পশ্চিমবঙ্গকে রক্ষার দায় কার? শুধু বাঙ্গালি হিন্দুর, নাকি ভারত সরকারেরও?
শিবেন্দ্র ত্রিপাঠী
দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের গল্পটি নিশ্চয় সকলের মনে আছে? হস্তিনাপুরের রাজসভায় দুর্যোধনের অঙ্গুলিহেলনে দুঃশাসন সেদিন পঞ্চপাণ্ডব জায়া দ্রৌপদীর
বস্ত্রহরণ করছিল, তাঁর সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছিল। সে সময় পাঞ্চালীর অমিত বিক্রম পঞ্চস্বামী কী করছিলেন? রাজসভায় উপস্থিত রাজা ধৃতরাষ্ট্র, আমৃত্যু প্রতিজ্ঞা রক্ষায় স্থিতপ্রজ্ঞ পিতামহ ভীষ্ম, অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্য, বীরশ্রেষ্ঠ কৃপাচার্য প্রভৃতি বয়োেজ্যষ্ঠদের ভূমিকা সেদিন কী ছিল? কৌরব পরিবারে দাসীপুত্র বিদুর আর কর্তৃত্বহীন মধ্যমপাণ্ডব ভীম ছাড়া কেউ এর তীব্র প্রতিবাদ করেননি। বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ সেদিন অদৃশ্য থেকে বস্ত্র না জোগালে দ্রৌপদীর নারীত্ব, সম্ভ্রম সবই ভুলুণ্ঠিত হয়ে যেত কুরু রাজসভায়।
আজ পশ্চিমবঙ্গের ঘটনা প্রবাহ কি মহাভারতের সেই ঘটনাকে পুনঃস্মরণ করিয়ে দিচ্ছে না? বিগত প্রায় দেড় দশক ধরে এই রাজ্যের এক মহিলা মুখ্যমন্ত্রী- দুর্যোধনের অঙ্গুলিহেলনে দুধেলগাই-সম দুঃশাসনের দল নিত্যপ্রতিদিন যেভাবে বঙ্গজননীর বস্ত্রহরণ করে চলেছে তা কি কেউ চাক্ষুষ করছে না? সেদিন যেমনভাবে ধৃতরাষ্ট্র ছিলেন নিশ্চুপ, ভীষ্ম-দ্রোণাচার্য কৃপাচার্য সকলে বসে বসে অসহায় দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ দেখছিলেন, কেউ তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেননি, দুর্যোধনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেননি, ঠিক তেমনিভাবে আজ বঙ্গজননীর সম্ভ্রম রক্ষার দায়িত্ব যাদের হাতে তাঁরা আজ সকলে নিশ্চুপ।
ক্যানিং, কালিয়াচক, নৈহাটি, চাঁচোল, ধুলাগড়, বাদুড়িয়া, আসানসোল, তেলনিপাড়া, মোমিনপুর, বেলডাঙ্গা, ইকবালপুর, শ্যামপুর, সামশেরগঞ্জ,
মহেশতলা, গারুলিয়া, সন্দেশখালি- কত কত কত, আরও কত- হিন্দু নিগ্রহের এই তালিকা শেষ হওয়ার নয়। সব জায়গাতে একই প্যাটার্ন- অত্যাচারিত হিন্দু, আর অত্যাচারী সেই দুধেল গাই সম্প্রদায়ের মুখ্যমন্ত্রীর লোকেরা। এ বছর থেকে আবার এক নতুন খেলা শুরু হয়েছে। দুর্গাপূজার প্যান্ডেলে লাগানো হয়েছে আজানের সময়সূচি। ফজর, যোহর, আসর, মাগরিব, ইশা- এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় প্রিন্ট করে প্যান্ডেলে ঝুলিয়ে বলা হয়েছে এ সময়গুলিতে দুর্গা প্যান্ডেলে চণ্ডীপাঠ, মন্ত্র, ঘণ্টা, ঢাকের বাদ্যি এগুলি বাজানো যাবে না। একেবারে বাংলাদেশের কপি পেস্ট। দিনের পর দিন পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুর বাঁচা যেন অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ২০২১-এর নির্বাচন পরবর্তী হিংসায় বেছে বেছে হিন্দু গ্রামগুলি হয়েছিল আক্রমণের শিকার। কত হিন্দুর ঘর পুড়েছিল, কত মা-বোন ধর্ষিতা হয়েছিল। ১৪৯ জন বিজেপি কর্মীর প্রাণ চলে গিয়েছিল তার হিসেব হয়তো পুলিশের খাতায় ঠিকঠাক লেখা হয়ে ওঠেনি, কিন্তু হিন্দু বাঙ্গালি সে ঘটনা আজও ভুলতে পারেনি। সামনেই ২০২৬। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আবার একটি বিধানসভা ভোট। এই নির্বাচন বাঙ্গালির কাছে সৌভাগ্য
পরিবর্তনের ভোর আনবে, নাকি বাঙ্গালি হিন্দুর জীবনে আরও একটি বিভীষিকাময় রাত এনে দেবে, সেটা সময়ই বলবে। তবে ভোরের আলো ফোটার আগে পুব আকাশের রং যেমন বলে দেয় দিন কেমন যাবে, সে রকম নির্বাচনের সাত আট মাস আগে থেকেই পশ্চিমবঙ্গের পুব আকাশে নিকষ কালো মেঘের ঘনঘটা। ক’দিন আগেই উত্তরবঙ্গের দুই বিজেপি নেতা, সাংসদ খগেন মুর্মু এবং বিধায়ক শঙ্কর ঘোষের উপর জেহাদিরা আক্রমণ চালিয়েছে। পাথর
ছুঁড়ে, জুতো মেরে সেই অন্ধকার রাতের সংকেতই তারা দিয়ে রেখেছে। এখানেও আক্রমণকারীরা সেই জেহাদি দুধেল গাই সম্প্রদায়ভুক্ত।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের এই দুর্দিনে রাজ্যবাসীর পাশে থাকার কথা যার, দেশের সেই সর্বময়কর্তা এখনও দিদি-ভাইয়ের মধুর সম্পর্ক রক্ষায় ব্যস্ত। এতে নাকি দেশের গণতন্ত্রের ভিত শক্ত হয়, কেন্দ্র ও রাজ্যের মধুর সম্পর্ক পাকাপোক্ত থাকে। তাই তিনি বঙ্গজননীর আর্তনাদ না শোনার প্রতিজ্ঞায় অটল। এদিকে দিদির চেলা চামুণ্ডারা যে তার সন্তান-সম বাঙ্গালি হিন্দুকে মেরে নির্বংশ করে দিচ্ছে সেদিন তাঁর হুঁশ নেই। রাজধর্ম কাকে বলে? হতভাগ্য বাঙ্গালিকে তবে কে বাঁচাবে? আমাদের আর এক নেতা, দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, যিনি তুড়ি মেরে অশান্ত কাশ্মীরকে নিমেষে ঠাণ্ডা করে দিতে পারেন তো অন্যদিকে এক নিমেষে
মাওবাদীদের পলকে পৌঁছে দিতে পারেন যমের দক্ষিণ দুয়ারে, সেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী- কী কারণে জানি তিনিও আজ নিশ্চুপ, দ্রোণাচার্যের মতো। তাঁর তুণের সমস্ত তিরই বুঝি পশ্চিমবঙ্গের এই মহিলা দুর্যোধনের কাছে এসে থেমে গেছে। আর দেশ জুড়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সদা তৎপর বলে দাবি করা, ‘সত্যমেব জয়তে’র বাণীধারী ভারতীয় সংবিধান অথবা ‘যতো ধর্মন্ততো জয়ঃ’ মন্ত্রের বার্তাবাহক সুপ্রিম কোর্ট, তাদের অন্তত আজ শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকায় অবতীর্ণ
হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের দুর্ভাগ্য যে, তাঁরাও আজ না দেখার ভান করছেন। তাই আজ এই বিধর্মীর কাছে বঙ্গজননীর সতীত্ব রক্ষার আর বুঝি কোনো পথ নাই।
অনেক বছর থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দপ্তর জানে পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে জেহাদি মুসলমান, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ও রোহিঙ্গা
মুসলমান। যারা প্রকাশ্যে শাসকদলের সৈনিক রূপে কাজ করছে। বিরোধী নেতাদের প্রাণে মারার এই প্রয়াস কি কেবলমাত্র খগেন মুর্মুদের চ্যালেঞ্জ করা,
নাকি তার সঙ্গে সঙ্গে এদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককেও চ্যালেঞ্জ জানানো? কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা প্রাপ্ত এমএলএ, এমপিদের মেরে তারা তো দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। বলেছে, ‘দেখো তুমি আমাদের কিছু করতে পারবে না। তোমার পোষা সিআইএসএফ-এর প্যারা মিলিটারি জওয়ানরা, যাদের ওপর তোমার দলের এমএলএ, এমপিদের বাঁচানোর ভার দিয়েছিলে, আমরা তাদের সামনেই তোমার দলের নেতাদের জুতো মেরে, পাথর ছুঁড়ে আধমরা করে দিয়েছি। চাইলে আমরা রাজ্যের যে কোনো জায়গায়, যে কোনো সময়, তোমাদের যে কাউকে মেরে ফেলতে পারি। তুমি আমাদের কিচ্ছু করতে পারবে
না। তোমার এই হাই সিকিউরিটি নামক বস্তুটি আমাদের কাছে একটি ঢপের চপ’।
প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমবঙ্গে আজ চলছে মধ্যযুগীয় ইসলামি শাসন। কিন্তু দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ভূমিকা কী? ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যে এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে তারা কী পদক্ষেপ নিয়েছে? বাঙ্গালি হিন্দু দিন প্রতিদিন আক্রমণের শিকার। তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গেলে তাদের মিছিল আক্রান্ত হচ্ছে। রাজ্যের পুলিশ মারছে, জেহাদিরা মারছে। তবু কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক চুপ। কেন, পশ্চিমবঙ্গ কি ভারতের বাইরে? কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন এর বিরুদ্ধে মানুষকে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে হবে। অদ্ভুত তত্ত্ব! সাধারণ মানুষকে যদি জেহাদি গুন্ডাদের বিরুদ্ধে লড়তে হয় তবে তাঁরা কী করবেন? তাদের ভোট দিয়ে ওই চেয়ারে বসানো হয়েছে কেন? সাধারণ নাগরিকদেরই যদি প্রতিরোধে নামতে হয়, তবে আইন, বিচার ব্যবস্থা এসবের দরকার কী? সংবিধানে ৩৫৫, ৩৫৬ এই ধারা এগুলি আছে কী করতে? যে রাজ্যে সাংসদ সুরক্ষিত নয়, বিধায়ক সুরক্ষিত নয়, সেখানে সাধারণ মানুষ কোন সাহসে ওই নরখাদকদের সঙ্গে লড়াই করবে? তাদের জীবন, মা-বোনের সুরক্ষা কে দেবে?
ক’বছর আগে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডা ডায়মন্ড হারবার যাওয়ার সময় আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। সেদিন হয়তো তাঁর লজ্জা
লেগেছিল। সেজন্য হয়তো তিনি ধীরে ধীরে দলের এমপি, এমএলএ, নেতা-নেত্রী, কর্মী সবাইকে মার খাইয়ে নিচ্ছে, যাতে কেউ তাকে মার খাওয়ার জন্য টিটকিরি দিতে না পারে। কিন্তু দেশের কর্ণধারদের জেনে রাখা প্রয়োজন, এই পশ্চিমবঙ্গই ভারতকে রক্ষার একমাত্র গ্যারান্টি। কেন্দ্রের চরম অবহেলাতেই আজ এই পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশি জেহাদি ও রোহিঙ্গাদের ‘সেফ শেলটারে’ পরিণত হয়েছে। এই রাজ্য তারা ভারত দখলের করিডোর হিসেবে ব্যবহার করছে। জেহাদিরা সফল হলে অদূর ভবিষ্যতে দিল্লি, মুম্বাই, গুজরাটও শান্তিতে থাকতে পারবে না। পশ্চিমবঙ্গের চিকেন নেক উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যের প্রাণ
ভোমরা। চিকেন নেক লাগোয়া বিহারের কিষাণগঞ্জ ইতিমধ্যেই আসাদউদ্দিন ওয়েসির দৌলতে জেহাদিদের মুক্তাঞ্চলে পরিণত হয়েছে। এমতাবস্থায় পশ্চিমবঙ্গ না বাঁচলে কারও রক্ষা নেই।
তাই দেরি করলে হবে না। কেন্দ্রকে এক্ষুণি উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ইতিমধ্যেই এসআইআর নিয়ে রাজ্য শাসকদলের নেতারা প্রকাশ্যে দাঙ্গা করার,
রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। কারণ তারা জানেন এই রোহিঙ্গা আর বাংলাদেশি মুসলমানরা তাদের ভোটব্যাংক। তারা সংখ্যায় দেড়-দু কোটিরও বেশি। এরা না থাকলে শাসক দলের ক্ষমতায় ফেরা অসম্ভব। তাই এদের নিয়ে শাসক দল পথে নামছে। কেন্দ্র সরকার গত ১০-১২ বছরে এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। এসআইআর-এর নামে হিংসা ছড়ানো জেহাদি ও তার সমর্থকদের শিরদাঁড়া ভেঙে দিতে হবে। প্রয়োজনে ৩৫৬ ধারা জারি
করতে হবে। এটাই এদের জন্য উপযুক্ত। না হলে এই ধারাটি সংবিধানে আছে কী করতে? খনার বচনে বলে ‘আছে গোরু না বয় হাল, তার দুঃখ চিরকাল’। অর্থাৎ ঘরে বলদ আছে, কিন্তু তারা হাল বইতে পারে না, বসে বসে শুধু খায়। এমন বলদ পুষে চাষির লাভ কী? সংবিধানের যে ধারা দেশকে শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে না, তার নাগরিককে বাঁচাতে পারে না, এমন ধারা সংবিধানের রেখে কী লাভ? ২০১৯ থেকে বাঙ্গালি হিন্দু তারা প্রতিটি নির্বাচনে বারে বারে কেন্দ্র সরকারকে নিঃশর্ত সমর্থন জুগিয়েছে, মুখ চেয়ে বসে আছে এই ভেবে কেন্দ্র তাদের রক্ষা করবে। এখন কেন্দ্র সরকাকেই প্রমাণ করতে হবে যে তাদের বিশ্বাসের মর্যাদা রাখা উপযুক্ত কিনা। ২০২৬-ই হয়তো শেষ সুযোগ। এ সুযোগ হাতছাড়া হলে আগামী দিনে এই পশ্চিমবঙ্গে ভারতমাতার জয়ধ্বনি দেওয়ার লোক পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ।

















