ভগবান বীরসা মুণ্ডা
জনজাতি স্বাভিমান রক্ষার অগ্রদূত
সরোজ চক্রবর্তী
ভগবান বীরসা মুণ্ডা ছিলেন একজন জনজাতি নেতা ও সমাজ সংস্কারক। জনজাতি সমাজের স্বাভিমান ও অধিকার রক্ষা এবং ব্রিটিশ শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে তিনি লড়াই করেছিলেন। জনজাতি মুণ্ডা সম্প্রদায়কে সংগঠিত করে ‘মুণ্ডা বিদ্রোহ’ শুরু করেন। তাঁর নেতৃত্বে সংঘটিত এই বিদ্রোহের মূল লক্ষ্য ছিল দেশীয় সরকার এবং স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা। এটি ‘উলগুলান’ বা ‘বিপজ্জনক অবস্থা’ মহা অশান্তি নামে পরিচিত। তিনি তাঁর অনুগামীদের কাছে ‘বীরসা ভগবান’ বা ‘ধরতি আবা’ বা ‘বিশ্বপিতা’ নামে পরিচিত ছিলেন।
তিনি জনজাতিদের চিরাচরিত ভূমির অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচার রক্ষার জন্য লড়াই করেছিলেন, যা তাঁকে আজও স্মরণীয় করে রেখেছে। তিনি মুণ্ডা সমাজের সংস্কারের জন্য কাজ করেছিলেন এবং নিজস্ব ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি রক্ষার আন্দোলন শুরু করেছিলেন। জনজাতিদের কাছে তিনি ‘ভগবান’ হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্ব ও সংগ্রামের জন্য তিনি আজও শ্রদ্ধেয়। তাঁর জন্মদিন ১৫ নভেম্বর যা ভারতে ‘জনজাতি গৌরব দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে। তাঁর সম্মানার্থে ২০০০ সালে ঝাড়খণ্ড রাজ্য গঠিত হয়, যা জনজাতি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অবদান স্মরণ করে। মহাশ্বেতা দেবীর জনপ্রিয় উপন্যাস ‘অরণ্যের অধিকার’ ভগবান বীরসা মুণ্ডার জীবন নির্ভর।
ভগবান বীরসা মুণ্ডার স্মৃতির উদ্দেশ্যে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়েছে যা ‘বিদ্রোহের মূর্তি’ নামে নিবেদিত। ২০২১ সালে রাঁচীর পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারে একটি জাদুঘর উদ্বোধন করা হয়েছে, যেখানে বীরসা মুণ্ডা শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বিদ্রোহের মূর্তি নামে পরিচিত বীরসা মুণ্ডার মূর্তিটি জাদুঘরে রক্ষিত। তাঁকে ঐতিহ্যবাহী জনজাতীয় পোশাক পরিহিত দেখানো হয়েছে, যা জনজাতিদের নেতা হিসেবে তাঁর পরিচয়ের প্রতীক। তাঁকে বীরত্বপূর্ণ ভঙ্গিতে চিত্রিত করা হয়েছে। তিনি ঐতিহ্যবাহী জনজাতীয় অস্ত্র যেমন ধনুক, তির, বিদ্রোহের প্রতীক বর্শা ধারণ করে আছেন। ২০২৩ সালে ভগবান বীরসা মুণ্ডার জন্মবার্ষিকীতে আর্থিকভাবে দুর্বল জনজাতি গোষ্ঠীগুলির কল্যাণমূলক পদক্ষেপগুলি কার্যকরভাবে সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য ‘প্রধানমন্ত্রী জনজাতি ন্যায় মহা অভিযান’ নামে একটি উদ্যোগ শুরু করা হয়েছে।
ভগবান বীরসা মুণ্ডা তাঁর জীবদ্দশায় ভারতীয় ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন রেখে গিয়েছেন তাঁর সাহসী নেতৃত্ব এবং জনজাতি সম্প্রদায়ের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার প্রতি অটল অঙ্গীকারের মাধ্যমে। জনজাতিদের সামাজিক ক্ষমতায়নের তিনি এক আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠেন। তাঁদের ভূমির অধিকার, সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ এবং সামাজিক ন্যায় বিচারের পক্ষে কথা বলেন। বিশাল বিরোধিতার মুখোমুখি হওয়া এবং শেষপর্যন্ত এক করুণ পরিণতির স্বীকার হওয়া সত্ত্বেও
অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং জনজাতি সমাজের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার জন্য লড়াই করতে নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।
ভগবান বীরসা মুণ্ডা ১৮৭৫ সালের ১৫ নভেম্বর বর্তমান ছত্তিশগড়ের উলিহাতু গ্রামে মুণ্ডা জনজাতির এক সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সুগনা মুণ্ডা এবং মাতা কার্মি হাতু ছিলেন কৃষিজীবী। ঔপনিবেশিক শাসন এবং সামাজিক বৈষম্যের মধ্যেও তাঁরা তাঁদের পরিবারকে টিকিয়ে রাখার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতেন। শৈশব থেকেই মুণ্ডাদের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং আধ্যাত্মিক অনুশীলনের প্রতি ভীষণভাবে আগ্রহী ছিলেন বীরসা মুণ্ডা। তিনি খুব বেশি শিক্ষিত ছিলেন না। কিন্তু কিছু সময়ের জন্য খ্রিস্টান মিশনারি স্কুলে পড়াশোনা করেন। সেই সময় তাঁকে খ্রিস্টানে ধর্মান্তরিত করা হয়। তাঁর শৈশবের একটা বড়ো অংশ চাইবাসায় অতিবাহিত হয়। সেখানে স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মকাণ্ড দ্বারা তিনি প্রভাবিত হন। এই সময় থেকেই তাঁর মধ্যে তীব্র ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব তৈরি হয়। ভারতে ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে অন্যান্য জনজাতি সম্প্রদায়ের মতো মুণ্ডারাও তাদের জমি ও সম্পদের উপর বহিরাগতদের দখলের কারণে শোষণ, উচ্ছেদ ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সম্মুখীন হয়েছিল। বীরসা মুণ্ডা সেই অবিচারের কারণে গভীরভাবে বিরক্ত ছিলেন।
রাঁচির ট্রাইবাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক বিবেক আরিয়ানের মতে, বীরসা মুণ্ডা স্কুল ছাত্র থাকাকালীন উপজাতিদের স্বাভিমান রক্ষার বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন। তাঁর সক্রিয়তার ফলে ১৮৯০ সালে তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে তিনি জনজাতি সম্প্রদায়ের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে করতে তাদের সংগঠিত করেন। ১৮৯৫ সালের মধ্যে তিনি ব্রিটিশদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ হুমকি হয়ে ওঠেন। যার ফলে ২৪ আগস্ট ১৮৯৫ সালে চালকাদ গ্রাম থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঐতিহাসিক নথি থেকে জানা যায় যে, ১৯ নভেম্বর ১৮৯৫ সালে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৫০৫ ধারায় তাকে দু’ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ৩০ নভেম্বর ১৮৯৭ সালে মুক্তি পাওয়ার পর মুণ্ডা জনজাতিরা আবারও তাঁর নেতৃত্বে সংগঠিত হয়, যা একটি বৃহৎ আকারের সংগ্রামের ক্ষেত্র তৈরি করে।
১৮৯৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর বীরসা মুণ্ডা জল, জঙ্গল ও জমির উপর জনজাতিদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ‘উলগুলান’ শুরুর ঘোষণা করেন। এই বিদ্রোহের সময়, তাঁর হাজার হাজার অনুগামী নারী, পুরুষ, যুবক তাদের মাতৃভাষায় ঘোষণা করেন: ‘ডিকু রাজ টুন্টু জানা- আবুয়া রাজ এত জানা’, যার অর্থ ‘বহিরাগতদের শাসন শেষ। আমাদের নিজস্ব শাসন শুরু হয়েছে।’ এই আন্দোলনের ভয়ে ব্রিটিশরা নির্মম দমন-পীড়নের আশ্রয় নেয়। ১৯০০ সালের ৯ জানুয়ারি হাজার হাজার জনজাতি ধনুক-তির, বর্শা-সহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী অস্ত্র নিয়ে জোম্বারি বুরু পাহাড়ে একত্রিত হন। গুপ্তচরদের কাছ থেকে খবর পেয়ে ব্রিটিশরা বন্দুক ও কামান নিয়ে সশস্ত্র সৈন্যদের দিয়ে পাহাড় ঘিরে ফেলে। শুরু হয় এক ভয়াবহ যুদ্ধ। সেখানে বীরসা মুণ্ডা এবং তার অনুসারীরা
বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। ১৯০০ সালের ২৫ জানুয়ারি ‘দ্য স্টেটম্যান’ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, সেই নৃশংস সংঘর্ষে প্রায় ৪০০ জন জনজাতি নিহত হন। তাদের রক্তে পাহাড় রঞ্জিত হয় এবং নিকটবর্তী নদীর জল লাল হয়ে যায়। ব্রিটিশরা বিজয়ী হলেও তারা বীরসা মুণ্ডাকে বন্দি করতে ব্যর্থ হয়। তবে তা ক্ষণস্থায়ী ছিল। ১৯০০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে চাইবাসার ঘন জঙ্গলে থেকে তাঁকে ঘুমন্ত অবস্থায় গ্রেপ্তার করে ব্রিটিশ পুলিশ।
তাঁকে গোপনে রাঁচিতে আনা হয় এবং ম্যাজিস্ট্রেট ডব্লিউ এস কুটুসের আদালতে বিচার করা হয়। যেখানে ব্যারিস্টার জ্যাকন তার বিচার করেন- যা ছিল কেবল একটি ভুয়া মামলা। রটানো হয় বীরসা মুণ্ডা কলেরায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। দুঃখজনকভাবে ৯ জুন জেলে রহস্যজনক ভাবে তাঁর মৃত্যু হয়। রাঁচির ডিস্টিলারি ব্রিজের কাছে তাঁর মরদেহ ফেলে দেওয়া হয়। তাঁর মহান আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এখন সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি হয়েছে। রাঁচির যে কারাগারে বীরসা মুণ্ডা শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন, সেই জেলখানাকে বীরসা মুণ্ডা স্মৃতি সংগ্রহশালায় (স্মৃতি জাদুঘর) রূপান্তরিত করা হয়েছে। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে জনজাতি আন্দোলন, যেমন বীরসা মুণ্ডার নেতৃত্বে উলগুলান কেবল ব্রিটিশ নিপীড়নকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেনি, বরং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকেও অনুপ্রাণিত করেছিল। ভগবান বীরসা মুণ্ডা খ্রিস্টমতে ধর্মান্তরণের বিরুদ্ধে যেমন সরব ছিলেন, তেমনি জনজাতি সম্প্রদায়ের মনে স্বাভিমান রক্ষার বিষয়ে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন। জনজাতি সম্প্রদায়ের স্বাধিকার, সচেতনতা, আত্মরক্ষা, আত্মমর্যাদা, আধ্যাত্মিকতা ও সংস্কৃতি রক্ষার উপর বিশেষ জোর দিয়েছিলেন। তিনি জনজাতিদের তাঁদের আদি ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় ব্যবস্থা অনুসরণ করার পরামর্শ দিতে
শুরু করেছিলেন। তাঁর শিক্ষায় মুগ্ধ হয়ে জনজাতি সমাজ তাঁকে ‘ভগবান’ হিসেবে শ্রদ্ধা করতেন। তিনি জনজাতিদের কাছে একজন সাধু পুরুষ হয়ে ওঠেন এবং তারা তাঁর আশীর্বাদ কামনা করতেন।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ভগবান বীরসা মুণ্ডার ভূমিকা অতুলনীয় ও চিরস্মরণীয়। তাঁর পার্থিব শরীরের নাশ হলেও তাঁর চিন্তাভাবনা, আদর্শ ও শিক্ষা প্রবাহিত হয়েছে সমগ্র জাতির অন্তরে। তিনি কেবল একজন স্বাধীনতা সংগ্রামীই ছিলেন না, একজন মহান সমাজ সংস্কারকও ছিলেন। তিনি জনজাতি সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার, বর্ণবৈষম্য, মাদকদ্রব্যের ব্যবহার এবং অন্যান্য সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি করেছিলেন। তিনি তাঁর অনুসারীদের শিক্ষার উপর জোর দিয়েছিলেন। সমানাধিকার ও ঐক্যের প্রচার করেছিলেন। তিনি ‘বীরসায়ত’ নামে একটি ধর্মীয় জাগরণর শুরু করেছিলেন, যা তাঁর
অনুসারীদের আচরণের বিশুদ্ধতা, সরলতা ও সত্যের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হতে উৎসাহিত করে। তিনি ঐতিহ্যবাহী মুণ্ডা বিশ্বাস, হিন্দুধর্ম ও খ্রিস্টমতের কিছু নীতির সমন্বয়ে একটি নতুন ধর্মীয় পথ তৈরি করেছিলেন। ভারতবর্ষের জাতি, ধর্ম ও সমাজ গঠনে ভগবান বীরসা মুণ্ডার অবদান চিরস্মরণীয়।

















