ভারতীয় জনসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আজাদ গভীরে। বাইরে থেকে তা সাধারণের হিন্দ সরকার প্রতিষ্ঠার দিনটিকেই বেছে নিয়েছিলেন ড. শ্যামাপ্রসাদ
ডাঃ মধুসূদন পাল
ইদানীং কমিউনিস্টরা তাদের ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থে সামাজিক মাধ্যমে যখন তখন নানারকম মিথ্যা গল্প প্রচার করে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় তারা তাদের দলীয় স্বার্থ চরিতার্থ করে থাকে। যেমন, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মিটিং ভাঙার জন্য সুভাষচন্দ্র বসু নাকি গুন্ডা পাঠিয়েছিলেন। গুন্ডারা মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল শ্যামাপ্রসাদের। অথচ শ্যামাপ্রসাদ নিজে কোথাও এই কাহিনির উল্লেখ করেননি। কমিউনিস্টরা চিরকাল শ্যামাপ্রসাদ বিরোধী। যদিও শ্যামাপ্রসাদের পশ্চিমবঙ্গ প্রস্তাবের পক্ষে তারা ভোট দিয়েছিল। পূর্ববঙ্গে থাকতে না পেরে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে কমিউনিস্ট নেতৃত্বের একটা বড়ো অংশ পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে এসেছিল উদ্বাস্তু হয়ে। পরে ক্ষমতার লোভে মুসলমান ভোটব্যাংকের স্বার্থে কমিউনিস্টরা ভারতকেশরী ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে ‘সাম্প্রদায়িক’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁকে কলঙ্কিত করার সবরকম চেষ্টা করেছে। এখনও তা অব্যাহত। এপার-ওপার দু’পারের মুসলমানদের দুঃখ হলো- পুরো বঙ্গপ্রদেশ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত না হওয়া। তাদের অতৃপ্ত ইচ্ছায় ইন্ধন জোগাতে কমিউনিস্টরা শ্যামাপ্রসাদের বিরুদ্ধে অনেক মিথ্যা প্রচার করেছে, এখনও করছে। মুসলিম লিগের বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। তিনি বলেছিলেন, ‘তোমরা ভারত ভাগ করে পাকিস্তান তৈরি করেছ, আর আমি পাকিস্তান ভাগ করে পশ্চিমবঙ্গ তৈরি করেছি।’
সবকিছু বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, শ্যামাপ্রসাদের মাথা ফাটিয়ে দেওয়ার কাহিনি নিছক গল্পই। এই গল্পটির উল্লেখ রয়েছে, সম্ভবত কোনো কমিউনিস্ট নেতার লেখায়। সেটাই ওরা বারবার উল্লেখ করে। এটা এক ধরনের চালাকি। কারণ কোনো বিশেষ একজনের বলা কাহিনি যতক্ষণ না বিভিন্ন সূত্র দ্বারা প্রমাণিত হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তা ইতিহাসের অংশ হতে পারে না। ‘সুভাষচন্দ্র-শ্যামাপ্রসাদ সংঘাত’-এর আখ্যান বামপন্থীদের অপপ্রচার ছাড়া আর কিছু নয়।
সুভাষচন্দ্র প্রথমে কংগ্রেস, পরে নিজের তৈরি ফরওয়ার্ড ব্লকের নেতা ছিলেন। ড. শ্যামাপ্রসাদ ছিলেন হিন্দু মহাসভার নেতৃত্বে। স্বভাবতই দুই ভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের মধ্যে কিছু বিরোধী মানুষ থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সুভাষচন্দ্র-শ্যামাপ্রসাদের সংঘাতের গল্প একদমই বামপন্থীদের মস্তিষ্কপ্রসূত। সুভাষচন্দ্র গুন্ডা পাঠিয়ে শ্যামাপ্রসাদকে মারতে চেয়েছেন এটা নির্জলা মিথ্যা। শ্যামাপ্রসাদকে নিয়ে কমিউনিস্টদের মিথ্যা কাহিনি তৈরির এটা অন্যতম উদাহরণ মাত্র।
সুভাষচন্দ্র-শ্যামাপ্রসাদ সখ্য অনেক বোধগম্যতার বাইরে। কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করলেই তা স্পষ্ট হবে। ড. শ্যামাপ্রসাদ ছিলেন কলিকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’বারের উপাচার্য (১৯৩৪-৩৮)। কুযুক্তির ধারক-বাহকরা বলতেই পারে, তিনি ব্রিটিশের চাকরি করেছেন, সুতরাং তিনি ব্রিটিশের
দালাল। তাহলে বলতে হয়, শ্যামাপ্রসাদের পিতা তথা বাঙ্গলার বাঘ স্যার আশুতোষও ব্রিটিশের দালাল। কারণ, তিনিও ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। একই যুক্তিতে সাহিত্যসম্রাট ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, বিজ্ঞানাচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু, আচার্য মেঘনাদ সাহা প্রমুখ সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী ও বিশিষ্টজন হলেন ব্রিটিশের দালাল। অথচ, এদের দেশপ্রেমের তুলনা হয় না। ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম্’ সংগীত যেভাবে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে প্রেরণা দিয়েছে এবং বর্তমানেও দেশভক্তদের অনুপ্রাণিত করছে, তার দ্বিতীয় উদাহরণ নেই। স্যার আশুতোষ ও ড. শ্যামাপ্রসাদ- পিতা-পুত্র ব্রিটিশের অধীনস্থ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়ে যে জাতীয়তাবাদী শিক্ষাক্রম এবং পরাধীন দেশে উচ্চতর বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণা প্রসারের জন্য সায়েন্স কলেজ চালু করেছিলেন ব্রিটিশের সঙ্গে রীতিমতো লড়াই করে, তাও স্বাধীনতা সংগ্রামের একটা স্তর। শুধু রাজনৈতিক সংগ্রামই স্বাধীনতা যুদ্ধের
একমাত্র স্তর হতে পারে না।
দেশের বিজ্ঞানীরা বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণার যে পথ দেখিয়েছেন, সেটাও জাতির মুক্তি সংগ্রামের একটা বড়ো অধ্যায়। শুধু তাই নয়, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, আচার্য মেঘনাদ সাহা, বিজ্ঞানাচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু- এঁরা গোপনে বিপ্লবীদের সাহায্য করেছেন দিনের পর দিন।
ড. শ্যামাপ্রসাদের বিচরণ উচ্চশিক্ষার অঙ্গনে। প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে তাঁর যোগদান পরিবেশ পরিস্থিতির চাপে। ১৯৩৫-এর পর থেকেই বঙ্গপ্রদেশে মুসলিম লিগের বাড়বাড়ন্ত। ১৯৩৭ থেকে লিগের রাজনৈতিক ক্ষমতার অলিন্দে প্রবেশ। বঙ্গপ্রদেশের হিন্দুদের জীবন, মানসম্মান দুর্বিষহ করে তোলে তারা। হিন্দুদের হয়ে কথা বলার কোনো রাজনৈতিক দল তখন ছিল না। সমগ্র বঙ্গপ্রদেশেই তখন মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ (৫৪ শতাংশ)। সর্বভারতীয় রাজনীতিতে তখন সুভাষচন্দ্র বিরাজমান। কিন্তু তার পক্ষেও প্রকাশ্যে হিন্দুদের পক্ষে কথা বলার হয়তো কিছু সমস্যা ছিল সর্বভারতীয় রাজনীতির বাধ্যবাধকতায়। কারণ, সুভাষচন্দ্রের রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রধান শত্রু ইংরেজ। সেখানে হিন্দুদের পক্ষ নিয়ে মুসলিম লিগের বিরুদ্ধে বা হিন্দুবিদ্বেষী মুসলমানদের বিরুদ্ধে কিছু বলার অর্থ যুদ্ধের (যুদ্ধ অর্থাৎ ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রাম) মধ্যে আর একটা যুদ্ধের ফ্রন্ট তৈরি করে দেওয়া। তিনি একইসঙ্গে দুটো ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে চাননি।
সুভাষচন্দ্র চেষ্টা করেছিলেন, যাতে মুসলিম লিগ বঙ্গপ্রদেশে ক্ষমতায় না আসতে পারে। কৃষক প্রজা পার্টির ফজলুল হক এবং কংগ্রেসের শরৎচন্দ্র বসু ও সুভাষচন্দ্র বসু যৌথভাবে চেয়েছিলেন বঙ্গপ্রদেশে কংগ্রেস-কৃষক প্রজা পার্টির যুক্তফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠা হোক। এতে সাম্প্রদায়িক মুসলিম লিগকে ক্ষমতার বাইরে রাখা যেত। কিন্তু গান্ধী ও তার গোষ্ঠীর প্রবল বিরোধিতায় তা ব্যর্থ হয়। ফজলুল হক বাধ্য হন মুসলিম লিগকে সঙ্গে নিয়ে বঙ্গের মসনদে বসতে।
ভারতবর্ষে এইভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতার স্বাদ পায় মুসলিম লিগ। গান্ধী সুকৌশলে বঙ্গপ্রদেশের কংগ্রেসকে তিন ভাগে ভাগ করে রেখেছিলেন যারা সবসময় দলাদলি করত নিজেদের মধ্যে। গান্ধীর উদ্দেশ্যই ছিল, এই দলাদলি থাকলে ভারতবর্ষের বৃহত্তম প্রাদেশিক কংগ্রেস কখনও গান্ধীকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না। এতে তার সিংহাসন থাকবে অটুট। বঙ্গের ক্ষমতা থেকে মুসলিম লিগকে দূরে রাখতে একদিকে সুভাষচন্দ্র, অন্যদিকে ফজলুল হকের চেষ্টা ব্যর্থ হয় কিছু
সুযোগসন্ধানী নেতৃত্বের বিশ্বাসঘাতকতায়। এই প্রেক্ষিতেই শ্যামাপ্রসাদের রাজনীতিতে প্রবেশ। গান্ধীর পরোক্ষ মদতে বঙ্গপ্রদেশের মাটিতে মুসলিম লিগের উত্থান না হলে রাজনীতিতে শ্যামাপ্রসাদের প্রবেশ হয়তো ঘটতই না। এই বক্তব্যের সমর্থনে দু’টি ঐতিহাসিক তথ্য উপস্থাপন করা যেতে পারে।
(১) জিন্না ছিলেন মুসলিম লিগ বিরোধী। তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ কংগ্রেস কর্মী। গান্ধী-নেহরুদের বার বার অপমানে তিনি বাধ্য হন কংগ্রেস ত্যাগ করতে, আর সেই অপমানের বদলা নিতেই তার মুসলিম লিগে যোগদান। বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষিতে ১৯০৫ সালে তৈরি হলেও, সমগ্র দেশে মুসলিম লিগের বাড়বাড়ন্ত শুরু হয় এই দলে জিন্নার যোগদানের পর। অর্থাৎ পরোক্ষে গান্ধীর জন্যই মুসলিম লিগের ক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রসার ঘটে।
(২) ১৯৩৭-এ অসমে (অসম, মেঘালয়, মণিপুর, নাগাল্যান্ড ও মিজোরামের সম্মিলিত রূপ) মুসলিম লিগ সরকার গঠিত হয়। নাম- সাদুল্লা সরকার। এখানেও মুসলিম লিগের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। তারা নির্দল এমএলএ-দের নিয়ে সরকার গঠন করে। কোনো কংগ্রেস নেতা সেখানে লিগ সরকার পতনের উদ্যোগ নেয়নি। ১৯৩৮-এ কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট হয়ে সুভাষচন্দ্র তৎকালীন অসমের রাজধানী শিলঙে কয়েকদিন ছিলেন। সমস্ত নির্দল এমএলএদের ডেকে সাদুল্লা সরকার থেকে তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করিয়ে প্রাদেশিক কংগ্রেস নেতা গোপীনাথ বড়দোলইকে প্রধানমন্ত্রী করে তিনি ফিরে আসেন। এরপর মুসলিম লিগ আর কখনও ক্ষমতায় আসেনি অসমে। বিভাজনের পরে উত্তর-পূর্ব ভারত যে এখনও ভারতের অন্তর্ভুক্ত তার একমাত্র কারিগর সুভাষচন্দ্র। তাঁর দুঃখ ছিল, তিনি বঙ্গপ্রদেশের ক্ষমতা থেকে মুসলিম লিগকে দূরে রাখতে পারেননি। পরবর্তীকালে তাঁর সেই ইচ্ছাপূরণের চেষ্টা করেছেন শ্যামাপ্রসাদ ও ফজলুল হকের একত্রীকরণ, অর্থাৎ শ্যামা-হক মন্ত্রীসভা তৈরির মধ্য দিয়ে। এই সরকার তৈরি হয়, মুসলিম লিগকে বাদ দিয়ে। অবশ্য এই সরকারের আয়ু ছিল সামান্যই (১১.১২.১৯৪১-২০.১১.১৯৪২)। এই সরকারকে সমর্থন জানান সুভাষচন্দ্রের অনুগামীরা এবং তাঁর মেজদাদা শরৎচন্দ্র বসু। ব্রিটিশ সরকার শরৎচন্দ্র বসুকে গ্রেপ্তার করে পাঠিয়ে দেয় দক্ষিণ ভারত। মুসলিম লিগকে ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে দূরে সরিয়ে বঙ্গপ্রদেশে সরকার গঠন ছিল সুভাষচন্দ্রের মত ও পথ অনুযায়ী চলা একটি প্রক্রিয়া। সুভাষচন্দ্র নির্দেশিত পথেই হেঁটেছেন শ্যামাপ্রসাদ। এই বক্তব্যের সমর্থনেও রয়েছে একাধিক উদাহরণ। নভেম্বর ১৯৪৫, দিল্লির লালকেল্লায় আজাদ হিন্দ ফৌজের বিচার শুরু করে ব্রিটিশ সরকার। এর বিরুদ্ধে সমগ্র ভারতবর্ষের যুবক ও ছাত্ররা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তাঁরা আন্দোলনে শামিল হয়ে প্রতিবাদ জানায়। এরপরেই শুরু হয়ে যায় ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬-এ নৌবিদ্রোহ। ‘The Sunday Amrita Bazar Patrika’-র ২৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৬-এর হেডলাইন ছিল এইরকম- ‘MILITARY POLICE RULE IN BOMBAY, RECURRENCE OF TROUBLES, Firing & More Firings
: 250 killed and 1300 injured’। অর্থাৎ ব্রিটিশ সেনা ও পুলিশের গুলিতে বোম্বেতে ২৫০ জন নিহত এবং ১৩০০ জন আহত। ‘Hindusthan Standard’-এর Calcutta edition-এ ১৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৬-এর সংবাদ- ’45 killed in po- lice firing in Calcutta.’
এর ঠিক দু’সপ্তাহ আগে কলকাতায় লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমে পালন করেছে ২৩ জানুয়ারি নেতাজীর জন্মদিন। কলকাতার চৌরঙ্গীতে দু’মাইল লম্বা শোভাযাত্রা হয়েছে, ‘I.N.A. Volunteers formed an impres- sive part of the two-mile long pro- cession taken out on Wednesday in celebrations of Netaji Subhas Bose’s birthday in Calcutta.’
যখন ভারতবর্ষ জুড়ে আন্দোলনের এই প্রেক্ষাপট, তখন নৌবিদ্রোহ ও ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিক্ষোভে কলকাতা উত্তাল। এজাতীয় ঘটনা ইংরেজদের
পৌনে দু’শো বছরের শাসনকালে কখনও দেখা যায়নি। এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে নেতৃস্থানীয় কেউ ছিলেন না। ছাত্র-যুব ও জনগণের এই সম্মিলিত প্রতিবাদ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক নেতারা এই জন-আন্দোলনে যোগ দিতে ভয় পাচ্ছিলেন। একটাই কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়ী ব্রিটিশরাজের ভয়ংকর রোষানল।
নভেম্বর ১৯৪৫-এ কলকাতায় পালিত হয় আজাদ হিন্দ ফৌজ দিবস। এটা ছিল আন্দোলনের প্রথম পর্যায়। তখন শরৎচন্দ্র বসু জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন। ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে কিছু ছাত্র নিহত হয় ব্রিটিশ পুলিশ ও সেনার গুলিতে। বিভিন্ন কারণে শরৎচন্দ্র বসুও যোগ দিতে পারেননি ওই আন্দোলনে। সেই সময় ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছাত্রদের এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসেন। পরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন গুরুতরভাবে।
পূর্ব পাকিস্তান ভেঙে পশ্চিমবঙ্গ তৈরির প্রেক্ষাপটে একমাত্র শরৎচন্দ্র বসু ছাড়া সমস্ত গণ্যমান্য সুভাষ অনুরাগীরা ছিলেন শ্যামাপ্রসাদের সমর্থক। যেমন, মেজর জেনারেল ডাঃ এসি চট্টোপাধ্যায় (প্রাক্তন আইএনএ সেনানী), সুভাষচন্দ্রের ‘bosom friend’ (অভিন্ন-হৃদয় বন্ধু) অধ্যাপক হেমন্ত সরকার, নেতাজীর বড়দা সতীশচন্দ্র বসু। এছাড়াও শ্যামাপ্রসাদের সমর্থনে ছিলেন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক অধ্যাপক রমেশচন্দ্র মজুমদার ও অধ্যাপক যদুনাথ সরকার,
বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা ও বিজ্ঞানী শিশির মিত্র। সুভাষচন্দ্র অনুগামী সমস্ত কংগ্রেসি এবং ফরওয়ার্ড ব্লকের মানুষজন সমর্থন করেন শ্যামাপ্রসাদকে।
কংগ্রেসের সদস্য না হয়েও গান্ধীর অনুরোধে দু’জন ব্যক্তি নেহরু মন্ত্রীসভায় যোগ দেন। একজন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, অন্যজন ড. বি.আর.
আম্বেদকর। দু’জনেই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে মহীয়ান। কংগ্রেসের মধ্যে এঁদের সমকক্ষ আর কেউ ছিলেন না। দু’জনেই পরবর্তীকালে নেহরু মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেন, তার ভ্রান্ত নীতির প্রতিবাদ জানিয়ে।
নেহরু মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করে শ্যামাপ্রসাদ তৈরি করেন নতুন দল ‘ভারতীয় জনসঙ্ঘ’। দিনটি ছিল ২১ অক্টোবর, ১৯৫১। এই দিনটি কিন্তু কোনোভাবেই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ফল নয়। ৮ বছর আগে, ১৯৪৩-এ সুদূর সিঙ্গাপুরের মাটিতেই ২১ অক্টোবর নেতাজী সুভাষচন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন আজাদ হিন্দ সরকার। নেতাজীরও এই দিনটি হঠাৎ নির্ধারিত ছিল না। তা ছিল অনেক চিন্তাভাবনার ফলশ্রুতি। ১৯৪৩ সালের ২১ অক্টোবর দিনটি ছিল শনিবার। শুক্রবার সিঙ্গাপুরের রামকৃষ্ণ মিশনে মধ্যরাত্রিতে প্রবেশ করে সারারাত্রি আরাধ্যাদেবী মা কালীর পায়ের কাছে বসে একান্তে সাধনা করে ২১ অক্টোবর আজাদ হিন্দ সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র। এই দিনটি প্রকৃতপক্ষে নেতাজীর গভীর আধ্যাত্মিক সাধনার ফসল। ইতিহাসের এই পথ ধরেই শ্যামাপ্রসাদ অগ্রসর হন জনসঙ্ঘ তৈরির কাজে। সুভাষচন্দ্রের ভারত থেকে গোপনে বাইরে গিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনা করার জন্য প্রথম পছন্দের জায়গা ছিল জাপান; ইউরোপ নয়। তাঁর জাপানে যাওয়ার পথ প্রশস্ত করতে ভারতবর্ষের ভিতর থেকে গোপনে সাহায্য করেছিলেন বিপ্লবী বিনায়ক দামোদর সাভারকর এবং জাপান থেকে বিপ্লবী মহানায়ক রাসবিহারী বসু। আরও যাঁরা ছিলেন তাঁদের নাম ক্রমশ প্রকাশ্যে আসছে।
ইতিহাস ভুলে গেলেষণ বিশ্লেও ভুল হবে। বিপ্লবী সাভারকর ছিলেন হিন্দু মহাসভার সর্বভারতীয় নেতৃত্ব। অন্যদিকে বিপ্লবী মহানায়ক রাসবিহারী ছিলেন জাপান
হিন্দু মহাসভার সভাপতি। আর ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন বঙ্গপ্রদেশের হিন্দু মহাসভার সভাপতি। আশা করা যায়, ইতিহাসের অদৃশ্য পৃষ্ঠাগুলো একদিন যুক্তিসঙ্গত চিন্তায় ধরা পড়বেই। সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলি হয়তো অনেকে জানেন না, কিংবা জেনেও না জানার অভিনয় করেন। কারণ, এই ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদের দ্বন্দ্ব, সংঘাত নিয়ে গল্প তৈরি এবং তার প্রচার মার খাবে।

















