যখন উত্তরবঙ্গ ডুবছিল, তখন কলকাতায় কার্নিভালের নাচ চলছিল
বিপ্লব বিকাশ
উত্তরবঙ্গের আকাশ সেই দিন ছিল কালো মেঘে ঢাকা। নদীগুলো ফুলে উঠেছিল, ঘরবাড়ি ভেসে যাচ্ছিল, মানুষ বাঁচার লড়াইয়ে রাস্তায় নেমে এসেছিল।
বনভূমি থেকে ভেসে আসছিল কাঠ, অবৈধভাবে কাটা সেই কাঠ যেন নিজেই দিচ্ছিল জঙ্গল কাটাই ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রমাণ। অসহায় মানুষের সঙ্গে সঙ্গে নিরীহ বন্যপ্রাণীরাও বন্যার জল থেকে প্রাণ বাঁচানোর লড়াই লড়ছিল। আমরা দেখলাম কীভাবে বন্যপ্রাণীদের মৃতদেহ পড়ে ছিল। আর ঠিক তখনই রাজ্যের রাজধানী কলকাতায় চলছিল অন্য এক উৎসব, টলিউড তারকাদের সঙ্গে নাচে গানে মাতোয়ারা ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী!
ইতিহাসে পড়েছিলাম, ‘যখন রোম জ্বলছিল, নিরো তখন বেহালা বাজাচ্ছিল।’ কয়েকদিন আগে পশ্চিমবঙ্গবাসী যেন সেই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি দেখল, যখন উত্তরবঙ্গ ভাসছে, মুখ্যমন্ত্রী তখন কার্নিভালের আনন্দে ব্যস্ত। দুর্যোগ, মৃত্যু, আর্তনাদ, সব কিছু যেন তাঁর থেকে বহু দূরের কোনো গল্প। আগে কার্নিভাল হবে, তারপরে দেখা যাবে উত্তরবঙ্গের জনজীবনের অবস্থা। এর কয়েক সপ্তাহ আগে কলকাতা বর্ষার জলে ভেসে গিয়েছিল। মূল্য দিয়েছিল সেই পরিবারগুলি যাদের বাড়ির লোকজন প্রাণ হারায়। আর আমরা? আমরা ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থ নিয়ে চুপ ছিলাম নয়তো ফিরহাদ হাকিমের বক্তব্যের চুলচেরা বিশ্লেষণ
করছিলাম। হ্যাঁ, কয়েকজন অবশ্য মুখ্যমন্ত্রীর ভ্রান্ত বক্তব্যের সমালোচনা করতে ব্যস্ত ছিলাম, কিন্তু এটা কি সমাধান? না, একদমই নয়। যদি এটা সমাধান হতো তাহলে উত্তরবঙ্গ জলে এই ভাবে ভাসতো না। সরকার প্রস্তুতি নিতো। একবার ভেবে দেখুন তো সরকারের প্রস্তুতির অবস্থা। ইতিহাস একদিন নিশ্চয়ই লিখবে, ‘যখন মানুষ কাঁদছিল, তখন কলকাতায় নেতারা নাচছিলেন।’
কিন্তু এটাই কি সবচেয়ে দুঃখজনক দৃশ্য? না। আরও ভয়াবহ ঘটনা ঘটল সেই বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেই, যেখানে মানুষের পাশে দাঁড়াতে গিয়েছিলেন সাংসদ খগেন মুর্মু ও বিধায়ক ড. শঙ্কর ঘোষ। দু’জনেই আহত হলেন, পাথর নিক্ষেপ করে হামলা হলো তাঁদের ওপর। অভিযোগ উঠেছে, তৃণমূল আশ্রিত গুন্ডাবাহিনী তাঁদের উপর পাথর বৃষ্টি চালিয়েছে। প্রশ্ন জাগে, মানুষকে সাহায্য করতে যাওয়া জনপ্রতিনিধিরা যদি নিরাপদ না থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষ
কোথায় যাবে? আসলে মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে এই প্রশ্ন করা একটি পরম্পরা তো বটেই, কিন্তু আমাদের রাজ্যে এর কোনো অর্থ নেই।
পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক হিংসা এখন এক নতুন স্বাভাবিকতা। নির্বাচন হোক বা না হোক, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর আক্রমণ, ভয় দেখানো, এমনকী প্রাণনাশের চেষ্টা বা ব্যক্তিহত্যা, সবই এখন খবরের রুটিনের অংশ। মুখ্যমন্ত্রী নিজে যখন দলীয় কর্মীদের ‘ফোঁস করে ওঠার’ আহ্বান দেন, তখন কি এটাই তার বাস্তব রূপ নয়?
অন্যদিকে, রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে ভয় পাচ্ছে সবাই। দুর্গাপুরে ডাক্তারি পড়ুয়া এক তরুণীর সম্ভ্রমহানি করা হলো, আর মুখ্যমন্ত্রী
বললেন, ‘রাতে মেয়েটির বেরোনো উচিত ছিল না।’ এ কোন মানসিকতা? একজন নারীকে দোষারোপ করে কী প্রশাসনের দায় শেষ হয়? সমাজের বিবেক কোথায়? আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, ল’ কলেজ হোক বা দুর্গাপুর মেডিকেল কলেজ- মেয়েদের ওপর এই ধরনের যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটানো দুষ্কৃতীরা সবাই তৃণমূল পার্টির সঙ্গে যুক্ত। এতো সাহস কথা থেকে পাচ্ছে দুষ্কৃতীরা? মনে রাখবেন ফোঁস করছে নিজের-নিজের মতো করে এরা। এই ফোঁস করার আহ্বান মুখ্যমন্ত্রী নিজেই জানিয়েছিলেন। এই সরকারটাকে দুষ্কৃতীরা তাদের নিজেদের সরকার বলে মনে করছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, যেখানে গত বছর
রাত দখল নিয়ে রাস্তায় নামত বিভিন্ন সংগঠন, আজ সেখানে নীরবতা। কোনো ফেমিনিস্ট আন্দোলন নেই, কোনো প্রতিবাদ মিছিল নেই। কেন? গত বছর আর জি কর আন্দোলনের পর যে রাজনৈতিক বোঝাপড়া হয়েছিল বাম ও তৃণমূলের মধ্যে, তা আজ ফল দিচ্ছে- চুপ থাকা, সুবিধা পাওয়া আর জনরোষকে ম্যানেজ করার মাধ্যমে।
এই নীরবতা ভয়ংকর! একদিকে হিংসা, মহিলাদের সম্ভ্রমহানি, দুর্নীতি, অন্যদিকে শাসক দলের আত্মতৃপ্তি, তারকা-ঝলমলে উৎসব, আর প্রশাসনের প্রতি জনগণের অবিশ্বাস। রাজনীতির এই চিত্র এক ভয়ানক অসুস্থ শাসনের প্রতিচ্ছবি। আজ পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন, এই রাজ্য কবে মুক্তি পাবে এই হিংসা, সন্ত্রাস, অপশাসন ও অন্যায়ের প্রতি উদাসীনতার রাজনীতি থেকে? গত পাঁচ দশক ধরে এই রাজ্যের মানুষ ভুগছে রাজনৈতিক হিংসার আগুনে।

















