কংগ্রেস শুধু দেশকে দ্বিখণ্ডিত করেনি, স্বাধীনতা সংগ্রামের স্তবমন্ত্র বন্দেমাতরঙ্কেও খণ্ডিত করেছে
এত মহাপুরুষের সম্মিলিত প্রণতি ও বন্দনাই তো হলো বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম্’ সংগীত। আমরা ভারত সন্তানরা যদি আবার দেশমাতৃকাকে তার রত্নসিংহাসনে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাই তবে সবার আগে চাই তাঁর স্তবমন্ত্র বন্দেমাতরমের পুনর্জাগরণ। স্বমহিমায় তার পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
শিবেন্দ্র ত্রিপাঠী
আজ থেকে ঠিক ১৫০ বছর আগে এক স্বপ্নদ্রষ্টা ঋষির অন্তরের মাতৃচেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল এক কবিতার মাধ্যমে। সেই কবিতার স্রষ্টা ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সমগ্র জাতিকে শিখিয়েছেন দেশ মানে কেবল একখণ্ড ভূমি নয়, দেশ হলো মাতৃস্বরূপা, সিংহবাহিনী দশভুজা, মৃন্ময়ী আধারে চিন্ময়ী সত্তা। আর আমাদের কণ্ঠে দিয়েছেন দেশ জননীর স্তবমন্ত্র বন্দেমাতরম। এই সংগীত স্বাধীনোত্তর ভারতের প্রথম জাতীয় সংগীত। কী ছিল বন্দেমাতরম্ রচনার ইতিহাস?
সেটা ছিল ১৮৭৫ সাল। বঙ্কিমচন্দ্র তখন বঙ্গদর্শন পত্রিকার সম্পাদক। পত্রিকা ছাপার কাজ চলছে। সন্ধ্যাবেলা। এমন সময় প্রেসের এক ছাপা কর্মী এসে বললে- ‘বাবু, আরও কিছুটা ম্যাটার চাই’। বঙ্কিমচন্দ্র কিঞ্চিৎ বিব্রত। হাতের কাছে প্রকাশযোগ্য কোনো লেখা দেখতে পেলেন না। তিনি দেরাজ হাতড়াতে লাগলেন। হঠাৎ হাতের কাছে পেলেন একটা কাগজ। কাগজটা টেনে নিয়ে চোখ বুলালেন। তার নিজেরই লেখা একটি কবিতা। মনে দ্বিধা, না এটা তো ছাপা চলে না। এ যে তার গোপন মনের অন্তরতম পূজার মন্ত্র। প্রকাশ্য জনতার মাঝে তাকে টেনে আনা কি উচিত? কিন্তু প্রেসের লোক তখনও দাঁড়িয়ে।
নিতান্ত বাধ্য হয়ে কাগজখানা তুলে দিলেন তার হাতে- ‘যাও, কম্পোজ করে নিয়ে এসো’। চলে গেল লোকটি। হাতে নিয়ে গেল আগামীদিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহামন্ত্র রাষ্ট্রবন্দনা ‘বন্দেমাতরম্’।
পরের দিন বঙ্গদর্শনে বন্দেমাতরম্ ছাপা হলো বটে কিন্তু জনমনে সে কবিতা কোনো দাগ কাটলো না। হাজার বছর ঘুমে অচেতন যে জাতি তার প্রাণে কি ওই ডাক এত সহজে সাড়া জাগাতে পারে? একদিন বৈঠকি আড্ডায় তখনকার দিনের নামজাদা সাহিত্যিক রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, চন্দ্রনাথ বসু, নবীনচন্দ্র সেন প্রমুখ জমিয়ে গল্প করছেন। কথাপ্রসঙ্গে উঠলো বন্দেমাতরমের নাম। নবীন সেন বললেন- ‘এটার ভাষা খারাপ নয়, কিন্তু আধা সংস্কৃত, আধা বাংলা, জগাখিচুড়ি করে সব মাটি হয়ে গেল। এ যেন যাত্রাদলের গোবিন্দ অধিকারীর গানের মতো’। মর্মাহত হলেন বঙ্কিমচন্দ্র। বিশেষত নবীন সেনের মতো প্রাজ্ঞ কবির কাছে এমন তাচ্ছিল্যকর উক্তি তিনি আশা করেননি। ১৮৮৩ সাল। প্রকাশিত হলো তার কালজয়ী উপন্যাস আনন্দমঠ। বন্দেমাতরকে তিনি অন্তর্ভুক্ত করলেন আনন্দমঠে। যেখানে স্বদেশপ্রেমে দীক্ষিত সন্তানদল বলছে- ‘আমরা অন্য মা জানি না। জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী। আমরা বলি জন্মভূমি জননী। আমাদের মা নাই, বাপ নাই, ভাই নাই, বন্ধু নাই, স্ত্রী নাই, পুত্র নাই, ঘর-বাড়ি নাই। আমাদের আছে কেবল মুঠি আকাশে তুলে ধ্বনি দিচ্ছে ‘বন্দেমাতরম্’। মুহূর্তে পুলিশের লাঠি সুজলা সুফলা মলয়জ শীতলা শস্য শ্যামলা জন্মভূমি।
তখনও বন্দেমাতরম্ জাতির জীবনে তেমন কোনো রেখাপাত করতে সক্ষম হলো না। ১৮৯৪ সাল একবুক ব্যথা নিয়ে মৃত্যুশয্যায় শুয়ে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর মেয়েকে বলেছিলেন- ‘তোরা দেখে নিস, আজ থেকে বিশ-ত্রিশ বছর পর এই বন্দেমাতরম্ই সারা দেশের মানুষের বুকের রক্তে নাচন আনবে।’ ১৮৯৪ সালের কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে সুর দিয়ে গাইলেন বন্দেমাতরম্। কিন্তু তখনও এ গান জাগ্রত মন্ত্রশক্তিতে সঞ্জীবিত হয়ে উঠতে পারেনি। কেটে গেল আরও নয়টি বছর। স্বদেশের মাতৃমূর্তি গড়েছেন বঙ্কিমচন্দ্র, কিন্তু তখনও তাতে যেন প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়নি। এবার সামনে এলেন জাতির মহাঋত্বিক স্বদেশে আত্মার বাণীমূর্তি শ্রীঅরবিন্দ। বললেন, ‘বন্দেমাতরম্ আমাদের মাতৃরূপ দর্শন করিয়েছে। একদিনে একটি সমগ্র জাতি স্বদেশপ্রেমের
ধর্মে পরিবর্তিত হয়েছে। যতদিন না মায়ের মন্দির নির্মাণ, আর বিগ্রহের প্রতিষ্ঠা হয় ততদিন এজাতির বিশ্রাম নেই, শান্তি নেই, নিদ্রা নেই’। এবার হলো প্রাণপ্রতিষ্ঠা। শুষ্ক নদীবক্ষে এলো শ্রাবণের জোয়ার। সত্যি হলো বঙ্কিমের ভবিষ্যদ্বাণী। ধীরে ধীরে বন্দেমাতরম্ হয়ে উঠলো জাতির সঞ্জীবনী মন্ত্র।
১৯০৫ সাল। ভারতের রাজধানী তখন কলকাতা। স্বাধীনতা আন্দোলনের ঢেউ বঙ্গপ্রদেশের গ্রামে-নগরে, ঘরে-বাইরে সর্বত্র। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে শাসকের ত্রাহি মধুসুদন অবস্থা। বঙ্গের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনকে ছিন্নভিন্ন করতে কুচক্রী ইংরেজ শাসক ভাইসরয় কার্জন প্রস্তাব দিলেন বঙ্গকে ভাগ করার। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে গর্জে উঠল সারা দেশ। প্রতিরোধ শুরু হলো। জন্ম নিল ‘স্বদেশী আন্দোলনের’। আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়তে লাগলো বিদেশি দ্রব্যের পাহাড়। বঙ্গের আকাশ-বাতাস তখন মুখরিত বন্দেমাতরম্ ধ্বনিতে। অবশেষে এলো ১৬ অক্টোবর। দুই বঙ্গকে ভাগ করার দিন। ঘরে ঘরে সেদিন অরন্ধন।
মেয়েরা ঘট পেতে বঙ্গলক্ষ্মীর পূজা করে সংকল্প নিল ‘মা লক্ষ্মী কৃপা কর। কাঞ্চন দিয়ে কাঁচ কিনবো না, ঘরের থাকতে পরের জিনিস নেব না, পরের দুয়ারে ভিক্ষা করব না, মোটা অন্ন অক্ষয় হোক, ঘরের লক্ষ্মী ঘরে থাকুক।’ রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম্’ শব্দকে নিয়ে গান বাধলেন, ‘বন্দেমাতরম্, একই সূত্রে গাঁথিয়াছি সহস্রটি মন’। সেই গান গেয়ে গঙ্গার ঘাটে স্নান করে সবার হাতে বেঁধে দিলেন রাখি। সকলের কণ্ঠে তখন বন্দেমাতরম্ উদ্দ্বোষ। সেই শুরু। সেদিন থেকে বন্দেমাতরম হয়ে উঠলো বিপ্লবী আন্দোলনের বোধন মন্ত্র। ধীরে ধীরে ব্রিটিশ সরকারের কাছে বন্দেমাতরম হয়ে উঠল এক আতঙ্ক। ব্রিটিশ প্রশাসন ‘রিসলে সার্কুলার’ জারি করে বন্দেমাতরম্ ধ্বনি নিষিদ্ধ করে দিল।
এতে কি আর ছেলের মুখ থেকে মায়ের নাম কেড়ে নেওয়া যায়? নাগপুরের নীলসিটি হাইস্কুল। ক্লাসের ছাত্ররা স্কুল ইন্সপেক্টরকে বন্দেমাতরম্ ধ্বনি দিয়ে স্বাগত জানালো। এই অপরাধে ছাত্র নেতা কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারকে স্কুল থেকে বিতাড়িত করা হলো। কিন্তু বন্দেমাতরম্ বন্ধ করা গেল না।
১৯০৬ সাল। বরিশালে কংগ্রেসের অধিবেশন। বন্দেমাতরম্ধ্ব নিতে মুখরিত সভা লাঠিচার্জ করে ভেঙে দিল পুলিশ। চারিদিকে রক্তাক্ত মানুষের হুড়োহুড়ি। তারই মাঝে দাঁড়িয়ে বালক চিত্তরঞ্জন হাতের
মুঠি আকাশে তুলে ধ্বনি দিচ্ছে ‘বন্দেমাতরম্’। মুহূর্তে পুলিশের লাঠি এসে পড়ল মাথায়। লুটিয়ে পড়ল চিত্ত। কিন্তু বন্দেমাতরম্ বন্ধ হলো না। পরে চিত্ত তার বাবাকে বলেছিল, ‘বাবা, পুলিশ যতবার আমাকে লাঠি মেরেছে, আমি ততবার বন্দেমাতরম বলেছি, ওরা আমাকে চুপ করাতে পারেনি’।
১৯০৭ সাল। বিপিনচন্দ্র পালকে স্বাগত জানাতে কয়েক হাজার মানুষ কোর্টে উপস্থিত। চারিদিক থেকে ধ্বনি উঠলো ‘বন্দেমাতরম্’। শুরু হলো নির্মম লাঠিচার্জ। এই অন্যায় সহ্য হলো না ছাত্র সুশীল সেনের। সার্জেন হুইকে লাগালেন এক ঘুঁসি। গ্রেপ্তার হলো সুশীল। ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড আদেশ দিলেন ১৫ ঘা বেত মারার। পিঠে বেত পড়তে থাকলো আর প্রত্যেকটি বেত্রাঘাতের প্রত্যুত্তরে সুশীলের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো- ‘বন্দেমাতরম্’।
১৯০৯ সালের ১ জুলাই। লন্ডনের জাহাঙ্গির হলে ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক উৎসব। সবাই অনুষ্ঠানে বিভোর। হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হলেন মদনলাল ধিংড়া। গর্জে উঠলো তার হাতের পিস্তল। কার্জন উইলি লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে। ধরা পড়লেন মদনলাল। বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে ফাঁসির দড়ি চুম্বন করার আগে মদনলাল তার শেষ ইচ্ছা জানিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি যেন বারে বারে আমার গর্ভধারিণীর বুকে জন্মগ্রহণ করে দেশ উদ্ধারের সাধনায়
মৃত্যুকে আলিঙ্গন করি, যতদিন না আমার ভারতভূমি সম্পূর্ণ স্বাধীন হয়ে বিশ্বসভায় গৌরবের আসনে প্রতিষ্ঠিত হন- ‘বন্দেমাতরম্’।
যে বন্দেমাতরম্ মন্ত্র এদেশের স্বদেশি আন্দোলনের প্রেরণার উৎসধারা ছিল, যে বন্দেমাতরমের বলে বলীয়ান হয়ে ক্ষুদিরাম- প্রফুল্ল চাকী-বাঘাযতীন-মাস্টারদা সূর্যসেন-মাতঙ্গিনীরা এই বঙ্গে ইংরেজদের বিরুদ্ধে অসীম বীরত্বে লড়াই করেছেন; যে বন্দেমাতরমের অভয়মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে চট্টগ্রামের সপ্তদশী প্রীতিলতা নির্দ্বিধায় সায়ানাইডের ক্যাপসুলটা দাঁতে কেটে পাহাড়তলির মাটিতে মুখ গুঁজে পড়েছিলেন; যে বন্দেমাতরমের অগ্নিস্ফুলিঙ্গে ১৪-১৫ বছরের লোকনাথ টেগরা- মনোরঞ্জন সেনরা ব্রিটিশ সেনার বিরুদ্ধে কাঁপিয়ে দিয়েছিল জালালাবাদের পাহাড়; যে বন্দেমাতরমের তেজে বলীয়ান হয়ে বিনয়-বাদল-দিনেশ রাইটার্সের অলিন্দকে ব্রিটিশ শাসকের রক্তে রাঙিয়ে দিয়েছিলেন; যে বন্দেমাতরম্কে বুকে নিয়ে ভগৎ-সুখদেব-রাজগুরুরা ফাঁসির আগের দিন রাত্রে লাহোরের
কনডেমড্ সেলে বসে প্রাণভরে গেয়ে উঠেছিলেন ‘মেরে রংদে বাসন্তী চোলা’; যে বন্দেমাতরঙ্কে বুকে ধরে বঙ্গের বীর যতীন দাস লাহোরের সেন্ট্রাল জেলে ৬৩ দিন অনশন করে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন; যে বন্দেমাতরম্ মন্ত্রকে জপ করতে উল্লাসকর-বটুকেশ্বর-সাভারকরেরা আন্দামান সেলুলার জেলের অন্ধ কুঠুরিতে বছরের পর বছর অকথ্য অত্যাচার সহ্য করেছিলেন- সেই বন্দেমাতরম্ মহামন্ত্রের সঙ্গে জাতীয় কংগ্রেস কী করেছিল তা জানতে হবে সবাকে। অনেকেরই হয়তো তা জানা নেই সে কথা।
১৯২৩ সাল। কংগ্রেসের কাকিনাড়া অধিবেশন। মঞ্চে আমন্ত্রিত সেই সময়কার প্রখ্যাত শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পী বিষ্ণু দিগম্বর পলুস্কর। সভার শুরুতেই তিনি উদাত্ত কণ্ঠে বন্দেমাতরম্ গাইতে শুরু করলেন। তীব্র প্রতিবাদ জানালেন মঞ্চে উপবিষ্ট মৌলানা মহম্মদ আলি ও তার ভাই শওকত আলি। দাবি তুললেন কংগ্রেসের মঞ্চে এ গান গাওয়া যাবে না।
থেমে গেলেন বিষ্ণুজী। কংগ্রেসের কয়েকজন নেতা তখন তাঁকে শুধুমাত্র গানটির প্রথম স্তবক গাইবার অনুরোধ করলেন। বিষ্ণুজী বললেন, ‘গাইলে পুরোটাই গাইবো, নইলে গাইবো না’। জনতার চাপে নতিস্বীকার করল কংগ্রেস। বিষ্ণুজী তার সুললিত কণ্ঠে সম্পূর্ণ করলেন বন্দেমাতরম্সং গীত। আলি ভ্রাতৃদ্বয় বন্দেমাতরমকে অপমান করে মঞ্চ ছেড়ে চলে গেলেন। সেদিন থেকে মুসলমানরা সরাসরি বন্দেমাতরমের বিরুদ্ধে আপত্তি জানাতে লাগল। কারণ বঙ্কিমচন্দ্র এই গানে দেশকে মা বলেছেন। বলেছেন, ‘ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী, কমলাকমলদল বিহারিণী, বাণী বিদ্যাদায়িনী’
– অর্থাৎ এই দেশ হলো স্বয়ং দশভুজা দুর্গা, মা লক্ষ্মী, মা সরস্বতী। ইসলামি সাম্প্রদায়িকতার কাছে মাথা নোয়ালো কংগ্রেস। নেতারা বললেন, ‘কেউ যদি ব্যক্তিগত কারণে বন্দেমাতরম্ গাইতে না চান, তাকে শ্রদ্ধা জানাতে না চান, তবে তার সেই স্বাধীনতা থাকা উচিত’। ১৯৩৭ সালে গান্ধীজী ও জওহরলালের নেতৃত্বে জাতীয় কংগ্রেস সম্পূর্ণ বন্দেমাতরমের স্থানে কেবলমাত্র এর প্রথম দুটি স্তবককে জাতীয় সংগীতের মর্যাদা দিল। আর বাদ দিল সেই স্তবকগুলিকে যেখানে দেশমাতৃকাকে ‘মা দুর্গা’ বলে প্রণাম জানানো হয়েছে। খণ্ডিত হলো বন্দেমাতরম্ মন্ত্র। ইসলামি সাম্প্রদায়িকতার যূপকাষ্ঠে বন্দেমাতরমকে বলি দিল কংগ্রেস।
তবে এত বড়ো পাপ সহ্য করেননি ঈশ্বর। যে বন্দেমাতরমের অপার শক্তি ১৯০৫ সালে বড়লাট কার্জনের বঙ্গবিভাগের ‘সেটেলড্-ফ্যাক্টকে’ আনসেটেল করে দিয়েছিল, সেই বন্দেমাতরমকে খণ্ডিত করার পাপে মাত্র ১০ বছরের মাথায়, ১৯৪৭ সালে দেশ দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। যতদিন আমরা বন্দেমাতরমকে শ্রদ্ধার সঙ্গে বুকে আগলে রেখেছিলাম ততদিন দেশ অখণ্ড ছিল। কিন্তু যেই আমরা বন্দেমাতরমকে ভেঙে টুকরো করে দিলাম, দেশের শত্রুদের আবদারের কাছে মাথা নত করলাম, মায়ের পূজার মন্ত্রকে কেটে ফেললাম, সেদিন থেকে আমাদেরও পতন শুরু হলো।
হিন্দুদের সঙ্গে একসঙ্গে থাকা যায় না তাই মুসলমানদের জন্য আলাদা দেশ পাকিস্তান চাই, এই দাবিকে হাতিয়ার করে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হলো। কিন্তু যে সাম্প্রদায়িকতার কাছে মাথা নত করে কংগ্রেস দেশভাগ মেনে নিল সেই সমস্যার সমাধান আজও হলো না। স্বাধীনতার পরও হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতে বন্দেমাতরম্ খণ্ডিতই রয়ে গেল। আজও এদেশে বন্দেমাতরম্ বিরোধী ইসলামি মোল্লাবাদীরা সমানভাবে সক্রিয়। ১৯২৩ সালের মহম্মদ আলি, শওকত আলিরা আজকের যুগের আজম খান, আসাদুদ্দিন হয়ে জন্ম নিয়েছে। ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে নির্দ্বিধায় যারা বলতে পারে, “আমার চোখে ভারত ‘ভারত মাতা’ নয়, ডাইনি”। কেউ-বা আবার দম্ভের সঙ্গে বলে, ‘গলায় চাকু রেখে বললেও আমি বন্দেমাতরম্ উচ্চারণ করব না’। কমিউনিস্টরা
কোনোদিনই বন্দেমাতরম্ শব্দ উচ্চারণ করেনি। করবেই-বা কী করে? তাদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা-নেতা মুজফফর আহমেদ (কাকাবাবু) যে বলে গেছেন, ‘বন্দেমাতরম্ হলো হিন্দুদের দেবী দুর্গার উদ্দেশ্যে একটি প্রার্থনা। একেশ্বরবাদী মুসলমানেরা কখনোই এটি উচ্চারণ করতে পারে না।’ অর্থাৎ এদেশে এখনো অনেক ভারতমাতার অপমানকারীরা রয়ে গেছে। এদের মন পেতেই ১৯৫০ সালে কংগ্রেসের ভারতীয় গণপরিষদে খণ্ডিত বন্দেমাতরকে জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করেছিল।
শুধু কংগ্রেস বা কমিউনিস্টরাই নয়, পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল, তাদের সভা সমিতি, ১৫ আগস্ট, ২৬ জানুয়ারি মঞ্চে আপনারা কোনোদিন দেখেছেন কাউকে দাঁড়িয়ে পূর্ণ জাতীয় সংগীত বন্দেমাতরম্ গাইতে? যে গান গেয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যদুনাথ ভট্টাচার্য, দক্ষিণারঞ্জন সেন, সরলা দেবীচৌধুরাণীরা বাঙ্গালির মনে দেশপ্রেমের বন্যা এনে দিয়েছিলেন, সেই অখণ্ড বন্দেমাতরম সংগীত কি এরা গেয়েছে কোনোদিন? না, গায়নি। গাইবেও না। কারণ সেই ১৯২৩ সালের মানসিকতা। ভোটব্যাংকের রাজনীতি। বন্দেমাতরমকে তারা সাম্প্রদায়িক মনে করে। বন্দেমাতরম্ গাইতে তাদের লজ্জা করে।
এর মাঝে একমাত্র ব্যতিক্রম এ দেশের রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ এবং তার দ্বারা অনুপ্রাণিত সংগঠনগুলি। জনসঙ্ঘের আমল থেকে আজকের বিজেপি, অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ, বিদ্যাভারতী, মজদুর সঙ্ঘ, বনবাসী কল্যাণ আশ্রম প্রভৃতি প্রায় ৪০টি সংগঠন আজও তাদের সমস্ত কার্যক্রমের সূচনা করেন অখণ্ড বন্দেমাতরম্ সংগীতের মাধ্যমে। এটাইতো প্রকৃত অর্থে দেশপ্রেম। এটাতো জাতির অস্মিতার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধাজ্ঞাপন।
আজ বাঙ্গালির প্রায়শ্চিত্ত করার দিন। ভারতের জাতীয় আন্দোলনের মহামন্ত্র, বাঙ্গালির সৃষ্টি জাতীয় সংগীত বন্দেমাতরমের শতবর্ষে আমরা তার হৃত সম্মান ফিরিয়ে আনতে পারিনি। কিন্তু তার ১৫০ তম বর্ষে আমাদের সেই পাপ ধুয়ে নিতে হবে। পূর্ণ বন্দেমাতরমের স্বরূপ অনুধাবন করতে হবে। দেশ আমাদের কাছে কেবল একখণ্ড ভূমি নয়, মাটির প্রতিমা নয়, এক চৈতন্যময় জীবন্ত সত্তা। যুগে যুগে এই দেশকে প্রণাম জানিয়েছেন সন্ত মহাত্মারা। শ্রীরামচন্দ্র বলেছেন ‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী’, শ্রীকৃষ্ণ একে বর্ণনা করেছেন ‘ধর্মক্ষেত্র’ রূপে, ঋষি অরবিন্দ বলেছেন, ‘দেশ হলো মাতৃস্বরূপা, মৃন্ময়ী আধারে চিন্ময়ী সত্তা। স্বামীজী তাঁর স্বদেশমন্ত্রে এই দেশকে ‘বিরাট মহামায়ার ছায়া মাত্র’ বলে বন্দনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেশকে ‘অয়ি ভুবনমনমোহিনী মা’ বলে সম্বোধন করে তার মধ্যে দেবী চণ্ডীর রূপ প্রত্যক্ষ করে লিখেছেন ‘ডান হাতে তোর খড়া জ্বলে, বাঁ হাত করে শঙ্কাহরণ, দুই নয়নে স্নেহের হাসি, লালটনেত্র আগুনবরণ’। কবি দ্বিজেন্দ্রলাল লিখেছেন, ‘বন্দিল সবে,কবি দ্বিজেন্দ্রলাল লিখেছেন, ‘বন্দিল সবে, ‘জয় মা জননী! জগত্তারিণী জগদ্ধাত্রী! ধন্য হইল ধরণী তোমার চরণ-কমল করিয়া স্পর্শ! গাইল, ‘জয় মা জগম্মোহিনী! জগজ্জননী! ভারতবর্ষ।’ সুভাষচন্দ্র বসু এই দেশকে দেবতার লীলাভূমি বলে বর্ণনা করে মা প্রভাবতী দেবীকে চিঠিতে লিখেছেন, ‘ভারতবর্ষ ভগবানের বড়ো আদরের স্থান’। এই দেশকে উদ্দেশ্য করে কবি নজরুল লিখেছিলেন, ‘জননী মোর জন্মভূমি, তোমার পায়ে নোয়াই মাথা। স্বর্গাদপি গরীয়সী, স্বদেশ আমার ভারতমাতা।… আদি জগদ্ধাত্রী তুমি
জগতের প্রথম প্রাতে, শিক্ষা দিলে দীক্ষা দিলে করলে মানুষ আপন হাতে।’ এত মহাপুরুষের সম্মিলিত প্রণতি ও বন্দনাই তো হলো বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম্’ সংগীত। আমরা ভারত সন্তানরা যদি আবার দেশমাতৃকাকে তার রত্নসিংহাসনে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাই তবে সবার আগে চাই তাঁর স্তবমন্ত্র বন্দেমাতরমের পুনর্জাগরণ। স্বমহিমায় তার পুনঃপ্রতিষ্ঠা। বন্দেমাতরমের সার্ধশতবর্ষে ভারতমায়ের শ্রীচরণে এটাই হোক আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য।
















