ভাষাহীন বিপদ আর আপদ উদ্ভূত ফসল নির্মমতার কবে পতন?
অবৈধ জনপ্রিয়তা
নির্মাল্য মুখোপাধ্যায়
নারকীয় অভয়া কাণ্ডের পর কসবা ও দুর্গাপুরে তৃণমূল আশ্রিতদের নোংরামি মানুষ দেখেছেন। রাজ্যপাটের পৃষ্ঠায় পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলনেত্রীর রাজ্য শাসনের প্রক্রিয়াটি ধারাবাহিকভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে। প্রশাসন কতটা নীচে নামলে রাজ্য জুড়ে নারী স্বাধীনতা এবং নারীদের নিরাপত্তা প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়ে তা এর আগে অনেকবার তুলে ধরা হয়েছে। প্রশাসনিক অধঃপতনের নমুনা এখন হাড়ে মজ্জায় টের পাচ্ছে রাজ্যবাসী। এমনকী পড়শি রাজ্যের বাসিন্দারাও এই রাজ্যে এসে ভুক্তভোগী। মুখ্যমন্ত্রীর নিম্নবর্গীয় সাধারণ স্বভাব হলো অসামাজিকতার পালন-পোষণ আর মুসলমান তোষণ। তিনি বলেন যে, তিনি নাকি গুন্ডা কন্ট্রোল করতে পারেন। কিছু উৎকোচ পাওয়ার আশায় একটা গোটা সম্প্রদায় কীভাবে নিজেদের কালিমালিপ্ত করতে পারে তার বড়ো প্রমাণ এখানকার একাংশ মুসলমান সমাজ। ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের ফলে বিহারে প্রায় ৬ শতাংশ বেআইনি ভোটার বাদ পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গের চিত্রটা অনেক কুৎসিত। টেলিভিশনের পর্দায় সম্প্রচারিত হচ্ছে যে, সস্তা চিত্রাভিনেত্রীদের হাত ধরে মুখ্যমন্ত্রী নাচছেন আর তার পাশের ছবিতেই দেখা যাচ্ছে যে, লাইন করে শোয়ানো রয়েছে দুর্যোগ বিধ্বস্ত মানুষের মৃতদেহ।
সাহিত্য সম্রাট ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন বাঘ কেন বিপদ আর ব্রিটিশ শাসক কেন আপদ। বিপদের থেকেও তা মারাত্মক। ঘাড় থেকে নামতে চায় না। যেমন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যের পঞ্চান্ন শতাংশ ভোটারের কাছে তৃণমূল আপদ। এখন রাজ্যের মানুষ বুঝছে কেন তৃণমূলকে ক্ষমতায় নিয়ে এসে তারা রাজ্যকে বিপদে ফেলেছে। ২০১১ সালে মানুষ আপদ সিপিএমকে সরিয়ে তৃণমূল নামক বিপদকে এনেছে। সেই বিপদ এখন অতি বড়ো
আপদে পর্যবসিত হয়েছে। তাই আপদ বিদায়ের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে এবং আপৎকালীন ব্যবস্থার তোড়জোড় চলছে। ২০২৬-এর আসন্ন রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে প্রায় ১৪ হাজার বুথ বেড়ে গিয়ে সারা রাজ্যে বুথ বা ভোটদান কেন্দ্রের সংখ্যা দাঁড়াতে পারে প্রায় ৯৫ হাজার। এই মুহূর্তে সাংগঠনিকভাবে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসই কেবল ১০০ শতাংশ বুথে কর্মী নিয়োগ করতে পারে। তৃণমূলকে টক্কর দিতে হলে বিজেপিকে এই সংখ্যার কাছাকাছি পৌঁছতে
হবে, যদি না প্রবল জনরোষে তৃণমূলের নৌকা ওলটায়। ২০১১-র ভোটে তৃণমূলের সংগঠন দুর্বল ছিল, তবে মানুষ সিপিএমকে ধসিয়ে দিয়েছিল। বাম জমানায় লেখা হতো- ‘মার্কসবাদ সর্বশক্তিমান, কারণ তা সত্য’। এই ডাহা মিথ্যাটিকে সিপিএম লাঠির জোরে প্রমাণ করার চেষ্টা চালাত। ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’ তেমনই এক মার্কসবাদী ধরনের মিথ্যা। রাজনৈতিক হিংসা, জেহাদি সন্ত্রাস ও নারী নির্যাতন হলো তৃণমূলের দেনাপাওনার হিসাব, মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলনেত্রী পরিচালিত রাজ্য সরকারের আসল রিপোর্ট কার্ড। মিথ্যা তার সহোদর। সাংসদ খগেন মুর্মু এবং বিধায়ক ড. শঙ্কর ঘোষের ওপর সংঘটিত আক্রমণ প্রমাণ করেছে যে, মুসলমান সম্প্রদায় তাদের জেহাদি ও দুষ্কৃতীদের তৃণমূলের কাছে ভাড়া খাটায়। কতটা স্বার্থ থাকলে একটি সম্প্রদায় তার মর্যাদা
জলাঞ্জলি দিতে রাজি থাকে!
তবে সাম্প্রদায়িক দুষ্কৃতায়নের ফলে আগামী নির্বাচনে মুসলমান ভোটে ভাঙন ধরার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। খগেন মুর্মুর ওপর আক্রমণ সাধারণ মানুষ থেকে তৃণমূলের রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার বড়ো প্রমাণ। তাই গায়ের জোর খাটিয়ে এবং ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করে ভোটারদের বুথ থেকে দূরে রাখতে চায় জনবিচ্ছিন্ন তৃণমূল কংগ্রেস দল এবং তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন পুলিশ-প্রশাসন। ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কাজ শুরু হওয়ার আগেই রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রীর হুমকি প্রমাণ করছে যে, আগামী নির্বাচন নিয়ে তিনি আসলে শঙ্কিত। নতুন ভোটার তালিকায় মৃত ও অবৈধ
ভোটারদের নাম পড়ার আশঙ্কা করছেন তিনি। বিজেপির সঙ্গে তৃণমূলের ভোটের ব্যবধান মাত্র পাঁচ শতাংশের। রাজ্যের সাড়ে সাত কোটির কিছু বেশি ভোটারের তুলনায় যা যৎসামান্য। বিজেপির দাবি- বিশেষ নিবিড় সংশোধনের পর রাজ্যে অন্তত এক কোটি ভোটার কমবে।
রাজ্যের ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার আগে সিপিএম যত ধরনের অনিষ্ট করেছিল তৃণমূলের সঙ্গে তার অদ্ভুত মিল। দেহ সন্ত্রাসের ভিতর দিয়েই সিপিএমের মৃত্যু পরোয়ানা লেখা শুরু হয়। খগেনবাবুকে যারা আক্রমণ করেছে এবং দুর্গাপুরে যারা ডাক্তারি পড়ুয়া ছাত্রীকে নির্যাতন করেছে প্রায় সকলেই সাম্প্রদায়িক দুষ্কৃতী। তৃণমূলনেত্রী শাসিত রাজ্যে দুষ্কৃতী আর সন্ত্রাসবাদী শব্দ দু’টি মুসলমান সম্প্রদায়ের সঙ্গে এখন সমার্থক হয়ে গিয়েছে। বিজেপি নেতৃত্বের ওপর সাম্প্রদায়িক হানা যে কোনোভাবেই জনরোষ নয়, বরং একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে উসকে দেওয়ার জ্বলন্ত নথি- তৃণমূল নেতারা এই সত্য কিছুতেই এড়াতে পারছেন না। বিধানচন্দ্র রায় ও জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে না হেরে বিদায় নিয়েছিলেন। বিধান রায় তাঁর জন্মদিনে হৃদরোগে আক্রান্ত হন এবং জ্যোতি
বসুকে তার দল কুলোর বাতাস দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে তাড়িয়ে দেয়। স্বাভাবিকভাবেই তাই চর্চা চলছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক বিদায় কীভাবে হতে পারে। তৃণমূলনেত্রীর সুবিধা হলো তিনি সহজেই অবৈধতার ভাষা হজম করতে পারেন। তাঁর এই ‘নাহি লাজ নাহি অপমান’-এর ভাবনা বাকি দু’জনের থেকে আলাদা। ২০২১-এর ভোটে নন্দীগ্রামের হার অনেক আগেই তৃণমূলনেত্রীর জনপ্রিয়তাকে অবৈধ ও প্রাক্তন করেছিল। এখন রাজ্যবাসী
অপেক্ষায় রয়েছেন ২০২৬-এ আদৌ কি ঘাড় থেকে নামবে ‘বেতাল তৃণমূল’ নামক আপদ!প্রমাণ করা যাবে যে, মার্কসীয় লাঠির মতন তৃণমূলনেত্রীর শাসনও বেআইনি?
(লেখকের মতামত ব্যক্তিগত)

















