রামসুন্দর বসাকের বাল্যশিক্ষা শিশুশিক্ষা উপযোগী পুস্তক
সুতপা বসাক ভড়
বাল্যশিক্ষা বলতে আমরা বুঝি বাল্যকালে যে শিক্ষা গ্রহণ করা হয়। শিশুমন হলো মাটির তাল। তাকে যেমন ছাঁচে ঢালা হবে, তেমনই সৃষ্টি হবে। সুতরাং
সেই শিশুদের শিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের বিশেষ যত্নশীল হতে হবে এমনটাই কাম্য। আমাদের প্রথম পাঠ্যপুস্তকটি আমাদের জীবনের পথ অনেকাংশে নির্দিষ্ট
করে দিতে সক্ষম। সমগ্র জীবনে আমরা অনেক বইপত্র পাঠ করে থাকি, বর্তমানে প্রযুক্তির সাহায্যে বিভিন্ন মাধ্যমের দ্বারা অনেক কিছু সম্পর্কে অবহিত হই, কিন্তু প্রথম পাঠ্যপুস্তকটি মন ও মস্তিষ্কের বিশেষ দাগ কেটে যায়। এই প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের একটি উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে- ‘জাতির সমগ্র লৌকিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার ব্যবস্থা আমাদের নিজেদের হাতে রাখিতে হইবে এবং যতদূর সম্ভব ইহা জাতীয় ধারায় এবং জাতীয় প্রণালীতে নিয়ন্ত্রিত করিতে হইবে।’ (ভারত কল্যাণ পৃ. ৫০-৫১)
রামসুন্দর বসাকের লেখা এমন একটি বহুল প্রচলিত আদি শিশুপাঠ্য- ‘বাল্যশিক্ষা’। বর্তমানে পুস্তকটি প্রাপ্তিস্থান: সীতানাথ আদর্শ লাইব্রেরী, ৪২বি, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০৯; (কলেজস্ট্রিট)। মূল্য: পঁচিশ টাকা। এই গ্রন্থটি ইংরেজি ১৮৪৭ সালের ২০ আইন অনুসারে রেজিস্ট্রি করা হয়েছে এবং এটির সকলে স্বত্ব গ্রন্থকার কর্তৃক সংরক্ষিত।
গ্রন্থটিতে প্রথমদিকে স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণের পরিচয়, পরীক্ষা ইত্যাদি আছে। এখানে আছে অর্থপূর্ণ বর্ণযোজনা, স্বরবর্ণ যোজনা, সংযুক্ত কতিপয় বর্ণের আকার পরিবর্তন, সংযুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণের উদাহরণ ইত্যাদি। যুক্তাক্ষরের শিক্ষা এবং প্রয়োগ অসাধারণ। বাক্যগুলি শিক্ষণীয় ও বাত্ময়। সরল বাক্যগুলির মাধ্যমে অতি উচ্চমানের নীতিশিক্ষা প্রদান করা হয়েছে। এখানে আছে ছোটোদের মতো করে রামায়ণ, মহাভারত। আছে পশুর নাম, শস্যের নাম, বৃক্ষের নাম, ফুলের নাম, পক্ষীর নাম, বস্তুর নাম, মাছের নাম, বাদ্যযন্ত্র, ফলের নাম, রস, রং, দশদিক। বঙ্গের সাতবার, বাঙ্গালির বারোমাস, ছয় ঋতু, তিথি ও পক্ষ, পাঁচ ইন্দ্রিয়, ধাতু, গ্রহণ আদি। এছাড়াও আছে শিক্ষামূলক কবিতা ও গত্য। এমনকী, মুসলমান ও খ্রিস্টানদের সাতবার, বারোমাস ইত্যাদিরও উল্লেখ করেছেন আমাদের জ্ঞাতার্থে।
এছাড়া, মাত্র নয়টি পঙ্ক্তিতে শিশুদের মতো করে রামায়ণ এবং মাত্র সাতটি পঙ্ক্তিতে অতি সহজ অথচ প্রাঞ্জল, ছোটো ছোটো রাজ্যের মাধ্যমে মহাভারত বর্ণিত হয়েছে রামসুন্দর বসাকের লেখা বাল্যশিক্ষাতে। মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ইংরেজি ৩/১/১৮১৭- ১/৩/১৮৫৮ সালের মধ্যে লেখা কবিতাটি- ‘প্রভাত বর্ণনা’ স্থান পেয়েছে এখানে।
আমরা অনেকেই বাংলাভাষা ও বাঙ্গালি হবার জন্য আত্মাভিমান করে থাকি, অথচ এখনো পর্যন্ত অসম, ত্রিপুরা, তৎকালীন পূর্ববঙ্গ (বর্তমানে বাংলাদেশে) বহুল প্রচলিত এই আকর গ্রন্থখানি সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের অনেক মানুষ অবহিত নন। অসম, ত্রিপুরাতে এখনও শিশুদের প্রথম পাঠ্যপুস্তক রূপে এটি স্বীকৃত। গ্রন্থটির মূল পাঠ্য বিষয় মাত্র চল্লিশ পৃষ্ঠার মধ্যে নিহিত হলেও এরা বিষয়বস্তু অতি গভীর। যেকোনো বয়সের বাংলা ভাষাভাষীরা এটি পাঠ করে ঋদ্ধ হবেন, একথা নিশ্চিত করে বলা যায়। প্রত্যেক গৃহের জন্য এটি একটি সংরক্ষণযোগ্য পুস্তক। আমরা জানি সন্তানের প্রথম শিক্ষক হলেন ‘মা’। সেজন্য মায়েরা যেন অবশ্যই এটি সংগ্রহ করে নেন। তবে ‘অনলাইন’ ক্রয় করা থেকে তাদের মতো করে এটি প্রকাশ করেছে। ইসলামি বাল্যশিক্ষা নামেও একটি পুস্তক বাজারে পাওয়া যাচ্ছে, যা মূল গ্রন্থের পরিপন্থী।
আগরতলা ত্রিপুরা নিবাসী ড. জগদীশ গণচৌধুরীর (বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, গবেষক, সমাজসেবী এবং অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, বিবিই কলেজ,
আগরতলা) বিশেষ পথনির্দেশে শ্রীরামসুন্দর বসাক কৃত আদি শিশু-পাঠ্য ‘বাল্যশিক্ষা’ গ্রন্থপরিচয় প্রস্তুত করার প্রচেষ্টা করা হলো। আশা করি আদর্শ শিশুপাঠ্য রূপে এটি আমাদের প্রত্যেকের গৃহের পুস্তক ভাণ্ডারের নিজগুণে স্থান করে নেবে।

















