পানিহাটির দণ্ড মহোৎসব
সপ্তষি ঘোষ
উত্তর চব্বিশ পরগনার গঙ্গা তীরবর্তী এক প্রাচীন ও সমৃদ্ধ জনপদ পাটিহাটি। কারও মতে, ‘পুণ্যহট্ট’ বা ‘পণ্যহট্ট’ নাম থেকেই ‘পানিহাটি’ কথাটি এসেছে। একদা গঙ্গা তীরবর্তী এই অঞ্চলে পণ্য আমদানি-রপ্তানি হতো বলেই ‘পণ্যহট্ট’ নামটি প্রচলিত ছিল। এই জনপদ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, প্রভু নিত্যানন্দ, শ্রীরামকৃষ্ণ, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ, গান্ধীজী প্রমুখ মহাপুরুষের কষের পবিত্র স্মৃতিকে বহন করে চলেছে।
পুরী যাওয়ার পথে এবং পুরী থেকে গৌড় যাওয়ার পথে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু পানিহাটি গঙ্গার ঘাটে অবস্থান করেছিলেন। তাঁর পুণ্য পাদস্পর্শে ধন্য হয়েছিল পানিহাটি। গঙ্গার তীরে সেই আটটি ‘শ্রীচৈতন্য ঘাট’ নামে ভক্তদের কাছে পরিচিত,। শোনা যায়, ১১০২ বঙ্গাব্দে রাজা বল্লাল সেন এই ঘাট তৈরি করেছিলেন। ঘাটের ঠিক উপরেই আছে এক প্রাচীন বটবৃক্ষ। কথিত আছে, এই বটবৃক্ষের নীচেই শ্রীচৈতন্যদেব ও প্রভু নিত্যানন্দ বিশ্রাম গ্রহণ করেছিলেন।
পানিহাটিতে কয়েকদিন অবস্থান করার পরে নীলাচলে যাওয়ার আগে চৈতন্যদেব প্রভু নিত্যানন্দকে দক্ষিণবঙ্গে বৈষ্ণবমত প্রচারের দায়িত্ব দিয়ে যান। সেই দায়িত্ব গ্রহণ করে নিত্যানন্দ একদিন নৌকাযোগে গঙ্গাতীরবর্তী বিভিন্ন গ্রামে নামকীর্তন
করতে করতে পানিহাটির ‘শ্রীচৈতন্য ঘাট’-এ নামলেন। সেই সময় সপ্তগ্রামের জমিদার হিরণ্য মজুমদারের ভক্তিপ্রাণ ভাইপো রঘুনাথ মজুমদার ওই সুপ্রাচীন বটবৃক্ষের নীচে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রভু নিত্যানন্দের কৃপা লাভ করার জন্য রঘুনাথ ব্যাকুল হয়ে প্রার্থনা জানান। সেই সঙ্গে রঘুনাথ সবিনয়ে বলেন, এত দেরি করে কৃপাপার্থী হতে এসেছেন বলে নিজেকে অপরাধী মনে করছেন। তাই তিনি নিত্যানন্দের কাছে এই স্বকৃত অপরাধের জন্য দণ্ড বা শাস্তি প্রার্থনা করেন। বিনয়ী রঘুনাথের মুখে একথা শুনে নিত্যানন্দ তাঁকে দু’হাত বাড়িয়ে নিজের বুকে টেনে নিয়ে বললেন, ‘তোমার মতো বিনয়ী বৈষ্ণবের বৈষ্ণব সেবাই দণ্ড। এখানে উপস্থিত বৈষ্ণবদের দই-চিড়ে দিয়ে মহোৎসব করাও। আমি তোমাকে এই দণ্ডই দিলাম।’ সেই শুভদিনটি ছিল জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা ত্রয়োদশী তিথি। সেদিন নিত্যানন্দের আদেশে রঘুনাথ সানন্দে চিড়ে, দই, কলা, দুধ, চিনি প্রভৃতি সংগ্রহ করে উপস্থিত ভক্তমণ্ডলীকে ভোজন করিয়ে কৃতার্থ হয়েছিলেন। এই উৎসবই বৈষ্ণব ভক্তদের কাছে ‘দণ্ড মহোৎসব’ নামে পরিচিত। উৎসবান্তে নিত্যানন্দ প্রভু রঘুনাথকে আশীর্বাদ করে বলেন, ‘অচিরে নির্বিঘ্নে পাবে চৈতন্য চরণ।’
তদবধি রঘুনাথ প্রতি বছরই জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা ত্রয়োদশীতে বৈষ্ণব ও
ভক্তের সমন্বয়ে এই মহোৎসবের আয়োজন করতেন। রঘুনাথের পর পানিহাটি নিবাসী রাঘব পণ্ডিত দণ্ড মহোৎসবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আজও জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা ত্রয়োদশী তিথিতে পানিহাটিতে এই উৎসব যথাযোগ্য মর্যাদায় উদ্যাপিত হয়। দণ্ড মহোৎসবে লক্ষ লক্ষ ভক্তের ঢল নামে।
‘শ্রীচৈতন্য ঘাট’ এর উপর দণ্ড মহোৎসবের প্রাঙ্গণটি বাঁধানো। পাশে একটি ছোটো ঘরে চৈন্যদেবের চরণচিহ্ন পূজিত হয়। জগন্নাথ, সুভদ্রা, বলরাম, গৌর-নিতাই ও রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহও এখানে রক্ষিত আছে।
শ্রীরামকৃষ্ণ সপার্ষদ বহুবার দণ্ড মহোৎসব যোগদান করেছেন। পানিহাটি নিবাসী মণিমাধব সেনের কাছে তিনি প্রথম এই উৎসবের বিষয়ে জ্ঞাত হন।
শ্রীরামকৃষ্ণ দণ্ড মহোৎসবে যোগদান করতে পানিহাটিতে প্রথম আসেন ইংরেজি ১৮৬৮ সালে। ১৮৮৫ সালে অসুস্থ অবস্থায় শ্রীরামকৃষ্ণ শেষবার এসেছিলেন পানিহাটির মহোৎসবে। এই উৎসবে উপস্থিত থেকে তিনি আধ্যাত্মিক আনন্দ উপভোগ করতেন।
পানিহাটির দণ্ড মহোৎসব বৈষ্ণব ভক্তদের কাছে এক মহামিলন মেলা। লক্ষ লক্ষ ভক্তের প্রাণ মাতানো কীর্তনে মেতে ওঠে মহোৎসব প্রাঙ্গণ। বহু বিদেশি ভক্তও দণ্ড মহোৎসবে যোগদান করে উৎসবের কৌলীন্য বৃদ্ধি করেন। এই বছর দণ্ড মহোৎসবের তারিখ পড়েছে ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩২ (৯ জুন ২০২৫) সোমবার।
হিন্দু দর্শন বেদভিত্তিক প্রত্যক্ষ অনুভূতি
বন্দনা বিশ্বাস
হিন্দু দর্শন হলো ভারতীয় দর্শনের এমন একটি অন্যতম শাখা যা বেদকে জ্ঞানের উৎস হিসেবে স্বীকার করে। মূলত হিন্দুদর্শন আস্তিক ধারার একটি অংশ। যা ঈশ্বর ও আত্মাকে বিশ্বাস করে। হিন্দু দর্শন বিশ্বাস করে যে প্রতিটি জীবিত প্রাণীর একটি আত্মা আছে যা পরমাত্মার অংশ।
আর হিন্দু দর্শন এটাও বিশ্বাস করে যে কর্ম অনুযায়ী এবং কর্মফল অনুযায়ী জন্ম জন্মান্তরের চক্রে জীবজগৎ এগিয়ে যায়।
হিন্দু দর্শন বৈদিক মত,ঋষিদের চিন্তাভাবনা, চর্চা, পুরাণকথা ও সমাজজীবনে সঙ্গে মেলবন্ধনের মাধ্যমে ধাপে ধাপে সৃষ্ট। হিন্দু দর্শনের উদ্ভব একটি দীর্ঘকালীন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের ফল। এটি কোনো নির্দিষ্ট সময়ে বা কোনো একজন ব্যক্তির দ্বারা লিখিত বা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং বলা যায় এটা বহু শতাব্দী ধরে ধাপে ধাপে বিভিন্ন জ্ঞানী, মুনি, ঋষিদের দ্বারা গড়ে উঠেছে। হিন্দু দর্শন দীর্ঘকাল ধরে এক বিস্তৃত ও গভীর চিন্তাধারা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। মুনিঋষিদের
অভিমত- হিন্দু দর্শন কোনো একটি মতবাদ নয় বরং এটি প্রত্যক্ষ অনুভূতি অভিজ্ঞতার উপর প্রতিষ্ঠিত এক প্রত্যক্ষ সত্য।
হিন্দু দর্শন তার মৌলিক প্রকৃতিতে কেবল একটি বুদ্ধিভিত্তিক বা তত্ত্বগত অনুশীলন নয়। এটি একান্তভাবে অনুভব
নির্ভর অভিজ্ঞতার উপর প্রতিষ্ঠিত। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তি হলো বেদ। এটি মূলত আত্ম-জিজ্ঞাসা অর্থাৎ ‘আমি’ কে? জগৎ কী? ‘এই জগতের প্রকৃতি কী’? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করা। এটি কোনো বাহ্যিক বিশ্বের বিষয় নয়। এটা পুরোপুরি অন্তর্জগতের জ্ঞান। এই অনুসন্ধানের প্রেরণা আসে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে।
হিন্দু দর্শনের সূচনা মূলত ঋকবেদের যুগ থেকে। এই সময় দর্শন ও ধর্ম এক সূত্রে গাঁথা ছিল। যেমন যাগ-জজ্ঞ, দেবতা, পূজা, ঋত্বিক প্রথা এবং আত্মা ও ব্রহ্ম। আত্মা ও ব্রহ্ম নিয়ে চিন্তা এই সময়ে কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে। এই দর্শন থেকে উদ্ভব হয়- অদ্বৈততত্ত্ব, দ্বৈততত্ত্ব, বিশিষ্টা দ্বৈততত্ত্ব প্রভৃতি ভাবধারা। ‘আমি সেই ব্রহ্ম’ এই মহাবোধ এই ভাবধারা থেকেই উদ্ভুত। রামায়ণ, মহাভারত, ইত্যাদির মাধ্যমে হিন্দু দর্শন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ভগবত গীতা হিন্দু দর্শনের এক গুরুত্বপূর্ণ সূত্র- যেখানে কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ ও ভক্তিযোগের ব্যাখ্যা করা রয়েছে।
জ্ঞান থেকে বেদের উৎপত্তি। বেদের আর এক নাম শ্রুতি, যা শুনে শুনে মনে রাখা হয়। কিন্তু এই শ্রবণ শুধুমাত্র শ্রবণ যন্ত্রের মাধ্যমে নয় বরং এটি অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান। ঋষিরা ধ্যানদৃষ্টিতে যে সত্যকে উপলব্ধি বা অনুভব করেছেন তাকেই তাঁরা শব্দের রূপ দিয়েছেন। সেই অর্থে বেদ হলো অন্তঃপ্রেরণার রূপ। বেদে বলা হয়েছে ‘ঋষয়ঃ মন্ত্রদ্রষ্টারঃ ঋষিরা মন্ত্রদ্রষ্টা, তাঁরা শুধুমাত্র লেখক নন। তাঁরা সত্যকে অনুভব করেছেন, উপলব্ধি করেছেন, চেতনার উচ্চতর স্তরে পৌঁছে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতাজনিত জ্ঞান লাভকরেছেন।
হিন্দু দর্শনের ছ’টি মূল শাখা রয়েছে যা ষড়দর্শন নামে পরিচিত। এগুলি হলো:
সাংখ্য: এই দর্শনে প্রকৃতির ও আত্মা সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। যা দ্বৈততত্ত্ব ধারণ করে রেখেছে।
যোগ: এই দর্শন আত্মনিয়ন্ত্রণ ও কৃচ্ছ সাধনার মাধ্যমে মোক্ষলাভের পথ দেখিয়েছে।
ন্যায়: এই দর্শন জ্ঞান ও যুক্তির উপর গুরুত্ব দিয়েছে।
বৈশেষিক: এই দর্শনে প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান ও তাদের বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
মীমাংসা: এই দর্শনে
আত্মার স্বরূপ ও পরমাত্মার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
তাই হিন্দু দর্শন নিছকভাবে তাত্ত্বিক চিন্তা নয় বরং চেতনার উচ্চতর স্তরে পৌঁছে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতাপ্রসূত জ্ঞান। হিন্দু দর্শনের মূল লক্ষ্য হলো আত্মোপলব্ধি- নিজেকে জানা, যা যুক্তির বাইরে গিয়ে অভিজ্ঞতার বিষয়। যেমন অদ্বৈত বেদান্ত- ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’- এটি কেবল একটি চিন্তা নয় বরং এক একজন ঋষির প্রত্যক্ষ ও উপলব্ধির ফল।
ধর্মরাজ্য সংস্থাপক ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ
প্রবীর কুমার মিত্র
ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের সম্পূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিন্দু সমাজের কাছে আজও মূর্তিমান আদর্শ। তাঁর দ্বারা সম্পূর্ণ দেশের জন্য কিছু করার প্রয়াসের সফল পরিণতি হলো তাঁর রাজ্যাভিষেক। এই জন্য শিবাজী সাম্রাজ্য দিবস না বলে ‘হিন্দু সাম্রাজ্য দিনোৎসব বলা হয়। তাঁর চরিত্র, নীতি, কুশলতা ও উদ্দেশ্যর পবিত্রতা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। সেই সময় পরিস্থিতি ছিল হিন্দু সমাজের যেকোনো ব্যক্তি সৈনিক, সর্দার অথবা সেনাপতি হতে পারে কিন্তু রাজা হতে পারে না। এই বিপরীত পরিস্থিতিতে তিনি হিন্দু সমাজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগিয়েছিলেন। একজন হিন্দুও যে একজন স্বাধীন সার্বভৌম রাজা হতে পারেন তা তিনি প্রমাণ করেছিলেন।
শিবাজী মহারাজ সীমিত সাধনের দ্বারা প্রমাণ
করেছিলেন হিন্দু শ্রেষ্ঠ, স্বতন্ত্র এবং নিজে শাসক হবার যোগ্য। সাধারণ ব্যক্তির মধ্যে অসাধারণ প্রতিভা জাগিয়ে রাষ্ট্রনির্মাণের কুশলী নেতৃত্ব তৈরি করেছিলেন। সম্পূর্ণ হিন্দু সমাজের জন্য প্রেরণাদায়ী হিন্দু সাম্রাজ্য তিনি স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু তখনও পর্যন্ত শাস্ত্র অনুসারে বিধিবদ্ধ সিংহাসন আরোহণ হয়নি। এইজন্য কেউ কেউ শিবাজীকে রাজা মানতে অস্বীকার করে। শিবাজীর জীবনের এই ফাঁক পূরণ করার জন্য কাশীর অন্যতম পণ্ডিত গাগাভট্ট এগিয়ে আসেন। শাস্ত্র অনুসারে শিবাজীর রাজ্যাভিষেক হয়। তখন শিবাজীর বয়স ৪৪ বছর। দুর্গম ও সর্বশ্রেষ্ঠ রায়গড় দুর্গে রাজধানী স্থাপন করা হয়। মাতা জীজাবাঈয়ের চরণ স্পর্শ করে তাঁর আশীর্বাদ নিয়ে শিবাজী রত্নখচিত স্বর্ণসিংহাসনে আসীন হন। পণ্ডিত গাগাভট্ট শিবাজীর মস্তকে স্বর্ণছত্র স্থাপন করে তাঁকে ‘ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ’ ঘোষণা করেন। মহিলারা আরতি করেন। সাধুসন্তরা আশীর্বাদ করেন। দূরদূরান্ত থেকে আগত অতিথিরা আনন্দে বিভোর হয়ে মুক্তকণ্ঠে জয়জয়কার করেন ‘ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ কী জয় হো।’ রায়গড় দুর্গ থেকে তোপ দাগা হয়। বীজাপুরের সুলতান এবং ইংরেজরা শিবাজীকে স্বতন্ত্র রাজা হিসেবে মান্যতা প্রদান করে উপটৌকন পাঠায়। এই ঘটনা দেখে আনন্দবিহ্বল সমর্থ রামদাস বলে উঠেন, ‘এই ভূমির উদ্ধার হলো। ধর্মের উদ্ধার হলো। আনন্দময় স্বরাজ্যের উদয় হলো।’
শিবাজী মহারাজ নিজের পৌরুষের দ্বারাই হিন্দু সাম্রাজ্য স্থাপন করেছিলেন। সিংহাসনে আরোহণ করার পিছনে শিবাজীর ক্ষমতা লিপ্সা ছিল না। তিনি রাজ্যের প্রতি অনাসক্ত ছিলেন। একসময় রাজ্য ছেড়ে তুকারামের সঙ্গে হরিসংকীর্তনে সমস্ত জীবন উৎসর্গ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। সম্পূর্ণ রাজ্য তো তিনি গুরুদক্ষিণা রূপে গুরু রামদাসের চরণে উৎসর্গ করেছিলেন।
শিবাজী মহারাজ যুগপুরুষ ছিলেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিকে অনুকূল পরিস্থিতিতে রূপান্তরিত করেছিলেন। হিন্দু সমাজে নব চৈতন্য সঞ্চার করেছিলেন। হিন্দু সমাজের নৈরাশ্য দূর করেছিলেন। হিন্দু সমাজকে
হীনম্মন্যতা ও আত্মগ্লানি থেকে মুক্ত করেছিলেন। ইসলামি শাসনের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। হিন্দুধর্ম, সংস্কৃতি, গোমাতা, ব্রাহ্মণ, মা- ভগিনীর রক্ষার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
শিবাজী মহারাজের এক সফল ও আদর্শ শাসক ছিলেন। তাঁর সাম্রাজ্যে প্রজারা সন্তুষ্ট ছিল। আধুনিক ভারতে যে কয়েকজন শাসক প্রজা কল্যাণকারী শাসন ব্যবস্থা প্রণয়ন করে সুশাসনের আদর্শ উদাহরণ স্থাপন করতে সমর্থ হয়েছিলেন তাদের মধ্যে নিঃসন্দেহে শিবাজী মহারাজ অন্যতম। মুঘল সাশনের বিরুদ্ধে সেই সময়ে মান-ধন রক্ষা করাই যেখানে দেশিয় রাজাদাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল, সেখানে অতি সুন্দর শক্তিশালী শাসন ব্যবস্থা প্রণয়ন সত্যিই আশ্চর্যের। কিন্তু শিবাজী মহারাজ তা করে দেখিয়েছেন। একদিকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রাজ্য রক্ষা, অন্যদিকে প্রজার কল্যাণ সাধন; এই দুইকেই দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন তিনি।
তাঁর জীবন ধর্মনিষ্ঠ ছিল কিন্তু অন্ধবিশ্বাস পূর্ণ ছিল না। তিনি লোকসংগ্রহী ছিলেন কিন্তু অনাবশ্যক তুষ্টীকরণ নীতিতে বিশ্বাস ছিল না। কর্তব্যে কঠোর ছিলেন কিন্তু ক্রুর ছিলেন না। অত্যন্ত কুশল যোদ্ধা ছিলেন। নিজের ছোটো সেনাদল দ্বারা শত্রুপক্ষের বড়ো সেনাদলকে ধ্বংস করার কৌশল তার জানা ছিল। তিনি গেরিলা যুদ্ধের জনক ছিলেন।
পরাধীন ভারতে স্বাধীনতা যুদ্ধে অনেক দেশভক্ত শিবাজী মহারাজের জীবন থেকে প্রেরণা পেয়েছেন। নেতাজী সুভাষচন্দ্রের জীবনও তাঁর জীবন দ্বারা প্রভাবিত ছিল। নেতাজী বলেছেন- ‘ভারতীয়দের সামনে স্বাধীনতা যুদ্ধে সফলতা লাভের জন্য শিবাজীর মহারাজের উদাহরণ রাখা উচিত।’ ‘অভিনব ভারত’ দলের সদস্যরা শিবাজী মহারাজের চিত্রের সামনে শপথ নিতেন। শিবাজী মহারাজের শ্রেষ্ঠত্ব সম্বন্ধে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের তৃতীয় সরসঙ্ঘচালক শ্রীবালাসাহেব দেওরস বলেছেন, ‘শিবাজী মহারাজের শ্রেষ্ঠত্ব কেবল যুদ্ধে নেতৃত্ব দানের মধ্যেই সীমিত ছিল না। সারাটা জীবন যুদ্ধক্ষেত্রে কাটানো সত্ত্বেও তাঁর প্রশাসনিক ব্যবস্থা এত সুষ্ঠু ও সুন্দর ছিল যে তা ভাবতেও অবাক লাগে। ব্যবসা, বাণিজ্য, কৃষি, রাজস্ব আদায় প্রভৃতি সব ব্যাপারেই ছিল সুব্যবস্থা। এমনকী দেশের উন্নয়নের জন্য অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কথা পর্যন্ত তিনি বলেছিলেন। হিন্দু জীবনাদর্শে রাজার যে আসন ও মর্যাদা চিহ্নিত আছে সব কষ্টিপাথরে বিচার করলেও তিনি ছিলেন আদর্শ রাজা। তাঁর রাজ্যে প্রজার উপর কোনো উৎপীড়ন ছিল না।’ শিবাজী মহারাজের সাম্রাজ্যের শক্তির মূল উৎস ছিল বিভিন্ন মরাঠা সেনাপতিদের নিয়ে গঠিত মারাঠারাজ্য সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠা। আচার্য যদুনাথ সরকারের মতে, ‘শিবাজী পরমাণুর মতো বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত মরাঠা জাতিকে একটি শক্তিমান জাতিতে রূপান্তরিত করেছিলেন এবং তিনিই আধুনিক আত্মসচেতন হিন্দু জাতির পূর্ণ অতিব্যক্তি লাভের দীক্ষাদাতা।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘শিবাজী উৎসব’ কবিতায় বলেছেন- “এক ধর্ম-রাজ্যপাশে খণ্ড-ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত ভারত বেঁধে দিব আমি” “…একধর্ম-রাজ্য হবে এ ভারতে’ এ মহাবচন করিব সম্বল।”
সমগ্র ভারতবাসীর নিকট প্রণম্য লোকমাতা অহল্যাবাঈ
সুতপা বসাক ভড়
মহারানি অহল্যাবাঈ দ্বারা বিভিন্ন মন্দির, ঘাট, ধর্মশালা নির্মাণ, জীর্ণোদ্ধার এবং সংরক্ষণ কার্যের রাষ্ট্রীয় মাহাত্ম্য অনস্বীকার্য। নিজ প্রজাদের কল্যাণার্থে তিনি এইসকল ধর্মকাজের জন্য বিশাল পরিমাণ অর্ধরাশি সমর্পণ করেন, যা তাঁর দূরদৃষ্টির পরিচায়ক। এইসকল দানের জন্য একজন দক্ষ প্রশাসক থেকে লোকমাতারূপে ভারতবাসী তাঁকে হৃদয়াসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি ভারতবর্ষের সাতটি শহর (অযোধ্যা, কাশী, মথুরা কাঞ্চী, হরিদ্বার, উজ্জয়িনী ও দ্বারকা) এবং চারটি কোণায় বদ্রীনাথ থেকে রামেশ্বরম এবং সোমনাথ থেকে পুরী পর্যন্ত ধর্মার্থে বহু কাজ করেছেন। যেহেতু হোলকর পরিবারের ইষ্টদেব শিব, সেজন্য অহল্যাবাঈয়ের অধিকাংশ দান বিভিন্ন শিবমন্দিরে সমর্পণ করা হয়েছে। নিজ রাজ্যের সীমানার বাইরেও ভারতবর্ষের বহু স্থানে বাওরি, ধর্মশালা ইত্যাদি নির্মাণ করেছেন। মন্দিরে বিদ্বান পণ্ডিতদের নিযুক্ত করেছেন। সমগ্র ভারতবর্ষকে একসূত্রে বাঁধার জন্য আদি শঙ্করাচার্য চার ধাম স্থাপন করেন। এই চার ধামের জীর্ণোদ্ধার করেন রানি। অহল্যাবাঈ।
ঔরঙ্গজেব কাশী বিশ্বনাথ মন্দির ধ্বংস করে। ১০৮ বছর পরে ১৭৭৭সালে রানি অহল্যাবাঈ শিবরাত্রির দিন মন্দির পুনর্নির্মাণের সংকল্প নেন। এর তিন বছর পরে মহাশিবরাত্রির দিনই মন্দিরের নির্মাণকার্য সম্পূর্ণ হয় এবং শিবলিঙ্গে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করা হয়। দ্বাদশ থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত তিনবার সোমনাথ মন্দির ভেঙেছে ইসলামি আক্রমণে। অহল্যাবাঈ এই মন্দিরের জীর্ণোদ্ধার করেন। সম্পূর্ণ মন্দির পরিসর পুনর্নির্মাণ করেন। সিংহদ্বার ও দালান নির্মাণ করেন।
ওঙ্কারেশ্বরে বেশ কিছু বৌরি বা কূপ তৈরি করে দেন এবং মহাদেবের নিত্যপূজার সুব্যবস্থা করেন। মালেশ্বর মন্দিরের জীর্ণোদ্ধার করান। নাসিকে রামমন্দির নির্মাণ করান, অযোধ্যায় রামমন্দির, সীতারাম মন্দির, ভৈরব মন্দির, নাগেশ্বর মন্দির এবং আরও অনেক মন্দির নির্মাণ করান। উজ্জয়িনীতে চিন্তামণি গণপতি মন্দির, জনার্দন মন্দির, লীলা পুরুষোত্তম বালাজী মন্দির-ঘাট, কুণ্ড, ধর্মশালা, বৌরি নির্মাণ করান। অন্ধ্রপ্রদেশে শ্রীশৈলম্ এবং মহারাষ্ট্রের পারলী বৈজনাথ জ্যোতির্লিঙ্গের সংস্কার করান।
হণ্ডিয়া, পৈঠন এবং আরও অনেক স্থানে যাত্রীদের বিশ্রামের জন্য সরাইখানা নির্মাণ করেন। মধ্যপ্রদেশের ধারে অবস্থিত চিকলদাতে নর্মদা পরিক্রম করতে আসা ভক্তদের জন্য ভোজনালয় স্থাপনা করেন। শূলপাণেশ্বরে মহাদেবের একটি বিশাল মন্দির এবং ভোজনালয় নির্মাণ
করান। মধ্যপ্রদেশের খরগোনে মণ্ডলেশ্বরে মন্দির এবং বিশ্রামগৃহ নির্মাণ করান। নীলকণ্ঠ মহাদেবের মন্দির স্থাপন করেন মাণ্ডুতে। নাথদ্বারাতে মন্দির, ধর্মশালা, কুয়ো, কুণ্ড বানিয়ে দেন চিত্রকূট, ঋষিকেশ, পণ্ডরপুরে শ্রীরামমন্দির, এ্যম্বকেশ্বরে একটি সুন্দর জলাশয়, দুটি ছোটো ছোটো মন্দির নির্মাণ করান এবং সেখানে রুপোর তৈরি মহাদেবের মুখাবয়ব নির্মাণ করেন, সেখানে শ্রীরাম, সীতা, লক্ষ্মণ, শ্রীহনুমানজীর মূর্তিও স্থাপন করেন। কলকাতা থেকে কাশী পর্যন্ত একটি পথ নির্মাণ করেন, যা অহল্যাবাঈ রোড নামে পরিচিত। এছাড়া গ্রীষ্মকালে বিভিন্ন স্থানে জলসত্র স্থাপন এবং শীতকালে কম্বল বিতরণ করেন। নিজ জন্মভূমিতেও একটি শিবালয় ও ঘাট নির্মাণ করেন, যা অহলোম্বর নামে খ্যাত। পশ্চিমক্ষেত্রে রাজওয়াড়ার ভেতরে রাজবংশের কুলদেবতা মলহারী মার্তণ্ড মন্দিরে ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গ স্থাপন করেন। এটি মধ্যপ্রদেশের একমাত্র মন্দির, সেখানে তাঁর স্বহস্তে স্থাপিত ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গ আজও বিদ্যমান।
একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে, তিনি কেবলমাত্র মন্দির নির্মাণ বা জীর্ণোদ্ধার করেননি; তীর্থযাত্রীদের জন্য বিভিন্ন স্থানে সরাইখানা, আশ্রম, কুয়ো, ঘাট, পুল, পথ, অন্নসত্র ইত্যাদিও নির্মাণ করেন। এইভাবে তীর্থযাত্রা সুগম হয়ে ওঠে। যেসকল তীর্থযাত্রা বিভিন্ন কারণে দুর্গম ছিল, সেগুলি লোকমাতা অহল্যাবাঈ হোলকরের পুণ্যস্পর্শে আবার শুরু হয়। এর প্রভাবে তীর্থযাত্রীরা দেশের সঙ্গে একাত্মবোধ করতে থাকেন। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ তীর্থভ্রমণে বেরিয়ে সমগ্র ভারতদর্শন ও অনুভব করতে পারতেন। তীর্থযাত্রীরা ওইসকল স্থানে যে রাশি দান করতেন, সেগুলির হিসাব রাখা হতো এবং পুনরায় মন্দির ও তীর্থক্ষেত্রগুলির রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় করা হতো। এভাবে মন্দির ও তীর্থক্ষেত্রগুলির রক্ষণাবেক্ষণে ভারতবাসীদের অংশগ্রহণ থাকে, এমন ব্যবস্থা করেন। লোকমাতা অহল্যাবাঈ হোলকর অতি সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বিবাহসূত্রে হোলকরবংশের রাজরানি, শাসিকা হয়েও স্বধর্ম পালনে অবিচল ছিলেন। আজন্ম শিবসাধিকা ছিলেন তিনি। ব্যক্তিগত জীবনে অনেক আঘাত সহ্য করে, নিজ কর্তব্যে ছিলেন অটল। একজন নারী হয়েও তৎকালীন সমস্যাগুলি সমাধানের সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র ভারতবর্ষকে একসূত্রে বেঁধে রাখার যে প্রচেষ্টা তিনি করেছিলেন, সেজন্য সকল ভারতবাসীর কাছে তিনি প্রণম্য। তাঁর জীবন সকল মহিলাদের জন্য অনুসরণযোগ্য।

















