প্রচুর মামলায় ফতুর
আদালত কন্যাযু দিদি,
‘আদালত ও একটি মেয়ে’ নামে একটা নাটক ছিল। অনেককাল আগের কথা। যতদূর মনে পড়ছে এই নামে একটা সিনেমাও হয়েছিল। তবে তার সঙ্গে আপনার তুলনা করতে চাই না। আদালতের সঙ্গে আপনার সম্পর্কটা শুধুই হেরে যাওয়ার। কত মামলায় যে হেরেছেন দিদি, তা গুণে শেষ করতে পারব না। তবে আমি জানি, আপনি আসলে হারেননি। জিতেছেন। কারণ আপনি জেতার জন্য মামলা করেননি কখনও। সব সময়ে সময় নষ্ট করার জন্য করেছেন। আপনি জানেন, কী করতেই হবে কিন্তু আপনি সব সময়ে চেষ্টা করে যান সেই কাজটার জন্য যতটা সম্ভব সময় কিনতে হবে। কিন্তু দিদি, আমাদের এই গরিব রাজ্যে মাত্র পাঁচ বছরে উকিলদের ফি বাবদ খরচ ৬৫.৪৭ কোটি টাকা কি ঠিক বলুন! সম্প্রতি রাজ্য সরকারের আইন দপ্তরের এই তথ্য সামনে এসেছে। খরচ তো হতেই পারে। সব রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারকেও মামলা লড়ার জন্য খরচ করতে হয়। কিন্তু সেই সব মামলার বেশিটাই হয় মানুষের স্বার্থে। কিন্তু আমাদের রাজ্যে এই ৬৫ কোটি টাকার বেশিটাই খরচ হয়েছে দুর্নীতিবাজদের বাঁচাতে গিয়ে। সেই সঙ্গে আপনার একগুঁয়ে মনোভাবের জন্য। এটা কিন্তু মানতেই হবে দিদি।
২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪, এই পাঁচ অর্থবর্ষ মিলিয়ে ৬৫.৪৭ কোটি টাকা খরচ। অঙ্কটা ভাবুন। ৬৫.৪৭ কোটি টাকা। এই টাকায় রাজ্যে কতগুলো প্রাথমিক স্কুল তৈরি সম্ভব ছিল বলুন তো! তার বদলে স্কুলের জাল শিক্ষকদের বাঁচানোর মামলায় এত্ত টাকা খরচ হয়ে গেল।
আমি যখন তালিকাটা দেখেছি তখন সত্যি বলছি, আমার চোখে জল এসে গিয়েছিল। এই রাজ্যে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীর চাকরি গিয়েছে। এই যে দুর্নীতি, যেখানে স্পষ্ট প্রমাণ টাকার বিনিময়ে অযোগ্যদের সুবিধা পাইয়ে দিয়েছে তৃণমূলের এক দল নেতা। আর সেই নেতাদের বাঁচাতে কোটি কোটি টাকা দিয়ে রাজ্য সরকার আদালতে মামলা লড়েছে। সত্যের জয় হওয়ায় রাজ্য হেরেছে। কিন্তু আমাদের করের টাকার এই ভাবে নয়-ছয় মেনে নেওয়া যায়
না। পশ্চিমবঙ্গের পড়ুয়ারা যোগ্য শিক্ষকদের কাছে পড়তে চায়। এটাই তো শুধু চাওয়া। সেই অধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য রাজ্য সরকার দিল্লির দামি দামি এবং দলেরই নেতা, সাংসদ উকিলদের পকেটে কোটি কোটি টাকা ঢুকিয়েছে। এও কি কম বড়ো দুর্নীতি!
এসব আমি কিন্তু বলছি না দিদি। বলছে, আপনার সমালোচকেরা। তাঁরা এটাও বলছে যে, দুর্নীতি হয়েছে বুঝেও নিয়োগ মামলা থেকে সরকারি কর্মচারীদের হকের দাবি ডিএ নিয়ে অযথা মামলা। কোটি কোটি টাকা খরচ। এসব যাঁরা বলছেন, তাঁরা তো দিদি আপনার মতলবটাই বুঝতে পারেননি। আপনি সময়
কিনে কত যে রাজনৈতিক লাভ করেছেন সেই অঙ্কটা আর কজন বোঝে বলুন!
আদালত শুরুতেই বলে দিয়েছিল ওবিসি তালিকা ঠিক হয়নি, বলে দিয়েছিল প্রাথমিকের নিয়োগে পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি। তবু আপনি গোঁ ধরে সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছেন। মুখ পুড়েছে সব মামলায়। সেই সঙ্গে কোষাগার খালি হয়েছে। কিন্তু কেন! কোন অধিকারে রাজ্যের মানুষের করের টাকা নিয়ে এমন ছেলেখেলা! এসব প্রশ্ন কিন্তু মূর্খ বাঙ্গালিরা করছে দিদি।
আপনি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মামলা আর মামলা। আপনি কিন্তু রেকর্ড করেছেন দেশে। সেটা বিশ্ব রেকর্ডও হতে পারে! ভারত কেন বিশ্বের কোথাও এমনটা আছে যে কোনো বিরোধী দলকে মিটিং, মিছিল করতে হলে আদালতের অনুমতি নিতে হয়! পূজার অনুমতি পেতে মামলা, ধর্মীয় শোভাযাত্রা বার করতে মামলা করতে হয়! বিরোধী দলের রাজনীতিকদের কথায় কথায় মামলা দিয়ে দেওয়া হয়। মুড়ি-মুড়কির মতো মামলা। এই ছেলেখেলার মামলাগুলোয় কত খরচ হয়েছে বলুন তো! হোক দিদি হোক। তবে করে যান। রেকর্ড গড়ে যান।
ভোট পরবর্তী হিংসায় এগিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সরকার রাজ্যের বাসিন্দাদের বিরুদ্ধেই মামলা লড়েছে। এই যে ৬৫ কোটি উকিলের ফি তাতে কিন্তু আরজি কর মামলায় খরচ ধরা নেই। কারণ, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। আরজি কর মামলা শুরুই হয় ২০২৫ সালের আগস্টে।
সেটি যোগ করলে খরচ আনুমানিক ৭৫ থেকে ১০০ কোটি টাকা হয়ে যেতে পারে। উপাচার্য নিয়োগ মামলায় তো আরও মজার ঘটনা। মামলা হয়েছে রাজ্যেরই রাজ্যপালের বিরুদ্ধে। ফলে দুই পক্ষের উকিলের টাকাই সরকারি কোষাগার থেকেই যাচ্ছে। এটাই নিয়ম।
দেখুন দিদি, গত কয়েক বছরে আপনি যা করেছেন তার জন্য বাঙ্গালিকে কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। আদালতে গিয়ে এত মজা দিয়েছেন যে সেটা নিয়ে একটা মজার ওয়েব সিরিজ হয়ে যেতে পারে।

















