মহান বিপ্লবী রাসবিহারী
পিএন ঠাকুর থেকে বোস অফ নাকামুরায়া
প্রণব দত্ত মজুমদার
ইংরেজ পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পিএন ঠাকুরের ছদ্মবেশে জাপানে গিয়ে পৌঁছলেন রাসবিহারী বসু। মাথা গোঁজার একটি ঠাঁইও করে নিলেন। কিন্তু সমস্যায় পড়লেন ওখানকার ভাষা নিয়ে। ভারতীয়দের সন্ধানে তিনি টোকিয়ো শহরে ঘোরাঘুরি আরম্ভ করলেন। ঈশ্বরের কৃপায় ভগবান সিংহ গিয়ানি নামে একজন গদর বিপ্লবীর সন্ধান পেয়ে গেলেন। তিনিও ছদ্মবেশে জাপানে আছেন। ১৯১৩ সালে কানাডা থেকে বিতাড়িত হয়ে তিনি জাপানে এসেছেন। দুজনের
গভীর বন্ধুত্ব হয়ে গেল। তিনি রাসবিহারীকে জাপানে নির্বাসিত বিখ্যাত চৈনিক বিপ্লবীনেকতা সান-ইয়াত-সেনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি তখন ঔপনিবেশিকতা থেকে চীন তথা এশিয়ায় মুক্তিসংগ্রামে ব্রতী ছিলেন। সান-ইয়াত-সেনকে নতুন চীনের রূপকার বলা হয়। তাঁরই শিষ্য ছিলেন চিয়াং কাইশেক এবং মাও-সে-তুং। তাঁরা মাঝে মাঝেই হিবিয়া পার্কের মাতসুমতরো কাফেতে (Matsumotoro Cafe in Hibita Park) মিলিত হয়ে আন্তর্জাতিক
রাজনীতির গতিপ্রকৃতি এবং প্যান-এশিয়ান মুক্তি আন্দোলনের ব্যাপারে আলোচনা করতেন।
সান-ইয়াত-সেন রাসবিহারীর চিন্তাভাবনার দ্বারা খুবই প্রভাবিত হন। দুজনের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। তিনি রাসবিহারীকে আর এক বিখ্যাত জাতিয়তাবাদী জাপানি চিন্তাবিদ অধ্যাপক মিতসুরু তোয়ামার (Mitsuru Toyama) সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। অধ্যাপক তোয়ামাও ছিলেন প্যান-এশিয়ান
মুক্তি আন্দোলনের একজন প্রধান প্রবক্তা। জাপান তখন ব্রিটিশের মিত্রদেশ ছিল এবং ইংরেজশক্তিকে সমীহ করে চলত। অধ্যাপক তোয়ামা জাপানের এই ইংরেজ ভজনার তীব্র নিন্দা করতেন। তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে জাপানের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রবক্তাদের অন্যতম, ব্ল্যাক ড্রাগন
সোসাইটির সেক্রেটারি, জাপান সরকারের তৎকালীন ভূরাজনৈতিক অবস্থানের তীব্র সমালোচক এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি। ভারতীয় বিপ্লবী রাসবিহারীর সঙ্গে আলাপ আলোচনায় তিনি মুগ্ধ হন এবং অচিরেই প্যান-এশিয়ান মুক্তি আন্দোলনের ব্যাপারে রাসবিহারীকে তাঁর অনুগামী শিষ্য করে নেন। ইতিমধ্যে রাসবিহারীর সঙ্গে পরিচয় হয়ে যায় জাপানে আত্মগোপনকারী আর এক বাঙ্গালি বিপ্লবী হেরম্বলাল গুপ্তের সঙ্গে। তখন জাপানে অবস্থান করছিলেন পঞ্জাবের বিখ্যাত নেতা লালা লাজপত রায়। রাসবিহারীর সঙ্গে তাঁরও যোগাযোগ হয়ে গেল।
এইভাবে রাসবিহারী যখন জাপানে তাঁর পায়ের তলার মাটি ধীরে ধীরে শক্ত করছিলেন, সেই সময় একটি ঘটনায় তিনি এক ভয়ানক বিপদে পড়ে গেলেন। ব্যাপার হলো, ভারত ও জাপানের মধ্যে মৈত্রী স্থাপনের জন্য, জাপানের জনগণের কাছে ভারতের সভ্যতা সংস্কৃতির কথা তুলে ধরার জন্য এবং ইংরেজ
সরকার ভারতের উপর কীরকম শোষণ চালাচ্ছে তা জাপানের জনগণের কাছে তুলে ধরার জন্য ১৯১৫ সালের ২৭ নভেম্বর টোকিয়োতে একটি সভার আয়োজন করা হয়। এই সভার উদ্যোক্তা ছিলেন লালা লাজপত রায়, রাসবিহারী বসু, হেরম্বলাল গুপ্ত, জাপানের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এক নেতা ডাক্তার সুমেই ওহকাওয়া প্রমুখ। লালা লাজপত রায়ের ভাষণে উপস্থিত জাপানি শ্রোতারা খুবই অভিভূত হন। এই সভার খবর জাপানে অবস্থিত ইংরেজ দূতাবাসে পৌঁছে যায়। স্বভাবতই ইংরেজ দূতাবাসের কর্তারা খুব ক্ষেপে যান। তাঁরা জাপান সরকারের পররাষ্ট্র দপ্তরের উপর চাপ সৃষ্টি করেন যাতে এইসব ভারতীয় বিপ্লবীদের অনতিবিলম্বে জাপান থেকে বিতাড়িত করা হয়। জাপান তখন ছিল ব্রিটিশ শক্তির আজ্ঞাবহ। সুতরাং ২৮ নভেম্বরই এঁদের নোটিশ দিয়ে জাপান সরকার জানিয়ে দিল যেন এঁরা ৫ দিনের মধ্যেই অর্থাৎ ২ ডিসেম্বরের মধ্যে জাপান ত্যাগ করে চলে যান। লালা লাজপত রায় পরদিনই আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেন।
জাপানের জাতীয়তাবাদী কাগজগুলো এবং সচেতন জাতীয়তাবাদী ব্যক্তিরা জাপান সরকারের এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা আরম্ভ করলেন। ইংরেজ সরকার কেন জাপানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে জাপানের সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করার সাহস করবে? জাপানে কে থাকবেন বা থাকবেন না- সেটা কি ইংরেজ সরকার ঠিক করে দেবে? আর জাপান সরকারই-বা ইংরেজ সরকারের কাছে মাথা নীচু করে সবকিছু মেনে নেবে কেন? এইভাবে ওই কাজের জন্য নিপ্পনবাসীরা জাপান সরকারের তীব্র সমালোচনা করতে লাগলো। হেরম্বলাল গুপ্ত ও রাসবিহারী কী করবেন তা নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলেন। তাঁদের
কাছে এই নির্দেশ মৃত্যু পরোয়ানা ছাড়া আর কিছু না। কারণ ২ ডিসেম্বরের মধ্যে কোনো নিরপেক্ষ দেশে যাওয়ার মতো কোনো জাহাজ ছাড়ার দিন ছিল না, সব জাহাজই যাবে হংকং, সাংহাই, সিঙ্গাপুর বা ভ্যাঙ্কুবার হয়ে যা সবই ব্রিটিশ নজরদারি এলাকার মধ্যেই। কাজেই ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই ষোলো আনা এবং ধরা পড়লে হয় ফাঁসি নয়তো যাবজ্জীবন কারাবাস।
রাসবিহারী ও হেরম্বলাল অধ্যাপক তোয়ামার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছিলেন। অধ্যাপক তোয়ামা পরিস্থিতির উপর নজর রাখছিলেন এবং এই ভারতীয় বিপ্লবীদ্বয়কে বাঁচাবার জন গোপন পরিকল্পনা করছিলেন। এর মধ্যে ১ ডিসেম্বর জাপানের মেট্রোপলিটন পুলিশ ডিপার্টমেন্টের প্রধান একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করলেন যে এঁরা যদি ২ ডিসেম্বর সকাল ১০টার মধ্যে জাপান ত্যাগ না করেন তবে জাপান পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তার করে ব্রিটিশ সরকারের হাতে তুলে দেবে।
অধ্যাপক তোয়ামা ১ ডিসেম্বর সন্ধ্যাবেলা রাসবিহারী ও হেরম্বলালকে তাঁর বাড়িতে আমন্ত্রণ জানালেন। ওঁরা সন্ধ্যাবেলায় তাঁর বাড়ি গেলেন। জনা দুয়েক জাপানি পুলিশ তাঁদের অনুসরণ করলেন। ওঁরা বাইরে চটিজুতো খুলে অধ্যাপক তোয়ামার বাড়িতে প্রবেশ করলেন। পুলিশ দুজন তাঁদের চটিজুতোর উপর নজর রেখে গেটের বাইরে ঘোরাঘুরি করতে লাগলেন। অধ্যাপক তোয়ামা খুবই প্রভাবশালী একজন ব্যক্তি ছিলেন। জাপানে তাঁর অনেক অনুগামী ছিলেন। জাপানের রাজনৈতিক ও সরকারি মহলে অনেকেই তাঁকে খুব সমীহ করে চলতেন। পুলিশ তাঁর বাড়ির অভ্যন্তরে ঢুকতে সাহস করে না। তিনি ভারতীয় বিল্পবীদ্বয়ের জাপানে আত্মগোপন করে থাকার একটি ব্যবস্থা করেই রেখেছিলেন। রাসবিহারী ও হেরম্বলাল ছদ্মবেশ ধারণ করলেন। রাসবিহারী অধ্যাপক
তোয়ামার একটি কিমোনো ও টুপি পরলেন, হেরম্বলাল পরলেন একটি ওভারকোট। তারপর অধ্যাপক তোয়ামার একজন বিশ্বস্ত অনুগামীর সঙ্গে বাড়ির রান্নাঘরের পেছনের দরজা দিয়ে খালি পায়ে বেরিয়ে বাগানের মধ্য দিয়ে পাশের বাড়ির (যেটা ছিল অধ্যাপক তোয়ামার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও অনুগামী অধ্যাপক তেরাশুর বাড়ি) বাগানের মধ্য দিয়ে গিয়ে একটি সরু রাস্তা ধরে খানিকটা হেঁটে অন্য একটি বড়ো রাস্তায় উঠে পূর্বপরিকল্পনা মতো তাঁদের জন্য দাঁড় করানো একটি গাড়িতে গিয়ে উঠলেন।
গাড়িটি তাঁদের নিয়ে শিনজুকুর একডিট বিখ্যাত বেকারি নাকামুরায়ার (Nakamuraya) সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ওই বেকারির মালিক আইজু সোমা এবং তাঁর স্ত্রী কোকো সোমা অধ্যাপক তোয়ামার অনুগামী ছিলেন। তাঁরা এই ভারতীয় বিপ্লবী দুজনকে বিপদের ঝুঁকি নিয়ে লুকিয়ে রাখতে সম্মত হয়েছিলেন। তাঁরা বিপ্লবীদ্বয়কে তৎক্ষণাৎ বেকারির পিছনে একটি ছোট্ট কুঠুরিতে নিয়ে গিয়ে তুললেন। এক জাপানি দম্পতির অন্তরে এশিয়াবাসী তথা ভারতীয়দের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি কতটা আন্তরিকতা ও দরদ থাকলে নিজেদের জীবন বিপন্ন করে অচেনা অজানা ভিনদেশি দুই বিপ্লবীকে নিজেদের বাড়িতে লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন এবং নিজেদের জীবনকে অনিশ্চিত কঠিনসংগ্রামের মধ্যে নিয়ে ফেলতে রাজি হয়েছিলেন। এটা ভাবতেই অবাক লাগে এবং শ্রদ্ধায় মাথা নীচু হয়ে যায়। সব দেশেই সব সময়ই বোধ হয় এরকম কিছু মহৎ মানুষ জন্মান যাঁরা মানবজাতির কল্যাণের মধ্যেই যেন নিজেদের জীবনের সার্থকতা খুঁজে পান।
এদিকে জাপানি পুলিশ দুজন অনেক রাত পর্যন্ত ভারতীয় বিপ্লবীদের জুতোর উপর নজর রেখে দেখলেন কেউ তো বেরিয়ে এল না বরং অধ্যাপক তোয়ামার বাড়ির দরজা জানালা সব বন্ধ হয়ে গেল। আলো নিভিয়ে দেওয়া হলো। তাঁরা বুঝতে পারলেন বিপ্লবীরা পালিয়ে গেছেন। পরদিন থেকে জাপানি পুলিশ তৎপর হয়ে উঠলো; কিন্তু তাঁদের খুঁজে পাওয়া গেল না।
মিসেস কোকো সোমা অত্যন্ত বিপদের ঝুঁকি নিয়ে মাতৃস্নেহে ওদের দেখাশোনা করতেন। তিনি অল্পসল্প ইংরেজি জানতেন, তিনি রাসবিহারীকে গুরুত্বপূর্ণ খবরাখবর দিতেন। ওই ছোট্ট কুঠুরিতে আত্মগোপন করে থাকতে থাকতে হেরম্বলাল হাঁপিয়ে উঠলেন। অবশেষে একদিন সুযোগ বুঝে জানালা দিয়ে পালিয়ে গিয়ে উঠলেন এক জাপানি বন্ধুর বাড়ি। সোমা দম্পতি প্রমাদ গুনলেন। হেরম্বলাল ধরা পড়ে গেলে রাসবিহারীর আস্তানা পুলিশ জেনে গেলে সবাই বিপদে পড়ে যাবেন। তাঁরা দ্রুত অধ্যাপক তোয়ামাকে সব জানালেন। অধ্যাপক তোয়ামা খোঁজখবর লাগালেন। জানা গেল অধ্যাপক তোয়ামারাই পরিচিত ও অনুগামী ওহকাওয়ার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন হেরম্বলাল। ওহকাওয়া অধ্যাপক তোয়ামাকে কথা দিলেন সবরকম বিপদ থেকে জীবন দিয়ে হলেও তিনি হেরম্বলালকে রক্ষা করবেন।
একাকিত্ব দূর করার জন্য এবং এই সময়টিকে ভালোভাবে কাজে লাগাবার জন্য রাসবিহারী জাপানি ভাষা লিখতে আরম্ভ করলেন। এ ব্যাপারে মিসেস কোকো সোমা তাঁকে সহায়তা করেছিলেন। এই ভাবে চলছিল। এর মধ্যে মাস চারেক পরে এমন একটি ঘটনা ঘটলো যে পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূলে এসে গেল। ঘটনা হলো, ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জাহাজ থেকে ‘তেনো-মারু’ (Tenyo-Maru) নামে একটি জাপানি জাহাজে গোলাবর্ষণ করে তাকে জোর করে হংকং বন্দরে নিয়ে আসা হয়; তারপর তা থেকে সাতজন ভারতীয়কে জোর করে নামিয়ে সিঙ্গাপুরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বলা চলে, ইংরেজ নৌবাহিনী জোর করে জাপানি জাহাজে উঠে অস্ত্র প্রয়োগ করে তাঁদের যাত্রীদের একেবারে কিডন্যাপ করে নিয়ে গেল যেন। জাতীয়তাবাদী জাপানি নাগরিকদের স্বাভিমানে প্রচণ্ড আঘাত করলো এই ঘটনা। ক্ষেপে উঠলো নিপ্পনবাসী। জাপানের সার্বভৌমত্বের উপর ইংরেজ সরকারের এই সরাসরি হস্তক্ষেপ নিপ্পনবাসীরা মেনে নিতে পারলেন না। ইংরেজ সরকারের এই আচরণে জাতীয়তাবাদী নিপ্পনবাসীরা গর্জে উঠলেন। দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু হয়ে গেল। এবার জাপান সরকারও চাপে পড়ে গেল এবং ইংরেজের সব হুকুম তাঁরা আর মানবেন না এটা জানিয়ে দেওয়া হলো। জাপানের বৈদিশিক দপ্তরের নিয়মনীতির উপরও নিপ্পনবাসীদের প্রচণ্ড চাপ পড়েছিল, ফলে জাপানের বৈদেশিক দপ্তর ভারতীয় বিপ্লবীদ্বয়ের উপর থেকে নির্বাসন দণ্ড প্রত্যাহার করে নিল। প্রায় সাড়ে চারমাস পরে প্রকাশ্যে আসতে পারলেন ভারতীয় বিপ্লবীদ্বয়। হেরম্বলাল আমেরিকায় চলে গেলেন। অধ্যাপক তোয়ামা রাসবিহারীর জন্য একটি বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দিলেন। জাপানের নাগরিকত্ব পেতে গেলে জাপানে অন্তত সাত বছর বসবাস করতে হবে।
জাপানে এতদিন যে সব ব্যাক্তি তাঁকে সাহায্য করেছেন তাঁদের ধন্যবাদ জানাবার জন্য একটি ভোজসভার আয়োজন করে দিয়েছিলেন রাসবিহারী। এই ক’ মাসেই নিষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের জোরে কাজ চালাবার মতো জাপানি ভাষা শিখে ফেলেছিলেন তিনি। ওই ভোজসভায় তিনি জাপানি ভাষায় বক্তৃতা দেন এবং নিজের রান্না করা কিছু ভারতীয় খাবার পরিবেশন করেন। উপস্থিত সকলে রাসবিহারীর এইরকম গুণের পরিচয় পেয়ে চমৎকৃত হয়েছিলেন। তারপর থেকে রাসবিহারী টোকিয়োর বিভিন্ন জায়গায় জাপানি ভাষায় বক্তৃতা দিতে লাগলেন। বহু জাপানি ওইসব বক্তৃতা শুনতে আসতেন। রাসবিহারী ওইসব বক্তৃতায় ভারতে ইংরেজদের শোষণের কথা, ভারতীয়দের মুক্তি সংগ্রামের কথা, ভারত-জাপান মৈত্রীর কথা শোনাতেন। ভারতবর্ষ সম্পর্কে জাপানিদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যেতে লাগল। শুধু ভারতবর্ষ নয়, অধ্যাপক তোয়ামার সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি প্যান- এশিয়ান মুক্তি সংগ্রামের জন্যও কাজ করতে আরম্ভ করলেন। এশিয়ার অঞ্চলগুলো যেমন- থাইল্যান্ড, মালয়, বর্মা, জাভা, ফিলিপাইন, হংকং, চীন এসবই তখন পাশ্চাত্য দেশের কলোনি ছিল, তাই গোলামির
শিকলে বাঁধা ছিল। এদের গোলামি থেকে মুক্তির সংগ্রামে ব্রতী হয়েছিলেন রাসবিহারী বসু। তাঁর সংগ্রামের পরিধি বাড়তে লাগলো।
জাপান সরকার রাসবিহারীরর উপর থেকে বহিষ্কারের পরোয়ানা তুলে নিলেও ব্রিটিশ গোয়েন্দারা কিন্তু জাপানে রাসবিহারীর গতিবিধির উপর তীক্ষ্ণ নজর রেখেছিল। ছুতোনাতা পেলেই জাপান সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করে তাঁকে নিজেদের হেপাজতে নিয়ে নেবে এরকম তালে ছিল। তাছাড়া তাঁকে গুপ্ত হত্যাও করা হতে পারে- এরকম সম্ভাবনাও ছিল। একজন বিদেশি জাপানের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে কাজ করছেন, সব জায়গা যে তিনি ভালোভাবে চেনেন তা নয়, সবাই যে তাঁকে চেনে তাও নয়, এরকম অবস্থায় তিনি সহজেই চিহ্নিত হয়ে গুপ্তঘাতকের হাতে পড়ে যেতে পারেন। অধ্যাপক তোয়ামা এই সম্ভাবনার আঁচ করতে পেরে রাসবিহারীকে রক্ষাকবজ দেওয়ার একটি অভিনব পরিকল্পনা করলেন। তিনি তাঁর অনুগত সোমাদম্পতিকে প্রস্তাব দিলেন যাতে তাঁরা তাঁদের মেয়ে তোশিকোর সঙ্গে রাসবিহারীর বিবাহ দেন। অচেনা অজানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে কাজ করতে গিয়ে যাতে শত্রুদের হাতে পড়ে না যান তার জন্য তোশিকো তাঁর সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে থেকে তাঁর রক্ষাকবজের কাজ করতে পারবে। তাছাড়া এতে ভবিষ্যতে জাপানি নাগরিকত্ব পেতেও সুবিধা হবে
রাসবিহারীর পক্ষে।
শ্রীমতী কোকো সোমা পরবর্তী সময়ে একটি কাগজে (বাংলা অনুবাদক কাগজটির নাম দিয়েছেন- ‘বিচিত্র জগৎ’) এবিষয়ে লিখেছেন- ‘রাসবিহারী আমাদের বাটী পরিত্যাগ করিবার পর দেখা গেল ব্রিটিশরাজদূতের গুপ্তচরের হস্ত হইতে তাহাকে রক্ষা করা এক প্রকার অসম্ভব। একমাত্র উপায় একজন সতর্ক পার্শ্বরক্ষী দিবারাত্র তাহার সহিত থাকিবে। প্রথমে ছদ্মবেশে আমার স্বামী তাহার সহিত থাকিতেন। কিন্তু বেশিদিন এরূপভাবে ছদ্মবেশে আমার স্বামী পারিবেন না আর তাহা সম্ভবও নহে।… ব্রিটিশ দূতাবাসের গুপ্তচর ও গুপ্ত ঘাতকের হস্ত হইতে তাহাকে রক্ষা করিবার জন্য আমরা বদ্ধপরিকর বটে, কিন্তু কী উপায়ে যে তাঁহাকে রক্ষা করা যায় আমরা এখনো তাহা ঠিক করিয়া উঠিতে পারি নাই। আমরা প্রায় দিশেহারা হইয়া পারিয়াছি। একদিন তোয়ামা আমার স্বামীর নিকট আমার জ্যেষ্ঠা কন্যার সহিত রাসবিহারীর বিবাহ প্রস্তাব করিয়া বসিলেন। আমরা এই প্রস্তাবে বিহ্বল হইয়া পড়িলাম।…’ (কর্মবীর রাসবিহারী-অধ্যাপক বিজনবিহারী বসু
পৃষ্ঠা-১০১)
ভিন্ন দেশের সম্পূর্ণ ভিন্ন সভ্যতা ও সংস্কৃতির একটি যুবকের হাতে নিজের মেয়ের ভাগ্যকে ছেড়ে দেওয়ার এই প্রস্তাবে সোমা দম্পতি প্রথমে বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন ঠিকই। তবে উচ্চ আদর্শের অনুসারী সামুরাই বংশজাত সোমা দম্পতি মানব কল্যাণের বৃহত্তর স্বার্থে নিজেদের ব্যক্তিগত সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বার্থ ত্যাগ করতে প্রস্তুত হলেন। তাঁদের বাড়িতে আত্মগোপন করে থাকার সময় এই ভারতীয় যুবকের আচার ব্যবহার, নম্রতা, ভদ্রতা, সহিষ্ণুতা এবং মেধা তাঁদের
মুগ্ধ করেছে। মিসেস সোমাকে রাসবিহারী সবসময় মা বলে সম্বোধন করতেন। তিনিও তাঁকে পুত্রস্নেহেই দেখতেন। রাসবিহারীর সততা সম্পর্কে তাঁদের মনে কোনো সন্দেহই ছিল না। তাঁরা এই বিবাহের সম্মতি দেবেন ঠিক করলেন। কিন্তু তাঁদের চিন্তা হলো কন্যা তোশিকোকে নিয়ে। তাঁর মতামত জানতে চাইলে কিছুদিন সময় চেয়ে নিলেন তিনি ভাবার জন্য।
তোশিকো ছিলেন পিতা-মাতার আদর্শ সন্তান। ভিন দেশি একটি যুবক যার সভ্যতা সংস্কৃতি আলাদা তাঁকে বিয়ে করে তিনি ব্যক্তিগত ভাবে সুখী হবেন কিনা তা নিয়ে ভাবলেন না; বরং এই যুবক নিজের মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য কঠিন লড়াইয়ের সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। নিজের দেশ ছেড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অচেনা অজানা দেশে পাড়ি দিয়েছেন, এতে তিনি খুব অনুপ্রাণিত বোধ করতেন। হন না কেন তিনি বিদেশি তাঁর এই মহান সংগ্রামে তিনি যদি সঙ্গ দিতে পারেন তবে সেটাই হবে শ্রেষ্ঠ মানবধর্ম পালন; তাছাড়া মানুষটিকে তিনি যতটা দেখেছেন বা বুঝেছেন তাতে তাঁকে একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ বলেই মনে হয়েছে তাঁর। মনকে প্রস্তুত করলেন তিনি। মাস খানেক পর তাঁর মা পুনরায় তাঁর মতামত জানতে চাইলে তিনি বললেন— ‘মা। রাসবিহারীর হাতেই আমাকে দান কর। আমি তাঁর জীবন্ত বর্ম হইবার সংকল্প গ্রহণ করিয়াছি।’ (কর্মবীর রাসবিহারী- অধ্যাপক বিজনবিহারী বসু পৃষ্ঠা-১০২)। সোমা পরিবারের জানার বিষয় ছিল- রাসবিহারীর এই বিয়েতে মত আছে কিনা, তাছাড়া ভারতে সে বিয়ে করেছে কিনা। এই বিবাহ নিয়ে রাসবিহারীর মধ্যে প্রথমে একটা দ্বিধার ভাব থাকলেও অধ্যাপক তোয়ামা যখন ভালো-মন্দ সমস্ত চিন্তা করে এই প্রস্তাব দিয়েছেন তখন সেটা তাঁর কাছে আদেশেরই নামান্তর। তাই তিনিও মত দিলেন এবং জানালেন ভারতের স্বাধীনতার সংগ্রামে অল্প বয়স থেকেই তিনি জীবনকে উৎসর্গ করেছেন এবং সেই সংগ্রামে এতটাই গভীর ভাবে জড়িয়ে আছেন যে এতদিন বিয়ের কথা ভাবেননি।
অবশেষে ১৯১৮ সালের ৯ জুলাই অধ্যাপক তোয়ামার বাসগৃহে ৩২ বছরের রাসবিহারী ও ২২ বছর বয়সি জাপানি কন্যা তোশিকোর বিবাহ হয়ে গেল। তোশিকো ভারতীয় সতীসাধ্বী স্ত্রীর মতোই স্বামীর যোগ্য সহধর্মিণী হয়ে উঠেছিলেন এবং বিপ্লবী স্বামীর সমস্ত কাজেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং রক্ষাকবজের মতো তাঁকে বিপদমুক্ত রাখার জন্য সদাসচেষ্ট ছিলেন। তাঁর বিবাহিত জীবনও কিন্তু গুপ্তবাসেই কাটাতে হয়েছে। ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের হাত থেকে বাঁচবার জন্য প্রায় সতেরোবার তাঁদের বাসস্থান পরিবর্তন করতে হয়েছিল। এই গুপ্ত আবাসে থাকাকালীন ১৯১৯ সালে তাঁদের এক পুত্রসন্তান হয়, নাম মাসাহিদে। ১৯২২ সালে হয় এক কন্যাসন্তান নাম তেতুকো। সাত বছর জাপানে থাকার পর অবশেষে ১৯২৩ সালে অধ্যাপক তোয়ামার প্রচেষ্টায় রাসবিহারী বসু জাপানের নাগরিকত্ব লাভ করেন। রাসবিহারী ও তোশিকো তাঁদের নিজেদের একটি ছোটো বাড়িতে স্বস্তিতে থাকতে আরম্ভ করেন। কিন্তু রাসবিহারীর দাম্পত্য সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটিশ গুপ্তচর এবং গুপ্ত ঘাতকদের হাত থেকে স্বামীকে বাঁচাবার জন্য দুটি সন্তান-সহ বিভিন্ন গুপ্ত আবাস
পরিবর্তন করে করে খুব সন্তর্পণে জীবনযাপন ও চলাফেরা করতে গিয়ে যে অসম্ভব দৈহিক ও মানসিক চাপ তাঁকে নিতে হয়েছিল তাতে তোশিকোর শরীর একেবারে ভেঙ্গে পড়েছিল। ১৯২৫ সালের ৪ মার্চ রাসবিহারীর প্রিয় পত্নী মহীয়সী নারী তোশিকো নিউমোনিয়া অসুখে পরলোকগমন করেন। নিজের প্রিয় পুত্রকে পরবর্তীকালে রাসবিহারী নিজের তৈরি ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’র একজন ক্যাপ্টেনরূপে মাতৃভূমির মুক্তি সংগ্রামে পাঠিয়েছিলেন। তাঁর পুত্র সেই যুদ্ধে প্রাণদান করেছিলেন। সে অন্য ইতিহাস।
এখানে প্রসঙ্গক্রমে মহান বিপ্লবী রাসবিহারীর একটি বিশেষ গুণের উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি খুবই ভালো রান্না করতে পারতেন। ১৯২০ সাল নাগাদ সোমা দম্পতিদের নাকামুরায়া বেকারির ব্যবসায় লোকসান হতে আরম্ভ করল। তখন হাল ধরার জন্য এগিয়ে আসেন রাসবিহারী। তিনি বেকারির একটি অংশে চালু করেন একটি রেস্টুরেন্ট। সেখানে তিনি নিজের হাতে রান্না করা নানারকম ভারতীয় খাবার রাখতে আরম্ভ করেন যা জাপানিদের খুবই আকৃষ্ট করেছিল। ক্রমে সেই রেস্টুরেন্টের নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল; তিনিও সেখানে ‘বোস অব নাকামুরায়া’ নামে বিখ্যাত হয়ে উঠলেন (Revolutionaries-
by Sanjeev Sanyal, P-159)। এতটাই বিখ্যাত হয়েছিল সেই রেস্টুরেন্ট যে সেটি আজও সেখানে আছে এবং তাঁর রেসিপির খাবার এখনো পাওয়া যায়। এখন জাপানে গেলে ভারতীয় খাবার খুঁজে পেতে অসুবিধা হয় না। মহান বিপ্লবী রাসবিহারী বসু তথা ‘বোস অব নাকামুরায়া’র হাত ধরেই ভারতীয় রেসিপি জাপানে জনপ্রিয় হয়েছে।

















