়, তখনই তা কামেশ্বরী বা কামকলা বা পরানাদ শ্রীবিদ্যা। কলা বিচ্ছুরিত সচঞ্চলা প্রকৃতি বা কারণ, আর অবিচ্ছুরিত স্বরূপাস্থিত শক্তি বিন্দু মহাকারণ। তাই প্রকৃত অর্থে কুল অর্থে কালী, সুতরাং কুলকুণ্ডলীকৃতা শক্তিই স্বরূপে আদ্যাশক্তি কালী।
দেবী কালিকা দিগম্বরী ও মুক্তকেশী। তিন মায়াতীত এই মায়াই সূক্ষ্ম আবরণ। দেবী পূর্ণ ব্রহ্মময়ী। দেবী চন্দ্র, সূর্য, অগ্নি (ইরা, পিঙ্গলা, সুষুম্না) এই তিন নিত্য নয়নের দ্বারা ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান নিত্য নিয়মিত প্রত্যক্ষ করেন। দেবী চতুর্ভুজা-দেবী কালিকা চতুর্ভুজা। ডানদিকের উপরের হাতে অভয়মুদ্রা, নীচের হাতে বরমুদ্রা। বামদিকের উপরের হাতে খঙ্গ ও নীচের হাতে সদ্যচ্ছিন্ন নরমুণ্ড। দেবী চতুর্ভুজ কারণ, প্রতিটি ভুজের মাঝের অংশ নব্বই ডিগ্রি, এভাবে চতুর্ভুজ তিনশত ষাট ডিগ্রিতে একটি বৃত্ত সম্পূর্ণ। এই বৃত্ত পূর্ণরূপ। দেবী পূর্ণরূপা। দেবী পূর্ণব্রহ্ম।
বর্ণময়ী দেবী সরস্বতী সকল ভাব ও বর্ণের স্রষ্টা। এই বর্ণ থেকে সিদ্ধবীজমন্ত্রের সৃষ্টি হয়। সৃষ্টি থেকে হয় বোধ, জ্ঞান, ক্রিয়া (স্ত্রী, ক্রী, শ্রী, ঐ, ক্লী)। তন্ত্রে মন্ত্রসমূহ শব্দব্রহ্মেরই বাহ্যরূপ, তা আবার আ-কার উ-কার, ম-কার, কলা, বিন্দু, নাদ, শক্তি, শান্ত-এই আটটি মাত্রাভেদে বিন্যস্ত।
শব্দব্রহ্মাদেবী ওঙ্কার ও শব্দব্রহ্মারূপিনী কুণ্ডলিনী থেকে শক্তির বিকাশ হয়। শক্তি থেকে ধ্বনি, ধ্বনি থেকে নাদ, নাদ থেকে নিরোধিকা, নিরোধিকা থেকে অর্ধেন্দু, অর্ধেন্দু থেকে পরা, পশ্যন্তী, মধ্যমা প্রভৃতি বাক্ বা ধ্বনির বিকাশ হয়।
মহাশক্তি শিবরূপী শববক্ষস্থিতা দক্ষিণাকালী শিবের তথা মহাকালের উপর উপবিষ্টা, মহাকালের নীচে সদাশিব শায়িত। সদাশিব কুটস্থ ব্রহ্মচৈতন্যের প্রতীক। মহাকাল সৃষ্টি উন্মুখী সগুণ ব্রহ্ম। মহাকালের রূপান্তরই মহাকালী।
দেবী কালিকা পীনোন্নত পয়োধরা-দেবী স্তন্যদায়িনী মাতৃরূপা। তাঁর অগ্নেই প্রতিপালিত এই জগৎ। মহাকালী বিপরীতরতাতুরা-শিব ও শক্তি-ব্রহ্ম ও মায়া, অগ্নি আর তার দাহিকাশক্তি, যেমন উভয়েই এক ও অভিন্ন, নির্গুণা কালী যখন সগুণা হন তখনই তিনি হন বিপরীতরতা। বৌদ্ধতন্ত্র অনুসারে মূলাধার থেকে সহস্রার পর্যন্ত যে বিপরীত সাধন, সেই সাধনের মূল প্রকৃতিই দেবী তাই তিনি বিপরীতরতা।
দেবী কালিকা শ্মশানবাসিনী-সুষুম্না নাড়ীকে বলা হয় শ্মশান। মহামায়া যিনি যোনিরূপা, এই যোনি ও চিতা উভয়ই শ্মশান। দেবী কালিকাকে যোনিরূপ শবশয্যা বলা হয়েছে। ভয়ংকরী শিবাপরিবৃতা মদ্যপান প্রমত্তা দেবী শিবাপরিবৃতা। শিব প্রকৃতি মঙ্গলস্বভাব অপঞ্চীকৃত মহাভূত আর সত্ত্বগুণের প্রতীক শ্বেতবর্ণ অস্থিকঙ্কাল। সকল জীবের সত্ত্বাদিগুণগুলি শ্মশানে বিরাজ করছে।
দেবী মদ্যপান প্রমত্তা। দুই অর্থে এইভাব। প্রথমত, দেবী ব্রহ্মানন্দে বিভোর। এই আনন্দ মদ্য বই কী; কারণ যা আনন্দিত করে তাই মদ্য। আবার অন্যদিকে শ্রীশ্রীচণ্ডীতে দেখা যায়, দেবী মহিষাসুরকে বধ করার আগে পর পর দিব্য সুরাপান করতে লাগলেন এবং তাতে আরক্তনয়না হয়ে অট্টহাসি করলেন।
দেবী দক্ষিণকালিকা ছাড়াও আছেন-দেবী গুহ্যকালী, দেবী শ্মশানকালী, দেবী সিদ্ধকালী, দেবী ভদ্রাকালী, দেবী মহাকালী, দেবী রক্ষাকালী, দেবী চামুণ্ডাকালী প্রভৃতি। তাঁদের প্রত্যেকের ভেতর কিছু কিছু ভিন্নতা থাকলেও মূল জায়গাটি এক।
দেবী মহামায়াই এই জগতের চালিকাশক্তি। তিনিই জীবের পরমগতি। তাঁর কথা বলে শেষ করা যায় না। তিনিই পরা প্রকৃতি, তিনিই দেশমাতৃকা, ভারতমাতা তিনিই, তিনিই সাক্ষাৎ ব্রহ্ম পরমাত্মা। তাঁকে জানলেই সমগ্র জগৎকে জানা হয়।
দেবী তারা-দেবী তারার প্রধান তিনটি রূপ। একজটা, নীলসরস্বতী ও উগ্রতারা। তিনটি নামভেদ হলেও স্বরূপত তিনি এক ও অদ্বিতীয়া। মহাযান বৌদ্ধমতে দেবী তারা অবলোকিতেশ্বরের শক্তি। তিনি বৌদ্ধ দেবীদের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্যা। মনে করা হয় খ্রিস্ট্রীয় ষষ্ঠ শতকে দেবী তারা মহাযানী দেবমণ্ডলে অন্তর্ভুক্ত হন এবং খ্রিস্ট্রীয় অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে দেবী তারা জনপ্রিয় দেবী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
পরবর্তীকালে দেবী তারার একুশ রকমের রূপভেদ লক্ষ্য করা যায়। মহাযানী বৌদ্ধরা তারা দেবীকে ধ্যানী বুদ্ধের শক্তি এবং বুদ্ধ ও বোধিসত্ত্বগণের জননী ও সৃষ্টিকারণ বলে গ্রহণ করেছেন। ধ্যানীবুদ্ধ পাঁচজন, যথা-সিত, শ্যাম, লোহিত, নীল ও পীত। এই পাঁচ বর্ণের তারা মূর্তি দেখতে পাওয়া যায়।
দেবী তারা সাধককে ভোগ, মোক্ষ, যশ ও শ্রী দান করেন। সদা সর্বদা তিনি সাধককে ত্রাণ করেন। দেবী তারার সর্বসিদ্ধিপ্রদ বিভিন্ন রকমের মন্ত্র আছে। এই সকল মন্ত্র বিজ্ঞানমাত্র সাধক জীবন্মুক্ত হয় ও সর্বশাস্ত্রে পাণ্ডিত্য লাভ করে। ধনে জনে পরিপূর্ণ হয়। রাজা তাঁর পক্ষে থাকেন। দেবী তারা বাশক্তি প্রদান করেন বলে তাঁকে নীলসরস্বতী বলা হয়। তিনি সাধককে পরিত্রাণ করেন ও মোক্ষ প্রদান করেন বলে তারা এবং উগ্র আপদ বিপদ থেকে রক্ষা করেন বলে
উগ্রতারা নামে কথিত হন।
নীলতন্ত্র ও মহাফেৎকারিণী তন্ত্র অনুসারে, একলিঙ্গ শিবালয়ে, শ্মশানে, শূন্যগৃহে, চতুষ্পথ স্থানে, যুদ্ধস্থানে, মুণ্ডাসনে, শবাসনে, আকণ্ঠ জলে, যোনিতে ও বিজনবনস্থলে বসে সাধক ত্রিভুবনেশ্বরী তারা দেবীর মন্ত্র সাধন করবে। সাধক শুদ্ধবুদ্ধি হয়ে এসকল স্থানে নীলসরস্বতীর মহামন্ত্র জপ করলে সর্বশাস্ত্রবেত্তা ও পরকালে নির্বাণ পদ লাভ করে।
সিততারা-সিততারা সাধারণত ত্রিনয়নী। দেবী পবিত্রতার প্রতিমূর্তি। সিততারার সপ্তনয়না মূর্তিও দেখা যায়। সিততারারই এক তান্ত্রিকরূপ জাঙ্গুলী তারা। জাঙ্গুলী তারা চতুর্ভুজা। দেবী দুহাতে বীণা বাদনরতা। দেবীর এক হাতে অভয়মুদ্রা এবং অপর হাতে একটি সাদা সাপ। জাপানে সাদা সাপের মূর্তিতে দেবী সরস্বতীর পূজা হয়। তাঁর হাতে বীণা। জাঙ্গুলীতারা আর সরস্বতী একই দেবী। জাঙ্গুলীতারা শ্যামবর্ণা ও পীতবর্ণা দুই রকমের হয়। শ্যামবর্ণা দেবী চতুর্ভুজা, পীতবর্ণা দেবী ষড়ভুজা।
পীততারা-দেবী পীততারা চতুর্ভুজা। দেবী তারার উগ্ররূপ। শ্যামাতারা-দেবী শ্যামাতারা আদ্যাশক্তি। পদ্মের উপর বসে আছেন। তিনিই অবলোকিতেশ্বরের শক্তি।
নীলতারা-পীততারা যখন ষড়ভুজা হন তখনই তিনি নীলতারা। খদিরবনিতারা-তারা মুর্তিগুলির মধ্যে খদিরবনিতারা, বজ্রতারা, ভূকুটিতারা প্রভৃতি বঙ্গদেশে পাওয়া গেছে। খদিরবনিতারা পীততারার একটি বিশেষ রূপ।
বজ্রতারা-দেবী বজ্রতারার আট হাত, চার মাথা। প্রতিটি মাথায় তৃতীয় নেত্র আছে।
একজটা বা উগ্রতারা-দেবীর দুই রূপ। একরূপে দেবী দ্বিভুজা, এক হাতে খঙ্গ, আরেক হাতে নরকপাল। দেবী শ্যামাতারার সহকারিণী। অন্য আর এক রূপে দেবী চতুর্ভুজা থেকে অষ্টাদশভুজা, বিংশতিভুজা পর্যন্ত। দেবী প্রত্যালীঢ়পাদা। লোলজিহ্বা, ভীষণ দ্রংষ্টা, অট্টহাসিনী, রক্তচক্ষু, ত্রিয়না নৃমুণ্ডমালিনী।
পর্ণশবরী-দেবীর পরনে পর্ণ। দেবী শবরদের ভগবতী। দেবীর তিনটি মাথা, সিত, পীত, লোহিত। দেবী তারারই তিনি অনুচরী।
ফেৎকারিণীতন্ত্রে বলা হয়েছে তারাদেবী প্রত্যালীঢ় অবস্থানে শবরূপী শিবের হৃদয়োপরি পদদ্বয় সমর্পণ করে দণ্ডায়মানা এবং অতিভয়ঙ্কর ও উচ্চৈঃস্বরে হাসওমানা। চারহাতে খঙ্গ, নীলোৎপল, কতৃকা ও খর্পর ধারণ করে আছেন। দেবী হুঙ্কারবীজ থেকে উদ্ভুতা, খর্বাকৃতি ও নীলবর্ণা। দেবীর মাথায় অনেক বড়ো পিঙ্গলবর্ণ একটি জটা ও একটি সাপ আছে। দেবী ত্রিজগতের সকল রকম জড়তা বিনাশ করেন।
মা তারা মা নীল সরস্বতী যিনি প্রণতজনদের সৌভাগ্য সম্পদ প্রদান করেন। সকল অবস্থায় তিনি সকলের আশ্রয়। সকল অবস্থায় কারণে অকারণে ভক্তগণ তাঁকেই আশ্রয় করেন।

















