ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস
বামপন্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ, কয়েকটি প্রসঙ্গ
ড. চন্দ্রশেখর মণ্ডল
একদিন যারা স্লোগান তুলেছিল, ‘হাত মে বিড়ি, মু মে পান। লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান।’ অখণ্ড ভারত ভাবনাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেছিল মুসলমানদের জন্য আলাদা দেশ পাকিস্তান চাই। আমদানি করেছিল ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’। চিৎকার করে বলেছিল- ‘মুসলমানরা শুধু ধর্মে আলাদা নয়, জাতিতেও আলাদা।’ কী আশ্চর্য, ভারত ভাগ হওয়ার পরে সেই জেহাদিদের সমর্থক একদল লোক প্রচার করতে শুরু করলো- ‘এক জাতি এক প্রাণ, হিন্দু মুসলমান।’ এরা ভারতের বামপন্থী। দ্বিচারিতা ও মিথ্যাচার যাদের ‘রাজনৈতিক আদর্শ’।
কমিউনিস্টরা বরাবর আলাদা দেশ পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির পর তারা থেকে গেল ভারতে। বাকিরা পূর্ব পাকিস্তান থেকে মুসলমানদের অত্যাচারে বিতাড়িত হয়ে ঢুকে পড়ল এদেশে। মুসলিম লিগের এইসব সহযোগীদের অন্তত একটি ‘কমিউনিস্ট পার্টি অব পাকিস্তান’ তৈরি হলো না। ‘কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া’ নাম নিয়ে এদেশে রাজনৈতিক কাজকর্ম চালালো। আদর্শগত দিক থেকে যা ‘মুসলিম লিগের বি টিম’। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে তাদের চরিত্রের পরিবর্তন ঘটেছে কি? ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি’র মুখোশে আর সবকিছু তারা প্রচার করলো। শুধু কৌশলে গোপন করে গেল আসল কথাটি। ততদিনই মার্কসবাদ, লেলিনবাদ, সমাজবাদ চলে, যতদিন হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। মুসলমানরা পঞ্চাশ শতাংশের বেশি হলে কী পরিস্থিতি হতে পারে আজকের বাংলাদেশ ও পাকিস্তান প্রমাণ করে ফেলেছে।
কমিউনিস্টরা দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস শুধু বিকৃত করেনি, উলটে দিয়েছে বহু ক্ষেত্রে। নেতাজীর জীবন নিয়ে সবচেয়ে বেশি মিথ্যাচার করেছে তারাই। তাঁর তৈরি ‘ফরওয়ার্ড’কে অর্থের জোরে হাইজ্যাক করেছে। সে অর্থের জোগানদার ছিল ইংল্যান্ডের লেবার পার্টি। নেতা স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এটলি। নেতাজীর ফরওয়ার্ড ব্লকের আদর্শ ছিল জাতীয়তাবোধ। হ্যাঁ জাতীয়তাবোধ, ভারতীয়ত্ব। আজকের কমিউনিস্ট ফরওয়ার্ড ব্লকের সঙ্গে যার আদর্শগত কোনো সম্পর্ক নেই। পতাকা ছিল নেতাজীর তৈরি। তিরঙ্গার উপরে লম্ফোদ্যত রয়েল বেঙ্গল টাইগার। ভাবনা ছিল ‘সুভাষবাদ’। সেটাই সম্পূর্ণ পালটে হয়ে গেল ‘মার্কসবাদ’। পতাকা হয়ে গেল লালের গায়ে বাঘের ছবি। সঙ্গে কাস্তে হাতুড়ি। তেরঙ্গা থেকে সরাসরি লাল! ভাবা যায়? নিজেদের লুকাতে এই কিছুদিন আগে বাঘ ছাপের লাল ঝান্ডা থেকে সরিয়ে নিয়েছে কাস্তে হাতুড়ি। সেই বামপন্থীরা তাদের মুখপত্রে ছবি ছাপিয়ে নেতাজীকে ‘তোজোর কুকুর’ বলবে তাতে আশ্চর্য কী!
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলো। আন্তর্জাতিকভাবে প্রচণ্ড চাপে ইংরেজ। বেশিরভাগ সেনা যুদ্ধে ব্যস্ত। প্রশাসনিকভাবে বেসামাল ব্রিটিশ সরকার। এটাই তো আদর্শ সময়। আন্দোলনে প্রতিবাদে প্রতিরোধে শাসককে নাজেহাল করে তোলার। ছিনিয়ে নেওয়া কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। গান্ধীজী ডাক দিলেন ‘করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে’, ‘ইংরেজ ভারত ছাড়ো’। ১৯৪২ সালের ৬ আগস্ট শুরু হলো ভারত ছাড়ো আন্দোলন। এই সময়ে ভারতের বামপন্থীদের ভূমিকা কী ছিল? নির্লজ্জরাও লজ্জা পাবে তাদের সেদিনের আচরণে। তারা ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল। একেবারে সরাসরি বিরোধিতা। কারণটা ছিল বড়ো অদ্ভুত। তারা ঘোষণা করেছিল অত্যাচারী ইংরেজ তাদের বন্ধু দেশ। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কমিউনিস্ট রাশিয়ার মিত্র দেশ ইংল্যান্ড। তখন তাদের (কু) যুক্তিতে ভারতের স্বাধীনতার চেয়ে কমিউনিস্ট দেশ রাশিয়ার স্বার্থরক্ষা বেশি জরুরি। অথচ এরাই দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন প্রসঙ্গে বড়ো বড়ো যুক্তি নামায়। বতেলা দেয়।
অন্যদের দেশপ্রেমের সার্টিফিকেট দেয়!
আলি জিন্না’রা আগেই বুঝেছিলেন কলকাতা বাদে পূর্ববঙ্গ ‘পোকায় কাটা’। তাই কলকাতা-সহ গোটা পশ্চিমবঙ্গকে পাকিস্তানে সংযুক্তির অভিসন্ধি চলে জোরকদমে। ১৬ আগস্ট, ১৯৪৬। হিন্দু বাঙ্গালির জীবনে অন্ধকারতম দিন। সুরাবর্দি তখন বঙ্গের প্রধানমন্ত্রী। কলকাতা পুরসভার চেয়ারম্যান করে দেওয়া হয়েছে মোল্লাবাদী সৈয়দ মহম্মদ ওসমানকে। লক্ষ্য ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’। লক্ষ্য হিন্দুশূন্য কলকাতা। লক্ষ্য কলকাতা-সহ গোটা বঙ্গপ্রদেশকে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তি। ময়দানের সমাবেশ ডাকলো মুসলিম লিগ। অংশগ্রহণকারীদের হাতে লাঠি, বর্শা, চপার, হাতুড়ি। উদ্দেশ্য লুঠ, হিন্দু হত্যা। সেদিন জড়াজড়ি করে অর্ধচাঁদ সবুজ পতাকার সঙ্গে বাঁধা হয়েছিল লাল ঝান্ডা। মুসলিম লিগের সুরাবর্দি, নাজিমুদ্দিন, জিন্নার সঙ্গে একই মঞ্চ থেকে হিন্দু হত্যার উসকানি দিয়েছিলেন কমিউনিস্ট নেতারা। ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম’-এর ঠিক আগের দিন বঙ্গের লিগ সরকার কমিউনিস্ট নেতা গণেশ ঘোষ, অনন্ত সিংহ, নলিনী দাস প্রমুখদের মুক্তি দিয়েছিল। কোনো কারণ ছাড়া এটা সম্ভব? এ ঘটনা নেহাত কাকতালীয় হতে পারে? একতরফা হিন্দু হত্যা লাগাতার চললো। ১৬ আগস্ট থেকে ১৮ আগস্ট। সতেরো হাজার হিন্দুকে হত্যা করা হলো। রাস্তা, নর্দমা, গঙ্গার পাড়, অলিগলি-সহ কলকাতার সর্বত্র স্তূপ হয়ে থাকলো হত্যা হওয়া হিন্দুদের মৃতদেহ। সৎকারহীনদের খুবলে খেতে লাগল শেয়াল-শকুন।
এসব নৃশংসতার দায় সযত্নে ঝেড়ে ফেলেছে এদেশের বামপন্থীরা। চীন-রাশিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা ইতিহাস আজকের পাঠ্য। সে ইতিহাসে আড়াল করা হয়েছে প্রকৃত বিপ্লবীদের আত্মত্যাগের কথা। নিজেদের স্বার্থ পূরণের ছাঁচে ফেলে বিকৃত করেছে ভারতবর্ষের পরম্পরা ও ঐতিহ্যকে। তাই নতুন করে ভারতের ইতিহাস রচনা সময়ের দাবি। অল্প পরিসরে হলেও শুরু হয়েছে সে উদ্যোগ। এতদিন ধরে শিল্প, সংস্কৃতি, সাহিত্যের একচ্ছত্র আধিপত্য থেকে মুক্ত হয়ে কিছু স্বাধীন স্বর শোনা যাচ্ছে। কিছু মুষ্টিবদ্ধ হাত আকাশের দিকে উত্থিত। ‘দ্য কেরালা স্টোরি’, ‘ছাওয়া’ ‘কাশ্মীর ফাইলস্’, ‘বেঙ্গল ফাইলস্’ প্রভৃতির মতো কিছু সিনেমা তৈরি হচ্ছে। যা অন্য চোখে ইতিহাস দেখার মুক্ত জানালা নিশ্চিত। বিচারের ভার বরং মানুষের উপর থাক। বন্ধ হোক অশালীন আক্রমণ। প্রতিবাদে আর একটা সিনেমা তৈরি হতে বাধা কোথায়? এতদিন ধরে ঘোর হয়ে থাকা ভুলের কুয়াশা কেটে প্রকাশিত সত্যের আলোকে পথ হাঁটবে গোটা দেশ। সেই প্রতিজ্ঞা সূর্য আজ উঁকি দিচ্ছে পুব আকাশে।

















