মন্বন্তর ও ভারত কেশরী শ্যামাপ্রসাদ
ড. বাপ্পাদিত্য মাইতি
‘এসেছে বন্যা এসেছে মৃত্যু/পরে যুদ্ধের ঝড়/মন্বন্তর রেখে গেছে তার পথে পথে স্বাক্ষর/ প্রতি মুহূর্তে বুঝেছি এবার মুছে নেবে ইতিহাস’- লিখেছিলেন সুকান্ত। গভীর যন্ত্রণা ও শঙ্কায়। পটভূমিতে ১৯৪৩-এর মন্বন্তর। ১৯৪৩-এর ১৬ অক্টোবর প্রবল ঝড়ের ফলে সমুদ্র উপকূলবর্তী বঙ্গে যে ভয়াবহ বন্যা হয় তার ফলে হলো মন্বন্তর। বাংলা ১৩৫০ সালে ঘটা এ মহা দুর্ভিক্ষ পঞ্চাশের মন্বন্তর নামেও পরিচিত। এই প্রাকৃতিক দুর্বিপাকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত
হয় মেদিনীপুর। আবার ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের পীঠস্থান হওয়ায় ‘বঙ্গের হলদিঘাট’ মেদিনীপুরকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিল ইংরেজ প্রশাসন। ফলস্বরূপ বন্যা, অনাহার, অসুখে সারা বঙ্গে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। সরকার কালোবাজারি রুখতে ছিল অনিচ্ছুক। ত্রাণ পাঠানোরও ব্যবস্থা করেনি। যতটা সম্ভব মহামারীর নিদারুণ বিপর্যয়কে চেপে রাখার অপচেষ্টা দেখা দেয়। এই মন্বন্তর যতটা না প্রকৃতির দুন্দুভি নিনাদে হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি
সরকারি অবহেলা, অসহযোগিতা ও মানবিক সত্তার অপমৃত্যুর জন্য হয়। ১৯৪৪-এর ২৩ সেপ্টেম্বর স্টেটসম্যান-এ লেখা হলো-
“This sickening catastrophe is man-made so far as we are aware, all of India’s previous famines originated primarily from calamities of nature. But this one is ac- counted for by no climines originated primarily from calmities of nature. But this one is accounted for by no climatic failure, rainfall has been generally plentiful… loss of impots from Burma is a big factor no doubt the rapid growth of population and sudden influx of very large number of men might have caused internal stresses but they are like a drop in the ocean… the largest factor has outstanding been a shameful lack of fore night and planning capacity of India’s own civil govenment cen- tral provincial.”
নেতাজী সুভাষচন্দ্র ভারত আক্রমণ করতে পারেন ভেবে ব্রিটিশ সরকার পোড়া মাটির নীতি নিয়ে অনেক জায়গায় ফসল পুড়িয়ে দেয়। নৌকা ও সাইকেল বাজেয়াপ্ত করে। প্রাদেশিক সরকারের প্রধান ফজলুল হক সঠিক পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হচ্ছিলেন। কংগ্রেসও ভাষণ দান আধ্যাত্মিক অসহযোগের নাটকে আবর্তিত হচ্ছিল। কমিউনিস্ট পার্টি শ্রেণি সংগ্রাম, পুঁজিবাদের নিপাতে যে মৌখিক আস্ফালন করছিল তার সামান্যতমও ত্রাণকাজে ব্যয় করেনি। বঙ্গের এই চরম দুঃসময়ে এগিয়ে এসেছিলেন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। মুসলিম লিগ মন্ত্রীসভা স্বজাতির ব্যবসায়িক স্বার্থ দেখতে যতটা ব্যস্ত ছিল গরিব মুসলমানের প্রতি তার কানাকড়িও ছিল না। এর পরও যেটুকু ত্রাণের ব্যবস্থা প্রাদেশিক সরকার করেছিল তার বেশিরভাগই মুসলমানদের জন্য। শ্যামাপ্রসাদ এ সময়
অসহায়দের রক্ষা করতে ত্রাতার ভূমিকা নিলেন। গঠন করলেন বেঙ্গল রিলিফ কমিটি। তিনি হিন্দু মহাসভার অবিংশবাদী নেতা হয়েও কোথাও এই সংগঠনের নাম ব্যবহার করেননি। তা সত্ত্বেও ব্রিটিশ গোয়েন্দা রিপোর্টে লেখা হলো- ‘The only party that stood out to view and Thar the problem of famine on humani- tarian ground and keep it beyond the preview of politi- cal gain was the Bengal Hindu Mahasabha in the person of Dr. Shyamaprasad Mukherjee.’
হিন্দু মহাসভা যখন সরাসরি ত্রাণকাজে হাত লাগিয়েছে তখন শুধু বেঙ্গল রিলিফ কমিটি কেন? জনমতকে সম্মান দিয়ে বেঙ্গল রিলিফ কমিটির নাম পালটে হলো হিন্দু মহাসভা রিলিফ কমিটি। ভয়াবহ এই বিপর্যয়ে ত্রাণের জন্য লিগ মন্ত্রীসভা যেটুকু সাহায্য করছে তার সিংহভাগ মুসলমানদের জন্য। ভারতকেশরী
শ্যামাপ্রসাদ দেশবাসীর কাছে সাহায্যের আবেদন করলেন। তাঁর মতো দূরদর্শী জননায়কের আহ্বানে সাড়া দিল গোটা দেশ। বিপুল ত্রাণ সামগ্রী এসে পৌঁছল। ১৯৪৪-এর ৩০ জুন পর্যন্ত হিন্দু মহাসভার রিলিফ ফান্ডে জমা পড়ে ৮,৫৪,৬৪২ টাকা। চাল ও ডাল মিলিয়ে ৩৫,৬৭৬ মন সংগৃহীত হয়। প্রাপ্ত টাকার থেকে ৭,০৭,১৮৬ টাকা চাল ডাল কিনতে, ৭০,৪৩৪ টাকা কাপড় ও কম্বল কিনতে, ৯,৪৪০ টাকা সুতা কিনতে এবং বাকি ১৬০০০ টাকা ওষুধপত্র কিনতে ব্যয় হয়। ২৪ জেলার ২২৭টি ত্রাণ কেন্দ্র থেকে গড়ে প্রতিদিন ১,৯৭,৭২৭ জন দুর্ভিক্ষ পীড়িতকে সাহায্য দেওয়া হয়। এই ত্রাণকেন্দ্রগুলি থেকে ১৬,৬৪০টি ধুতি, ১০, ৫৮৩টি শাড়ী, ৩,৯২৪টি গেঞ্জি এবং ৯, ৭৮৯টি বাচ্চাদের পোশাক বিতরিত হয়। হিন্দু মহাসভা যখন এমন ত্রাণকার্যে আত্মনিয়োজিত তখন মিত্র বাহিনীর সৈন্যদের সাহায্যের জন্য কমিউনিস্ট পার্টি বড্ড ব্যস্ত ছিল।
শ্যামাপ্রসাদ নিজের ধর্ম, ঐতিহ্যকে তিলমাত্রও ভুলে যায়নি। দুর্ভিক্ষ যখন করাল রূপ নিয়েছে তখন অসহায় হিন্দু বালক-বালিকাদের ত্রাণ দেওয়ার নাম করে
খাকসার পাটি ধর্মান্তরণে ব্যস্ত হয়। ঠিক যেমন খ্রিস্টান মিশনারিরা জনজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে করতে চায়। এই ধর্মান্তরণ স্বভাবতই মানুষকে উত্তেজিত করে। আবার প্রতিবাদী রক্ষাকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন ভারত কেশরী। তাঁর প্রবল প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের কারণে সরকার খাকসার পার্টিকে ত্রাণ দিতে অস্বীকার করে।
দুর্গত পীড়িত মানুষদের একেবারে সামনে থেকে দেখেছেন শ্যামাপ্রসাদ। ত্রাণ দিয়েছেন সামনে দাঁড়িয়েই। বঙ্গের শাসনকর্তা জন হারবার্ট অসুস্থ হয়ে ছুটিতে
গেলে স্যার টমাস রাদারফোর্ড কার্যভার গ্রহণ করেন। ১৯৪৭-এর ১৭ সেপ্টেম্বর তাঁকে ড. মুখার্জী যে চিঠি দেন তাতে স্বাধীনতাপন্থী শ্যামাপ্রসাদকে পাওয়া যায়- ‘আমাদের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ হলো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া সমস্যার সমাধান হবে না।’
এই সময় তিনি লেখেন ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ নামে বিখ্যাত বই। বই তো নয়, সম সময়ের প্রামাণ্য দলিল। ওই গ্রন্থের ‘প্রতিকারের উপায়’ রচনায় দুর্ভিক্ষ ও তার থেকে মুক্তি সম্পর্কে লেখেন- ‘পশ্চিমবঙ্গকে বাঁচাইতে হইলে রাজ্যের পাঁচ হাজার ইউনিয়ন বোর্ড এবং এক হাজার মিউনিসিপ্যালিটি কেন্দ্রে অবিলম্বে চাউল খাদ্যবস্তু পাঠাইতে হইবে। রাষ্ট্রীয় পরাধীনতার জন্যই তো ভারতবর্ষের এই দুরবস্থা এবং সেই কারণেই বঙ্গ আজ দুর্গতির চরম সীমায় পৌঁছাইয়াছে।’
পশ্চিমবঙ্গের দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষদের এক বড়ো অংশ কলকাতায় আসে একটু ভাতের ফ্যানের আশায়। অসহায় মানুষদের বেঁচে থাকার দাবিতে শ্যামাপ্রসাদ বিক্ষোভের আয়োজন করেন ১৯৪৪ সালের ২০ ও ২৪ সেপ্টেম্বর। এই বিক্ষোভের ফলে বৃহত্তর ভারতে দুর্ভিক্ষ পীড়িতদের জন্য জনমত গড়ে ওঠে এবং ব্রিটিশ সরকারের অমানবিক মনোভাবও জনসমক্ষে স্পষ্ট হয়। এ প্রসঙ্গে ‘প্রতিকারের উপায়’ প্রবন্ধে শ্যামাপ্রসাদ বলেন- ‘গভর্নমেন্টের তরফ হইতে আজ
অবধি খুব যে বেশি কাজ হইয়াছে তাহা নয়। তবে এ লাভ লইয়াছে, সারা বিশ্বের কাছে কর্তৃপক্ষকে অবিরত জবাবদিহি করিতে হইতেছে। জনগণকে শাসন করিবার যাহারা দাবি রাখেন, জনগণের জীবন রক্ষার দায়িত্ব হইতে তাঁহারা কিছুতেই অব্যাহতি পাইবেন না।’
মূলত শ্যামাপ্রসাদের প্রচেষ্টার কারণে ব্রিটিশ সরকার ইন্ডিয়ান ফেমিন কমিশন গঠনে বাধ্য হয়। ১৯৪৫-এর ১০ এপ্রিল কমিশন তার রিপোর্টে স্বীকার করতে বাধ্য হয় পঞ্চাশের মন্বন্তরের প্রতিকারে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শ্যামাপ্রসাদ তাঁর ব্যক্তিত্বের ও দূরদর্শিতার কারণে বঙ্গের অতি উজ্জ্বল এক নেতা। শ্যামাপ্রসাদের কথা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণের জন্য পণ্ডিত হৃদয়নাথ কুঞ্জ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ইত্যাদি স্থানে যান। তাঁর কথায় ‘বঙ্গের নেতারা যাহা বলিয়াছেন, তাহার প্রতিটি বর্ণই সত্য। বঙ্গের এই নেতাদের মধ্যে তখন শ্যামাপ্রসাদ সর্বাগ্রগণ্য।’
শ্যামাপ্রসাদ পরবর্তীকালে হিন্দু প্রধান পশ্চিমবঙ্গকে পূর্ব পাকিস্তানের বিষাক্ত কবল থেকে রক্ষা করেছিলেন। তাঁকে ‘সাম্প্রদায়িক’ তকমা দিতে বামদলগুলোর প্রচেষ্টার শেষ নেই। অথচ শ্যামাপ্রসাদ মন্বন্তরের সময় জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সবাইকে ত্রাণ দিয়েছিলেন। লিগ মন্ত্রীসভার মতো শুধু মুসলমান এলাকায় ত্রাণ বিলি করেননি। তাই লিগ মন্ত্রীসভাও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল ড. মুখার্জি না থাকলে বঙ্গের লক্ষ লক্ষ মুসলমান মন্বন্তরে মারা যেতেন। কমিউনিস্টরা লিগ মন্ত্রীসভার সঙ্গে সজোরে দাবি করতে থাকে পশ্চিমবঙ্গে অভাব নেই এবং অবস্থা খুব শোচনীয় নয়। এমনকী বেসরকারি ত্রাণ কমিটিগুলি যাতে মুসলিম লিগের সাহায্য পুষ্ট কমিটির সঙ্গে ত্রাণ দিতে না পারে সেজন্যও কমিউনিস্টরা অতি সক্রিয় হয়। আসল লক্ষ্য ছিল শ্যামাপ্রসাদকে আটকানো। তাতে মন্বন্তরের শিকার হওয়া মানুষদের কিছু হলেও যায় আসে না।
কিন্তু ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি সর্বভারতীয় নেতা। মন্বন্তরের সময় তাঁর সাহায্যের আবেদন গোটা দেশে অভূতপূর্ব ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। ব্রিটিশ সরকারের রিপোর্টেও বলা হয় সে সময় কংগ্রেস ‘did little’ এবং হিন্দু মহাসভা ‘did much’। আর ড. মুখার্জি’ সম্পর্কে শ্রদ্ধায় ব্যক্ত হয়- ‘Dr. Shyamaprasad Mukherjee is perhaps the one man who is working for the relief of the distress without sparing himself the leant bit. ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ভারত গৌরব। শিক্ষা, রাজনীতি, সমাজনীতি সবক্ষেত্রেই মানবিক ও দূরদর্শী ছিলেন বলে আক্ষরিক অর্থে হয়ে উঠেছিলেন ‘ভারতকেশরী’। পঞ্চাশের মন্বন্তরে এই ভারতকেশরী যে মানবিক ভূমিকা পালন করেছিলেন তা লক্ষ লক্ষ দুর্ভিক্ষ পড়িত মানুষকে বাঁচাতে সাহায্য করে। শ্যামাপ্রসাদ সে সময় অসহায়দের শেষ আশ্রয়। তাঁদের বেঁচে থাকার ধ্রুবতারা।

















